৩০ বছরেও রহস্য কাটেনি মামলায় নতুন মোড়

প্রায় তিন দশক আগে রাজধানীর ইস্কাটনের একটি বাসায় যে মৃত্যু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগৎকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, সেই মৃত্যুর রহস্য আজও কাটেনি। বরং ৩০ বছর পূর্ণ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে সালমান শাহর (প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) মৃত্যু নতুন করে ফৌজদারি তদন্তের কেন্দ্রে। ১৯৯৬ সালে যে ঘটনাকে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল, ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে সেটি হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তে যায়। আর ২০২৬ সালে এসে মামলার এক আসামি গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ বারবার পেছানোর মধ্য দিয়ে পুরনো প্রশ্নগুলো আবার নতুন করে সামনে এসেছে।

এ বিষয়ে গতকাল শনিবার রাতে মোবাইল ফোনে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তিনি বলেন, ছেলে হত্যার বিচারের জন্য ৩০ বছর চাপ সহ্য করেছি। গুম করে ফেলা এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে প্রতিনিয়ত, এই দেশে ছেলে হত্যার বিচার চাওয়া কী অপরাধ? হত্যাকা-ে জড়িত এক আসামি গ্রেপ্তারের পর এখন ছেলে হত্যার বিচার পাওয়ার আশা করছি। তারপরও যদি বিচার না পাই, তাহলে মনে করব এই সরকারের ওপর আগের সরকারের প্রভাব রয়েছে। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালে হত্যা মামলা হলেও এখন সময় ক্ষেপণ করছে তদন্ত সংস্থা। সিআইডি কোনো আসামি গ্রেপ্তার করেনি। অন্য সংস্থা গ্রেপ্তার করে তাদের দিয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার দিন যারা বাসায় ছিল, তাদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে বলে মনে করি।’ এতদিন এটাকে হত্যা মামলা হিসেবে না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী প্রথমেই হত্যা মামলা করার জন্য এজাহার দেয়। কিন্তু পুলিশ সেটাকে ঘুরিয়ে অপমৃত্যু মামলা হিসেবে রেকর্ড করে। পরে আওয়ামী লীগ সরকার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আমাকে প্রথমে তাদের দলে ভেড়ায়। পরে ছেলে হত্যার বিচার নিয়ে কথা বললে গুম ও হত্যার হুমকি দেয়। পিবিআইয়ের বনজ কুমার এই মামলা শেষ করতে সাংবাদিক ডেকে নাটক শুরু করে।’

এদিকে আজ ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এফডিসি সালমানকে ঘিরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সেই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে নীলা চৌধুরী বলেন, ‘প্রথমে দোয়া ও স্মরণসভা করার কথা জানানো হয়েছে। পরে তিন দিনব্যাপী সালমান শাহর ছবি দেখানোর কথা বলা হয়েছে। আমি চাই না ছেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে আনন্দ ফুর্তি হোক।’ দেশবাসীর কাছে ছেলের জন্য দোয়া চান তিনি।

সর্বশেষ, গত ৩০ আগস্ট সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ নবমবারের মতো পিছিয়েছে। সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় সময় যত গড়িয়েছে, ঘটনাটি ঘিরে প্রশ্ন ও আইনি লড়াই ততই নতুন মোড় নিয়েছে।

গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হন মামলার অন্যতম আসামি ও অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন। পরে মামলার তদন্ত সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০ আগস্ট আদালত ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে এখন পর্যন্ত সিআইডি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। এর আগে তার জামিন আবেদনও নাকচ করেছেন আদালত।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের সেই মৃত্যু এখন আবারও নতুন করে তদন্তের কেন্দ্রে। একদিকে অতীতের একাধিক তদন্তে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বা অপমৃত্যু বলা হয়েছে। তবে ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে সেটিই নতুন করে হত্যা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা এবং তদন্ত শুরুর পেছনে নতুন কি তথ্য ছিল সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

মৃত্যুর পরের দিন রমনা থানায় প্রথমে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ওঠেএটি কি সত্যিই আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকা-? ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমানের বাবা ছেলেকে হত্যা করা হয়েছেএমন অভিযোগ এনে আদালতে আবেদন করেন। আদালত অপমৃত্যুর মামলা ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন।

প্রথম তদন্তে ‘আত্মহত্যা’: তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সেই প্রতিবেদন মেনে নেয়নি তার পরিবার। সালমানের বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন। এরপর ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত বিষয়টি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায়। দীর্ঘ সময় পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সেই প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয় এবং ঘটনাটিকে অপমৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মায়ের আপত্তি : বাবার মৃত্যুর পর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী আইনি লড়াই চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। তিনি সালমানের মৃত্যুর পেছনে ১১ জনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। এরপর মামলাটি র‌্যাবের কাছে তদন্তের জন্য যায়। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের আগস্টে আদালত র‌্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই আদালতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেই তদন্তেও সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের বক্তব্য ছিল, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নানা কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং স্ত্রী সামীরার কারণে মা নীলা চৌধুরী থেকে দূরে থাকার মানসিক যন্ত্রণার কথাও উল্লেখ করা হয়। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার একটি আদালত পিবিআইয়ের সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে এবং মামলাটি নিষ্পত্তি করে। কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি সালমান শাহর পরিবারের আইনি লড়াই।

২০২২ সালে আবার আদালতে পরিবার : পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণের পর ২০২২ সালের ১২ জুন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম ওই আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আসে ২০২৫ সালের গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

২৯ বছর পর ‘হত্যা মামলা’ : ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যুর মামলাকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের ওই আদেশের পরদিন, ২১ অক্টোবর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম।

মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামীরা হক, ব্যবসায়ী ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, সামীরার মা লতিফা হক লুছি, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, এ সাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আরও কয়েক ব্যক্তিকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একমাত্র ডনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। বাকি আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

দেহাবশেষ উত্তোলন : নতুন তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের মে মাসে সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে সুরতহাল ও পুনরায় ময়নাতদন্তের অনুমতি চাওয়া হয়। আদালত ২০ মে দেহাবশেষ উত্তোলনের অনুমতি দেয়। তবে সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম পরে ওই আদেশ বাতিলের আবেদন করেন। ২৩ জুন আদালতে আবেদনটি নথিভুক্ত হয়। দেহাবশেষ উত্তোলন হবে কি নাএ নিয়ে ওই সময় আদালত প্রাঙ্গণে বিভ্রান্তিও তৈরি হয়েছিল। ফলে বিষয়টি তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে।

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, অন্য আসামিদের অবস্থান শনাক্ত এবং তার বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা সম্পর্কে তথ্য জানতে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। পরে ২৭ আগস্ট আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

নতুন তদন্তে সালমান শাহর মৃত্যুর কারণ পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্নও সামনে এসেছে। তিন দশক পর কোনো মৃতদেহের অবশিষ্টাংশ থেকে কতটা নির্ভরযোগ্য ফরেনসিক তথ্য পাওয়া সম্ভবএটিও একটি বড় বৈজ্ঞানিক ও আইনি প্রশ্ন। কারণ ফরেনসিক তদন্ত শুধু কোনো একটি আলামতের ওপর নির্ভর করে না। ঘটনাস্থলের তথ্য, ময়নাতদন্ত, সাক্ষ্য, সময়ের ক্রম, যোগাযোগের রেকর্ড, পারিপার্শ্বিক তথ্য এবং অন্যান্য আলামতসবকিছুকে মিলিয়ে একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করতে হয়।

৩০ বছরের প্রশ্নআত্মহত্যা নাকি হত্যা : সিআইডিকে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ার পরই স্পষ্ট হবেনতুন তদন্তে হত্যার অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, নাকি আগের তদন্তগুলোর সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।

হত্যা মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) গোলাম বেনজীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এই মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। তবে ডনের রিমান্ড মঞ্জুর হলেও এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। এই সপ্তাহে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মামলা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।

এক নজরে সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে তদন্ত :

১৯৯৬  মৃত্যু ও অপমৃত্যুর মামলা।

১৯৯৭  সিআইডি : আত্মহত্যা।

২০০৩  বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ।

২০১৪  বিচার বিভাগীয় তদন্ত : হত্যা নয়, অপমৃত্যু।

২০১৫-১৬পরিবারের নারাজি, র‌্যাবের তদন্তের উদ্যোগ, পরে পিবিআই।

২০২০  পিবিআই : ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত।

২০২১  আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ।

২০২৫  আদালতের নির্দেশে অপমৃত্যুর মামলা হত্যা মামলা হিসেবে পুনরায় তদন্ত।

২০২৬  সিআইডি তদন্ত, ডন গ্রেপ্তার ও রিমান্ড, তদন্ত প্রতিবেদন বারবার পেছানো।

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬  সর্বশেষ নির্ধারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ।