মঞ্জু সরকার একজন অসাধারণ ঔপন্যাসিক। গড়পড়তা লেখক নন, জাত কথাশিল্পী। দীর্ঘদিন ধরে লিখলেও তিনি প্রাপ্য প্রচার ও স্বীকৃতি পাননি। সমাজ ও মানুষকে দেখার গভীর দৃষ্টি এবং সমকালীন বিষয়কে সাহিত্যে তুলে ধরার ক্ষমতাই তার বড় শক্তি। মঞ্জু সরকারের লেখায় প্রান্তিক ও অন্ত্যজ মানুষের জীবন, বৃহৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা উঠে এসেছে।
মঞ্জু সরকার অবশ্য একটি ব্যাপারে আর দশজনের থেকে স্বতন্ত্র। কারণ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুযোগ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে শুধু লেখক হওয়ার ব্রত নিয়েই রংপুর থেকে ঢাকায় আসেন। এজন্য তার বাবার সঙ্গে প্রচণ্ড তিক্ততা সৃষ্টি হয় এবং পিতা তাকে এক রকম ত্যাজ্যই ঘোষণা করেন। কিন্তু মঞ্জু সরকার কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে, সামনে চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে ঢাকায় এসে পথে-ঘাটে, মেসে কাটিয়ে লেখক হওয়ার প্রস্তুতি নেন। লেখক হওয়ার জন্য জীবনের প্রচলিত নিরাপত্তা ছেড়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃষ্টান্ত এখানে কিংবা পশ্চিমবঙ্গেও আছে বলে আমার জানা নেই। তার লেখক জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, সাহিত্যকে তিনি জীবনের একমাত্র সাধনা হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।
আমি মনে করি, জীবনকে মঞ্জু সরকার বাস্তবিকই একজন জাত কথাসাহিত্যিকের চোখ দিয়েই দেখেছেন। তার কথাসাহিত্যে মানুষ তার চারপাশের সমাজ, শ্রেণি, সম্পর্ক, বঞ্চনা, আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলেই পূর্ণতা পায়। বিশেষ করে প্রান্তিক ও অন্ত্যজ মানুষের জীবন তার লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তার গল্প ও উপন্যাসে বঞ্চিত মানুষের জীবনযাপন যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে তাদের চারপাশের ক্ষমতার কাঠামো ও সামাজিক টানাপড়েন।
মঞ্জু সরকারের উপন্যাসের পরিসরও কম বিস্তৃত নয়। তমস, অচল ঘাটের আখ্যান, প্রতিমা উপাখ্যান, অন্তর্দাহ, নগ্ন আগন্তুকসহ তার বিভিন্ন উপন্যাসে সমাজ ও মানুষের নানা স্তর ভিন্ন ভিন্নভাবে উপস্থিত হয়েছে। অন্তর্দাহর মতো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসেও কেবল যুদ্ধের ঘটনাই নয়, জনজীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে গ্রামজীবনে ফেরার বাসনা মঞ্জু সরকারের জন্য শেষে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। বাইবেলীয় রূপক প্রচ্ছন্নভাবে ব্যবহার করে মঞ্জু সরকার তার গ্রামে শখের বাগান গড়তে গিয়ে গ্রামীণ মানুষের ও নিকটজনদের ভেতর নানা জাতের সাপের উপস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে শেষে স্ত্রীর সিদ্ধান্তে সায় দিয়ে শহরে ফিরে আসেন।
মঞ্জু সরকার মওলানা ভাসানীকে নিয়ে এ দেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস লিখতে চেয়েছেন। এ দেশে বায়োফিকশন লেখা হয়েছে, কিন্তু মঞ্জু সরকার আমাদের একজন অনন্যসাধারণ রাজনীতিবিদের জীবনকে শব্দের কারুকাজে শিল্পে রূপান্তরিত করার সক্ষমতা রাখেন বলে আমার বিশ্বাস। মওলানা ভাসানীকে নিয়ে মঞ্জু সরকারের কাছে আমি একটি বড় উপন্যাসেরই প্রত্যাশা করি।
কেননা, জাতীয় জীবন ও রাজনীতিতে মওলানা ভাসানী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল একটি চরিত্র হলেও তাকে ফিকশনে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে নির্মাণের কাজ এখনো হয়নি। মানুষের সঙ্গে ভাসানীর সম্পর্ক, কনট্রাডিকশন এবং মানুষকে প্রভাবিত বা ম্যানিপুলেট করার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি একটি বড় উপন্যাসের উপযুক্ত চরিত্র। তাকে নিয়ে ইতিহাস লেখা হয়েছে, রাজনৈতিক মূল্যায়ন হয়েছে; কিন্তু ইতিহাসের চরিত্রকে সাহিত্যের চরিত্রে রূপান্তর করার কাজ আলাদা। প্রবন্ধে কোনো ব্যক্তিকে তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যায়, কিন্তু রক্ত-মাংসের চরিত্র হিসেবে নির্মাণের কাজ ফিকশন লেখকের।
মঞ্জু সরকারের শক্তি এখানেই যে, তিনি মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন। তার দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের অভিজ্ঞতা, সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় এবং সমকালীন বাস্তবতার প্রতি তার নিবিড় মনোযোগ তাকে এমন একটি কাজের জন্য প্রস্তুত করেছে বলে আমার বিশ্বাস। মওলানা ভাসানীর মতো বহুমাত্রিক ও বৈপরীত্যপূর্ণ চরিত্রকে উপন্যাসে নির্মাণ করতে গেলে শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস জানলেই হবে না; প্রয়োজন হবে মানুষটিকে তার সময়, সম্পর্ক, বিশ্বাস, দ্বন্দ্ব ও দুর্বলতাসহ অনুভব করার ক্ষমতা। একজন ঔপন্যাসিকের কাজ সেখানেই।
আমি চাই, মওলানা ভাসানীকে নিয়ে মঞ্জু সরকারের উপন্যাসটি যেন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের আখ্যান না হয়; হয়ে উঠুক তার সময়ের সমাজ ও মানুষেরও এক বিস্তৃত শিল্পিত প্রতিচ্ছবি। যে মঞ্জু সরকার তার সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই প্রান্তিক মানুষের জীবন ও বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে লিখেছেন, তার হাতে ভাসানীর মতো একটি চরিত্র নতুন মাত্রা পেতে পারে। এই উপন্যাসটি যেন হয় মঞ্জু সরকারের মাস্টারপিস।
মঞ্জু সরকার দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন। তার লেখার মূল্যায়ন আরও বিস্তৃত হওয়া দরকার, তার উপন্যাস নিয়ে আরও গভীর আলোচনা প্রয়োজন। একজন লেখককে শুধু তার প্রাপ্ত স্বীকৃতির হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না; তার লেখার ভেতরে সময় ও মানুষের যে চিহ্ন তিনি রেখে যান, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার সাহিত্যিক অবস্থান নির্ধারণ করে। মঞ্জু সরকারের সেই চিহ্নটি আমাদের কথাসাহিত্যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করি।