সুড়ঙ্গে জীবনের আশা নেপালের

ভয়াবহ হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট বন্যায় নেপালের কয়েকটি জেলা কার্যত ল-ভ- হয়ে গেছে। প্রলয়ংকারী ওই ঢলে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, এখনো ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আকস্মিক ওই বন্যার ৯ দিন পর গতকাল শুক্রবার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। গত ২৬ আগস্টের দুর্যোগের পর এ উদ্ধারকে ‘অলৌকিক’ বলে অভিহিত করছেন উদ্ধারকারী ও স্বজনেরা। উদ্ধার হওয়া দুজন হলেন, মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ এবং মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবির মহার্জন। কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, উদ্ধারের পর দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আকাশপথে সরাসরি কাঠমান্ডু নিয়ে যাওয়া হয়। গুরুতর আহত কবির মহরজনকে ছায়ুনির বীরেন্দ্র সৈনিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সঞ্জয় শাহের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে নিশ্চিত করেছে। নেপালি সেনাবাহিনী, নেপাল পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বল এবং প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বিদেশি উদ্ধারকারী দল এখনো ওই প্রকল্পে অন্য কোনো সদস্যের বেঁচে থাকার সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

উদ্ধার হওয়া দুজনেরই হাত ও পায়ে আঘাত রয়েছে। সম্ভবত সুড়ঙ্গের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে চলার কারণে এসব আঘাত হয়েছে। বিবিসিকে নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (এনইএ) জানিয়েছে, তারা অক্সিজেনের ঘাটতিতেও ভুগছেন। দুই শ্রমিককে উদ্ধারের পেছনে ছিল দীর্ঘ ও জটিল অভিযান। বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে পৌঁছাতেই উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন লেগে যায়। শুক্রবার উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে ক্ষীণ সাড়া পাওয়ার কথা জানান। অস্ট্রেলিয়ার উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স এএফপিকে বলেন, উদ্ধারকারীরা তাদের আশ্বস্ত করেন এবং এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে দুই শ্রমিককে জীবিত বের করে আনতে সক্ষম হন।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, কাদায় ভরা একটি সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে উদ্ধারকারীরা প্রথম শ্রমিক সঞ্জয় শাহকে বের করে আনছেন। তাকে দাঁড়াতে সহায়তা করার পর একপর্যায়ে উদ্ধারকারীদের পিঠে করে হেলিকপ্টারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তিনি হাত উঁচিয়ে সাড়া দিচ্ছিলেন। অপর শ্রমিক কবির মহার্জনকে কাদায় মাখা অবস্থায় স্ট্রেচারে করে বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা। উদ্ধারের সময় তার দুই হাত ছিল প্রার্থনার ভঙ্গিতে। উদ্ধারের পর সেনাবাহিনীর চিকিৎসা দলকে সঞ্জয় শাহ জানান, পানি ঢুকতে শুরু করলে সেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন লোক উপস্থিত ছিলেন। নিজের দায়িত্ববোধ থেকে সবাইকে নিরাপদে বের করে দিতে গিয়ে নিজেই আটকে পড়েন তিনি। তিনি বলেন, ‘সবাইকে বাঁচাতে গিয়ে আমি সবাইকে দৌড়াতে বলি। এতে আমার সময় নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত আমি আর বের হতে পারিনি।’ বিবিসি নেপালকে সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, শুধু এই ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সুড়ঙ্গ থেকেই তারা অন্তত ৪২ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে পারবেন বলে আশা করছেন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে ভবন, পাথর ও পলিমাটি মিলিয়ে অন্তত ২২ লাখ টন ধ্বংসস্তূপের সৃষ্টি হয়েছে। বিশাল পাথর ও ঢলের পানির সঙ্গে ভেসে আসা কাদা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলো প্লাবিত করে প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক সুড়ঙ্গ গভীর কাদায় তলিয়ে গেছে। কর্র্তৃপক্ষের ধারণা, সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা বাতাসের বুদ্বুদের (এয়ার পকেট) কারণে শ্রমিকেরা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকতে পারেন।

৬০০ শিক্ষার্থীর সন্ধান মিলছে না : গত ২৬ আগস্টের ভোতেকোশী নদীর প্রলয়ংকারী বন্যায় নেপালের রাসুয়া ও নুওয়াকোট জেলায় আনুমানিক ৬০০ শিক্ষার্থী নিখোঁজ রয়েছে। সকালের দিকে ধেয়ে আসা এই ভয়াবহ ঢলে বসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় পাঁচটি স্থানীয় প্রশাসনিক অঞ্চলে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় শিক্ষা উন্নয়ন ও সমন্বয় ইউনিট (ইডিসিইউ), স্থানীয় সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রসুয়ায় আনুমানিক ২৮০ জন এবং প্রতিবেশী নুওয়াকোট জেলায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন শিশু নিখোঁজ রয়েছে।