একই মানুষকে আমরা কখনো খুব কাছ থেকে দেখি, আবার কখনো দূর থেকে। দূর থেকে যে মানুষটিকে কঠিন মনে হয়েছিল, কাছে গেলে হয়তো দেখা যায় তার ক্লান্তি। যাকে মনে হয়েছিল দুর্বল, কাছে গেলে চোখে পড়ে তার দীর্ঘ লড়াই। মানুষটি বদলায় না; দূরত্বের কমবেশিতে বদলে যায় আমাদের দেখা। একই মানুষ, একই পথ, একই শহর অথচ একটু সরে গিয়ে ফিরে তাকালেই পরিচিত পৃথিবী হঠাৎ হাজির হয় নতুন বিস্ময় নিয়ে।
আমরা পৃথিবীকে সাধারণত দেখি চোখের স্বাভাবিক উচ্চতা থেকে। তাই সেই দেখা আমাদের কাছে চেনা, অভ্যস্ত। কিন্তু চোখের অভ্যস্ত পথের বাইরে গিয়ে ক্যামেরা যখন খুঁজে নেয় এক অনভ্যস্ত দৃষ্টিকোণ, তখন দৃশ্যের ভেতরেও বদলে যায় সম্পর্কের সংজ্ঞা। মাটির কাছাকাছি নেমে আসা ক্যামেরা একজন মানুষকে করে তুলতে পারে দীর্ঘ, দৃঢ় ও প্রত্যয়ী। আবার ওপর থেকে তাকালে সেই মানুষটিকেই মনে হতে পারে ক্ষুদ্র, একাকী ও অসহায়। কাছে থাকা বস্তু বড় হয়ে ওঠে, দূরের বস্তু দেখায় ছোট। বদলে যায় আকার, দূরত্ব ও গভীরতা। আর তার সঙ্গে বদলে যায় ছবির অর্থ ও অনুভব। সৌন্দর্য শুধু দৃশ্যের মধ্যে নয়, লুকিয়ে থাকে দেখার ভঙ্গিতেও।
এই দেখার ভঙ্গিই পার্সপেক্টিভ। ক্যামেরার অবস্থান ও দৃষ্টিকোণের কারণে দৃশ্যের বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক যেভাবে বদলে যায়, মূলত তারই ভাষা পার্সপেক্টিভ। অর্থাৎ পার্সপেক্টিভ দৃশ্যের সঙ্গে আলোকচিত্রীর এক ধরনের কথোপকথন। কখনো মাটির কাছে নেমে, কখনো একটু উঁচুতে উঠে, কখনোবা কেবল কয়েক কদম পাশে সরে গিয়ে তিনি একই দৃশ্যের অন্য একটি দুয়ার খুলে দিতে পারেন। হয়তো এ কারণেই পাখির চোখে দেখা পৃথিবী আমাদের এত বিস্মিত করে! যে শহরের ওপর দিয়ে আমরা প্রতিদিন চলি, আকাশ থেকে সেটিই হঠাৎ হয়ে ওঠে রেখা আর ছায়ার বিমূর্ত নকশা। নদী হয়ে যায় রুপালি রেখা, মানুষ হয়ে যায় চলমান বিন্দু, পথ হয়ে ওঠে অদৃশ্য কোনো হাতে আঁকা দীর্ঘ রেখাচিত্র। ড্রোনের চোখ আমাদের সেই পৃথিবীটাই দেখিয়ে দেয় শুধু এমন এক উচ্চতা থেকে, যেখানে আমাদের অভ্যস্ত চোখ পৌঁছাতে পারে না।
পুরনো জাহাজের গায়ে হাতুড়ির শব্দ, লোহার গন্ধ, ভারী শিকল, শ্রমিকের ব্যস্ততা ডকইয়ার্ডের এসব বহুবার দেখা। এমন পরিচিত জায়গায় ছবি তুলতে গেলে একসময় সবকিছুই গতানুগতিক মনে হয়। কোনো দৃশ্যই তখন আর চোখে নতুন করে আবেদন সৃষ্টি করে না। এবার একদল উৎসাহী নবীন আলোকচিত্রীর সঙ্গে সদরঘাটে গিয়ে তাই নতুন কোনো দৃশ্য খুঁজিনি; খুঁজেছিলাম নতুন করে দেখার একটি পথ। ভাবছিলাম, ডকইয়ার্ডের শ্রমজীবনের ছবি দর্শক কত শতবার দেখেছেন। এই দেখার অভ্যাসকে এবার একটু নাড়িয়ে দেওয়ার আয়োজন করলে কেমন হয়? সেই ভাবনা থেকেই ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়েছিলাম একেবারে অস্বাভাবিক একটি জায়গায়। প্রথম দেখায় ছবিটি যেন একটু থমকে দেয়। শিকলের পাশে কোনো নিথর দেহ কি ঝুলে আছে? কিন্তু চোখ যখন ধীরে ধীরে ছবির ভেতর হাঁটতে শুরু করে, তখন সেই ভুল দেখার আবরণ খুলে যায়। পাদুকাসহ পা দুটির অবস্থান, শিকলের ভার, পেছনে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা, জাহাজের উপস্থিতি সব মিলিয়ে ছবিটি তার সত্য প্রকাশ করে। এটি মৃত্যুর দৃশ্য নয়; এটি শ্রমের দৃশ্য। স্থবিরতার নয়, চলমান জীবনের গল্প।
ছবির এমন সামান্য বিভ্রমই দর্শককে থামিয়ে দেয়। অনেক ছবি আমরা দেখি, কিন্তু সব ছবি চোখকে থামাতে পারে না। কোনো কোনো ছবি প্রথম দেখাতেই সব কথা বলে দেয়; কোনো কোনো ছবি বরং এঁকে দেয় একটি অদৃশ্য প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দর্শকের চোখ যখন ছবির গভীরে প্রবেশ করে, গল্পটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পার্সপেক্টিভ তখন শুধু দৃশ্যকে বদলায় না, বদলে দেয় দর্শকের দেখার অভিজ্ঞতাকেও।
তাই পার্সপেক্টিভ শুধু অদ্ভুত অ্যাঙ্গেলের সন্ধান নয়; বরং পরিচিত পৃথিবীতে অপরিচিত আলোর আবিষ্কার; চেনা দৃশ্যের মধ্যে অচেনা সম্ভাবনার খোঁজ। কখনো কয়েক কদম সরে গেলেই, কখনো একটু নিচু হয়ে বসলেই, আবার কখনো সামান্য উঁচুতে উঠে দাঁড়ালেই বদলে যেতে পারে পুরো দৃশ্যের ভাষা।
পৃথিবী সবসময় নতুন কিছু দেখানোর জন্য অপেক্ষা করে না। মাঝেমাঝে সে শুধু অপেক্ষা করে আমরা নতুন করে তাকে দেখব বলে। আমাদের দাঁড়ানোর জায়গাটি বদলে গেলেই বদলে যেতে পারে পৃথিবীকে ঘিরে আমাদের চেনা গল্প। ডালিম ফুলের মতো রাঙা লাল শাড়িতে বারবার দেখা নারী একসময় ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কত আপন! অথচ দূরত্ব বদলে দিয়েছিল দীর্ঘ বিরতিতে তাকে রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখার অভিজ্ঞতা
মনে হলো, কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে,
যে দূরত্ব সর্ষেক্ষেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে।
থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা;
চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে।
পার্সপেক্টিভ তাই শুধু আলোকচিত্রের নান্দনিক পাঠ নয়, কখনো কখনো এক নীরব জীবনবোধ। আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, কতটা কাছে কিংবা কতটা দূরে তাতে যেমন বদলে যায় চোখের দর্শন, তেমনি বদলে যেতে পারে জীবনেরও দর্শন।
লেখক : আলোকচিত্রী ও ব্যাংক কর্মকর্তা