ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে উয়েফার ‘কুৎসা রটানোর’ অভিযোগ ফিফার

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপিয়ান ফুটবলের অভিভাবক উয়েফার মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এবার নতুন মোড় নিয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত বাণিজ্যিক প্রকল্প এবং বিশ্বকাপের একাংশ বিক্রির সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর সৃষ্ট ক্ষোভ এখন গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ফিফা ও এর শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে উয়েফা একটি ‘স্মিয়ার ক্যাম্পেইন’ বা কুৎসা রটানোর অভিযান চালাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

মূলত ৪.২ বিলিয়ন ডলারের বহুল আলোচিত ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) বা বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগী জশুয়া কুশনারের প্রাইভেট ভেঞ্চার ফান্ডের মাধ্যমে ফিফার বাণিজ্যিক অধিকারের একটি বড় অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির ওই পরিকল্পনা গত জুলাই মাসে ব্যাপক সমালোচনার মুখে বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিফা।

তবে বিষয়টি সেখানে শেষ হয়নি; এই প্রক্রিয়াকে ‘অপরাধমূলক অব্যবস্থাপনা’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন আদালতে আইনি লড়াই শুরু করে উয়েফা। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে জমা পড়া নথিতে উয়েফা দাবি করেছে, এই প্রক্রিয়ায় বিশ্ব কাপের মতো টুর্নামেন্টকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের উন্মুক্ত নিলাম ছাড়াই তা এক প্রকার গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। এমনকি ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলেরও অভিযোগ তুলেছে ইউরোপীয় সংস্থাটি।

তবে চুপ করে বসে নেই ফিফাও। উয়েফার এই আইনি তৎপরতার বিরুদ্ধে এবার কড়া জবাব দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে জমা দেওয়া এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির হাতে আসা ফিফার নতুন নথিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে যে, উয়েফার এই তথ্য প্রমাণের আবেদন যেন চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত স্থগিত বা প্রতিহত করা হয়।

আদালতে দাখিল করা ওই বিবৃতিতে ফিফা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, ‘উয়েফা এমন একটি বিদেশি ফৌজদারি কার্যধারার সহায়তার জন্য তথ্য চেয়েছে যা আদতে অস্তিত্বহীন এবং উয়েফার তা শুরু করার কোনো আইনি এখতিয়ারই নেই।’ 

সংস্থাটির মতে, এই পুরো বিরোধের পেছনে রয়েছে উয়েফার নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ। ফিফার ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠলে ইউরোপীয় অভিজাতদের বৈশ্বিক একিপথ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে এই আশঙ্কায় উয়েফা শুরু থেকেই এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এ বিষয়ে ফিফা তাদের বিবৃতিতে আরও যোগ করে জানায়, ‘যদি উন্নয়নশীল বিশ্বে ফুটবল শক্তিশালী হয়, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে যা শেষ পর্যন্ত উয়েফার বাজারক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং তাদের ফ্ল্যাগশিপ টুর্নামেন্টগুলোর জন্য আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করে।’ 

এদিকে, এই গোটা বিতর্কে অস্বস্তিতে পড়ে প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারী কুশনার নিজেও। গণমাধ্যমের সামনে নিজের অনুশোচনা প্রকাশ করে কুশনার বলেন, ‘যদিও আমরা এফএফই-র মূল উদ্দেশ্যকে সমর্থন করি, তবুও আমরা বিশ্ব ফুটবলের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি এবং কিছু মানুষের চরম অবস্থানের বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছি... যদি জানতাম এটি এই পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে, তবে আমরা এতে কখনোই জড়াতাম না।’

বিশ্বকাপের অর্থ বিতরণ বাড়িয়ে ছোট দেশগুলোকে সহায়তা করার কথা বলে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বিশ্ব ফুটবলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইকে আরও স্পষ্ট করে তুলল।