চকরিয়ায় ৬ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

কক্সবাজারের চকরিয়ায় প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের কাজ শুরুর পরই নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্মাণাধীন সড়কে কাদামিশ্রিত বালু, নিম্নমানের ইটের খোয়া ও পুরোনো ইটের গুঁড়া ব্যবহার করা হচ্ছে। কয়েকটি বক্স কালভার্ট নির্মাণেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের নিয়মিত তদারকি দেখা যায়নি বলে অভিযোগ তাদের। অথচ প্রকল্পের কাজ শুরুর নির্দেশপত্রে নির্মাণসামগ্রীর নমুনা অনুমোদন, নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি শর্ত অনুসরণ এবং কাজের নিবিড় তদারকির নির্দেশ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

চকরিয়ার বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের ফাদুখোলা-নন্দীরবিল সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ৫ কোটি ৯৮ লাখ ১৭ হাজার ৪৬০ টাকা ৮৯৭ পয়সা। প্রাক্কলিত ব্যয় ৬ কোটি ২৯ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৯ টাকা। গত ১৪ জানুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম্মু কনস্ট্রাকশনকে কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ কাজ শুরু হয়ে ২১ জুলাই ২০২৭ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সড়কের শূন্য থেকে ২ হাজার ১৫০ মিটার পর্যন্ত অংশ প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ করা হবে। ৭৭০ থেকে ৮৬৭ দশমিক ২০ মিটার পর্যন্ত পাকা ঢালাই সড়ক নির্মাণের কথা রয়েছে। এ ছাড়া ৩ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্থের একটি এবং দেড় মিটার দৈর্ঘ্য ও দেড় মিটার প্রস্থের ১০টি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। 

গত ১ সেপ্টেম্বর প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে এসব অভিযোগের কথা জানা যায়। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, সড়কের কাজে ব্যবহৃত কিছু বালুতে মাটির পরিমাণ বেশি। কোথাও কোথাও কাদামিশ্রিত বালু দিয়েই কাজ করা হচ্ছে। তাদের দাবি, মাতামুহুরী নদী থেকে উত্তোলন করা বালুও প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। সড়কের ভিত তৈরিতে ব্যবহৃত ইটের খোয়ার মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু জায়গায় নিম্নমানের ইটের খোয়া ও পুরোনো ইটের গুঁড়া ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্থানীয় এলাকাবাসীর এমন অভিযোগের ভিত্তিতে চলমান প্রকল্পটি সরেজমিন ঘুরে তার সত্যতা পাওয়া যায়। কাজ চলমান থাকা অবস্থায় সেখানে এলজিইডির পক্ষ থেকে তদারকির জন্য কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দেখা যায়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তাদের ইচ্ছেমতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কাজটিতে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ইটের খোয়া, মাতামুহুরি নদীর কাদাযুক্ত বালু, পুরনো ইটের গুড়া। একই সাথে কালভার্টগুলোর কাজ মেশিনের মাধ্যমে করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে মানুষ দিয়ে। কালভার্টের ঢালাইয়ে পর্যাপ্ত সিমেন্ট ব্যবহার না করার পাশাপাশি জং ধরা রড ব্যবহারের দৃশ্যটিও দেখা গেছে।

এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরিত কাজ শুরুর নির্দেশপত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্মাণসামগ্রী প্রকল্প এলাকায় সরবরাহের আগে নমুনা অনুমোদনের জন্য জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত নকশা, নির্মাণ পরিকল্পনা ও কারিগরি শর্ত অনুসরণ করে কাজ করার নির্দেশ রয়েছে। কাজের নিবিড় তদারকির জন্য উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের কথাও উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি চকরিয়া উপজেলা প্রকৌশলীকে নকশা ও নির্ধারিত নির্মাণমান অনুযায়ী কাজ তদারকিরও নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ অবস্থায় প্রকল্পে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর নমুনা যথাযথভাবে পরীক্ষা ও অনুমোদন করা হয়েছে কি না, পরীক্ষা হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী এবং মাঠে ব্যবহৃত সামগ্রী অনুমোদিত নমুনার সঙ্গে মিলছে কি না, এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি বক্স কালভার্ট নির্মাণের সময়ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও তদারকি দেখা যায়নি। 

প্রকল্প এলাকায় গিয়ে প্রকল্পের নাম, ব্যয়, কাজের পরিমাণ, বাস্তবায়নের সময়সীমা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামসংবলিত কোনো দৃশ্যমান তথ্যফলকও দেখা যায়নি। সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের এসব তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে দৃশ্যমান না থাকায় প্রকল্পের কাজ ও ব্যয় নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স এম্মু কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মো. রুকন উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রকল্পের কাজে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না বলে দাবি করেন। বিস্তারিত জানতে তার ব্যবস্থাপক বাবলার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে ব্যবস্থাপক বাবলার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এলজিইডির উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন বলেন, কাজটি দুর্গম এলাকায় হওয়ায় সেখানে নিয়মিত যাতায়াতে কিছুটা সমস্যা হয়। তাই আমার পক্ষ থেকে সেখানে একজনকে কাজ দেখার জন্য রাখা হয়েছে। আমিও মাঝে মাঝে গিয়ে কাজ দেখে আসি। অনিয়মের বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

চকরিয়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আরিফ হোসেন বলেন, কাজটি উপসহকারী প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন তদারকি করছেন। প্রকল্পটির কাজ সম্পর্কে আমার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। শিগগিরই প্রকল্পটি পরিদর্শন করা হবে। পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।