তথ্যের কারসাজিতে অর্থ পাচার

গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএআই) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাণিজ্যের আড়ালে ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যার বার্ষিক গড় প্রায় ৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। পণ্যের মূল্য বেশি বা কম দেখানো, ভুল পণ্যের বর্ণনা ও এইচএস কোড ব্যবহার, পণ্যের পরিমাণ বা মান সম্পর্কে ভুল তথ্য, ভুয়া বা একাধিক ইনভয়েস, মিথ্যা শিপিং ডকুমেন্ট, অস্বাভাবিক ফ্রেইট ও ইন্স্যুরেন্স মূল্য, রিলেটেড পার্টির সঙ্গে লেনদেন এবং অস্বাভাবিক অ্যাডভান্স পেমেন্টসহ বিভিন্ন কৌশলে বাণিজ্যের আড়ালে এসব অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় ট্রেড বেউজড মানিলন্ডারিং (টিবিএমএল) প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য একত্রিত করা, পাঁচ বছরের বাণিজ্য তথ্য নিয়ে কমন প্রাইস ভেরিফিকেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি, কাস্টমসের অ্যাসিকুডা সিস্টেমে ব্যাংকের প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার, শিপিং ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারের তথ্য বিশ্লেষণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুনের সভাপতিত্বে টিবিএমএল প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, দুদক, সিআইডি, এনবিআরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, কাস্টমস এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। গত ৩১ আগস্ট সভার কার্যবিররণী প্রকাশ করা হয়।

সভায় বলা হয় বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে অর্থ পাচারের টিবিএমএল ঝুঁকি বাড়ছে।  বাণিজ্যিক লেনদেনে আড়ালে অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তর বা প্রকৃত মালিকানা গোপন করতে ওভার ইনভয়েসিং-আন্ডার ইনভয়েসিং, পণ্যের ভুল বর্ণনা, ভুল এইচএস কোড ব্যবহার, পণ্যের পরিমাণ বা গুণগত মান সম্পর্কে ভুল তথ্য প্রদান, ভুয়া বা একাধিক ইনভয়েস, ভুয়া শিপিং ডকুমেন্ট, অস্বাভাবিক ফ্রেইট ও ইন্স্যুরেন্স মূল্য, রিলেটেড পার্টির সঙ্গে লেনদেন এবং অস্বাভাবিক অ্যাডভান্স পেমেন্ট এবং বাণিজ্যের অস্বাভাবিক মুভমেন্টসহ হয়।

সভায় বলা হয়,  টিবিএমএল প্রতিরোধে কাস্টমস ডিকলারেশন, আমদানি-রপ্তানির ডকুমেন্টস, শিপিং ইনফরমেশন, প্রোডাক্ট ক্লাসিফিকেশন, ডিক্লারড ভ্যালু এবং সংশ্লিষ্ট মালিকানা ও ট্রানজেকশন প্রোফাইলের তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কিন্তু তথ্যের বিচ্ছিন্নতা, তথ্য বিনিময়ের সীমাবদ্ধতা, মূল্য যাচাইয়ের অভিন্ন পদ্ধতির অভাব, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অপারেশনাল প্রসেসের মধ্যে সমন্বয় ঘাটতি এবং তথ্য আদান-প্রদানের সীমাবদ্ধতা টিবিএমএল প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান।

সভায় বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিটি ধাপে আলাদা আলাদা সংস্থা যুক্ত। আমদানি-রপ্তানির অনুমোদন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, ব্যাংকিং কার্যক্রম, কাস্টমস শুল্কায়ন, পণ্য খালাস, শিপিং ও রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসন প্রতিটি পর্যায়ে তৈরি হয় আলাদা তথ্য। একটি ব্যাংকের কাছে কোনো প্রতিষ্ঠানের এলসি, গ্রাহকের কাস্টমার প্রোফাইল, পেমেন্ট এবং ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য থাকতে পারে। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত মূল্য, কাস্টমস কী মূল্য নির্ধারণ করেছে বা একই পণ্য আগেরবার কী দামে আমদানি হয়েছিল এসব তথ্য ব্যাংকের কাছে সব সময় সহজলভ্য নয়। আবার কাস্টমসের কাছে থাকা তথ্যের সঙ্গে ব্যাংকের অর্থপ্রবাহের তথ্য সরাসরি যুক্ত না থাকলে একটি লেনদেনের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এ কারণে ব্যাংক ও কাস্টমসের তথ্যের মধে ডেটা লিংকেজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলা থেকে শুরু করে বিদেশে অর্থ পরিশোধ, পণ্য দেশে আসা, কাস্টমসের মূল্যায়ন, পণ্য খালাস এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক নথি সব তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় যাচাই করার প্রস্তাব করা হয়। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যেসব কারণে অর্থ পাচার হয় ওনারা সেগুলো ভালোভাবেই শনাক্ত করেছেন। কিন্তু শনাক্তকরণের পরিপ্রেক্ষিতে যে পদক্ষেপগুলো নিতে হবে, এটাকে আমরা নির্মূল বা কমাতে চাই। অনেক সময় ওভার ইনভয়েস-আন্ডার ইনভয়েস করে টাকা পাচার করে। তারপর ফলস ডিক্লারেশন দেয়, বিদেশ থেকে আমাদের যারা রেমিট্যান্স পাঠায় তাদের কাছ থেকে ফরেন কারেন্সি সংগ্রহ করে এ দেশ থেকে টাকা দেওয়া হয়। এগুলো জানা কথা। এ ক্ষেত্রে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রযুক্তিকে ব্যবহার বাড়াতে হবে, যারা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের শাস্তি দিতে হবে।

এক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই : সভায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিভিন্ন এজেন্সির অংশগ্রহণ ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে জানিয়ে বলা হয়, অর্থ পাচারের মূল সমস্যাগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরা হয় তথ্যের বিচ্ছিন্নতা। বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলেও তাদের কাছে থাকা তথ্য সমন্বিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে সিসিআইঅ্যান্ডই, আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি সনদ দেয়। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠান বাস্তবে ঘোষিত ধরনের ব্যবসা করে কি না, তা ব্যাংকের পক্ষে সব সময় যাচাই করা কঠিন। একইভাবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (বিডা) কোনো প্রতিষ্ঠানকে কী ধরনের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে, তা যাচাইয়ের জন্য ব্যাংকের কাছে কার্যকর অনলাইন ব্যবস্থা না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হয় বলে সভায় জানানো হয়। কাস্টমস কোনো পণ্যের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করেছে, সেই তথ্যও ব্যাংকের কাছে সহজে না থাকায় এলসি খোলার সময় মূল্য যাচাইয়ে ব্যাংকগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে ওপেন সোর্স বা বাণিজ্যিক সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কারণে কাস্টমসের এমআইএস ডেটাবেজে ব্যাংকের প্রবেশাধিকার অথবা প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যাংকের সঙ্গে নিরাপদে বিনিময়ের জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ ছাড়া ইনডেন্টের পণ্যের দাম যাচাইও কঠিন। ইনডেন্টর ব্যাংককে যে পণ্যমূল্য সরবরাহ করছে, সেটি প্রকৃত বাজারমূল্য কি না তা যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে নেই।

ক্রেডিট রিপোর্ট থাকলেও নজরদারি কম : সভায় নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি আমদানির ক্ষেত্রে ক্রেডিট রিপোর্ট নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও রপ্তানির ক্ষেত্রে একই বাধ্যবাধকতা নেই। তবে শুধু রিপোর্ট নেওয়াই যথেষ্ট নয়। আমদানির ক্ষেত্রে অনেক সময় ক্রেডিট রিপোর্ট ভালোভাবে পর্যালোচনা না করেই এলসি খোলা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের রেটিং খারাপ হওয়া বা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন থাকার পরও তার সঙ্গে এলসি স্থাপন করা হলে অর্থ পাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে এলসি খোলার আগে ক্রেডিট রিপোর্ট যথাযথভাবে পর্যালোচনা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠানের লেনদেনেও নজর : সভায় বলা হয়, অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে অনেক সময় বাবা-মা, সন্তান বা নিকটাত্মীয়ের নামে আলাদা প্রতিষ্ঠান গঠন করা হতে পারে। পরে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে রিলেটেড পার্টির সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট ও কার্যকর করা যায় কি না, তা বিবেচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি মতামত দেওয়া হয়।

কনটেইনার কোথায়, জানার উদ্যোগ : আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য বাস্তবে কোথায় রয়েছে এবং কোন পথে পরিবহন হচ্ছে, তা যাচাই করাও টিবিএমএল প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের কনটেইনার ট্র্যাকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে। কিন্তু সফটওয়্যারের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, ব্যবহার ব্যয় এবং সীমিত সাবস্ক্রিপশনের কারণে সব ব্যাংক সমানভাবে সুবিধা পায় না।

এ কারণে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ব্যুরোর (আইএমবি) কনটেইনার ট্র্যাকিং সেবা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। সব ব্যাংকের অংশগ্রহণে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে আইএমবির সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার বিষয়ে মতামত দেওয়া হয়।

কাস্টমস মূল্য বাড়ালে ব্যাংককে জানানো হয় না : সভায় জানানো হয়, অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকারক ঘোষিত পণ্যমূল্য গ্রহণ না করে কাস্টমস মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে শুল্ক আদায় করে। কিন্তু সেই পুনর্মূল্যায়িত মূল্য ব্যাংক ও কাস্টমসের কাছে থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন বা কার্যক্রম হিসেবে রিপোর্ট করা হয় না। কোনো আমদানিকারক পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে থাকলে এবং কাস্টমস পরে মূল্য বাড়িয়ে নির্ধারণ করলে সেটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির সংকেত হতে পারে। এ ধরনের ঘটনা ব্যাংকগুলোকে মনিটর করতে হবে এবং সন্দেহজনক হলে বিএফআইইউতে রিপোর্ট করার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় মানিলন্ডারিং মামলা করা যায় কি না, তা কাস্টমস কর্র্তৃপক্ষকে যাচাই করতে হবে।

আসাইকুডায় ব্যাংকের প্রবেশাধিকার : বৈদেশিক বাণিজ্যের তথ্য যাচাইয়ে আসাইকুডা সিস্টেমে ব্যাংকের প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। ব্যাংকগুলো যাতে রপ্তানি পণ্যের সাধারণ ম্যানিফেস্ট (ইজিএম), আমদানি পণ্যের সাধারণ ম্যানিফেস্ট (আইজিএম) এবং বিল অব এক্সপোর্টের প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে ব্যাংকের কাছে থাকা এলসি, অর্থ পরিশোধ ও গ্রাহকের তথ্যের সঙ্গে কাস্টমসের প্রকৃত পণ্য ও শিপমেন্টের তথ্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পণ্যের প্রকৃত মূল্য : সভায় পণ্যের প্রকৃত মূল্য যাচাইকে টিবিএমএল প্রতিরোধের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শুধু ইনভয়েসে লেখা দাম দেখে পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা যথেষ্ট নয়। একই বা একই ধরনের পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, আগের লেনদেনের মূল্য, পণ্যের মান ও বৈশিষ্ট্য, উৎপাদনের দেশ, ফ্রেইট, বিমা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

এজন্য কাস্টমসের বিদ্যমান মূল্যসংক্রান্ত তথ্যভা-ার ব্যবহার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কাস্টমসের তথ্য সমন্বয় এবং অভিন্ন রেফারেন্স ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। সন্দেহজনক মূল্য পার্থক্য দেখা গেলে এনহ্যান্সড স্ক্রুটিনি (বর্ধিত ও গভীর যাচাই) করার প্রস্তাব রাখা হয়।

পাঁচ বছরের ট্রেড ডাটা এক প্ল্যাটফর্মে : সভায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশের গত পাঁচ বছরের আমদানি-রপ্তানির তথ্য নিয়ে একটি কমন প্রাইস ভেরিফিকেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এই প্ল্যাটফর্মে পণ্যের মূল্য, পণ্যের ধরন, পরিমাণ, এইচএস কোড, উৎসদেশ, আগের লেনদেন, ফ্রেইট, বিমা এবং অন্যান্য তথ্য থাকলে ব্যাংকগুলো এলসি খোলার আগে পণ্যের ঘোষিত মূল্য তুলনা করে দেখতে পারবে। একই সঙ্গে রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক মূল্য যাচাইয়ের জন্য সব ব্যাংককে অভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা হয়। সভায় ব্লুমবার্গ (আর্থিক ও বাজার তথ্য সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্ম) ও রয়টার্স (আন্তর্জাতিক সংবাদ ও আর্থিক তথ্যসেবা) এর মতো স্বনামধন্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়।

দরকার একটি আন্তঃসংস্থার স্টিয়ারিং কমিটি : সভায় বলা হয়, টিবিএমএল প্রতিরোধে একটি প্রতিষ্ঠান একা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে না। কারণ অর্থ পাচারের একটি লেনদেনের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সংস্থার কাছে থাকে। ব্যাংকের কাছে থাকে অর্থপ্রবাহ, কাস্টমসের কাছে পণ্যের তথ্য, বিএফআইইউর কাছে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্য। এসব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা না গেলে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনের পুরো চিত্র সামনে আসে না। এজন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে আন্তঃসংস্থার একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়।

এ ছাড়া সভায় ফ্রোজেন ফুড ও স্টক লট পোশাকে ঝুঁকি, ফ্রেইট ও শিপিং তথ্য যাচাই, অ্যাডভান্সড পেমেন্ট, ডুকমেন্ট ভেরিফিকেশন ও ইন্সপেকশনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

সভায় আলোচিত বিষয়গুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট-বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার শনাক্তে শুধু সন্দেহজনক লেনদেন দেখলেই হবে না; একই লেনদেনের পেছনে থাকা পণ্য, মূল্য, কাগজপত্র, পরিবহন, আমদানিকারক-রপ্তানিকারকের সম্পর্ক এবং অর্থপ্রবাহ একসঙ্গে নজরদারি করতে হবে। এজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, অপরাধ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, তদন্ত এবং সফল আইন প্রয়োগের ফলাফল দৃশ্যমান করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। এজন্য ১০ দফা কৌশল নির্ধারণ করা হয়। এসব দফার মধ্যে রয়েছে প্রথমত- গত পাঁচ বছরের ট্রেড ডাটা নিয়ে কমন প্রাইস ভেরিফিকেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি। দ্বিতীয়ত- পিপিপি মডেলের আওতায় আন্তঃসংস্থা স্টিয়ারিং কমিটি গঠন। তৃতীয়ত- রিলেটেড পার্টি, গ্রুপ অব কোম্পানিজ, অ্যাডভান্স পেমেন্ট, অস্বাভাবিক মূল্য, বায়ার্স ক্রেডিট ও উচ্চঝুঁকির বাণিজ্যে বাড়তি যাচাই। চতুর্থত- রিলেটেড পার্টির সংজ্ঞা আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করার বিষয় বিবেচনা। পঞ্চম- ব্যাংকগুলোর জন্য আসাইকুডা সিস্টেমে ইজিএম, আইজিএম ও বিল অব এক্সপোর্টের প্রয়োজনীয় তথ্য পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি। যষ্ঠত- ফ্রোজেন ফুড, স্টক লট আরএমজি ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার-সংক্রান্ত ঝুঁকি বিবেচনায় নীতিমালা পর্যালোচনা। সপ্তম- সব ব্যাংকের অংশগ্রহণে কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে আইএমবির কনটেইনার ট্র্যাকিং সেবা গ্রহণ। অষ্টম- রিয়েল-টাইম প্রাইস ভেরিফিকেশনের জন্য আন্তর্জাতিক মানের অভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহারের উদ্যোগ। নবম কাস্টমস কর্র্তৃক মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা আমদানি লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে মনিটরিং এবং সন্দেহজনক হলে বিএফআইইউতে রিপোর্টের ব্যবস্থা এবং সর্বশেষ মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের টিবিএমএল প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, তদন্ত ও সফল আইন প্রয়োগের সক্ষমতা সমন্বিতভাবে তুলে ধরা।