বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস গড়ার পর এবার বছরের সবচেয়ে সম্মানজনক ব্যক্তিগত পুরস্কার ‘ব্যালন ডি’অর’ জয়ের বিষয়ে দারুণ আশাবাদী রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে। একইসঙ্গে ট্রফি ও দলের জন্য অবদান রাখা নিয়ে চলতে থাকা বিতর্ক এবং সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, মাঠের খেলায় তিনি এমন কিছু করে দেখান যা আর দশজন ফুটবলার পারে না। কাল মঙ্গলবার থেকে শুরু চ্যাম্পিয়নস লিগের মূল পর্বের প্রথম ম্যাচে ইন্তার মিলানের মুখোমুখি হওয়ার আগে আজ মাদ্রিদে সংবাদ সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন এমবাপ্পে।
ইন্তার মিলানের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে মাঠে নামছে রিয়াল মাদ্রিদ। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে আপনি এবং আপনার দল কেমন বোধ করছেন?
কিলিয়ান এমবাপ্পে: চ্যাম্পিয়নস লিগে ফিরতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। এই প্রতিযোগিতায় আমরা সবসময়ই সর্বোচ্চ রোমাঞ্চ ও দৃঢ়তা নিয়ে খেলি। আর আমরা যাত্রা শুরু করছি নিজেদের মাঠ বার্নাব্যুতে, যা খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা। কালকের ম্যাচটি খুবই চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে, তবে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলাটা উপভোগের বিষয়।
আপনাকে এবং ভিনিসিয়ুসকে নিয়ে একটি বিতর্ক চলছে যে, আপনারা দুজন মাঠে একসাথে মানানসই নন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
এমবাপ্পে: বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ও বড় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদকে ঘিরে গড়ে ওঠা লাখ লাখ মতামতের মধ্যে এটি একটি। মুখের কথায় তো আমার নিয়ন্ত্রণ নেই। আমাদের সবার লক্ষ্য এক—রিয়াল মাদ্রিদকে ম্যাচ ও ট্রফি জেতানো। মানুষ গঠনমূলক মতামত দিলে আমরা তা শুনব এবং নিজেদের আরও উন্নত করার চেষ্টা করব।
আপনার, ভিনিসিয়ুস ও বেলিংহামের থেকে সেরাটা বের করে আনতে কোচ হোসে মরিনহোর সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
এমবাপ্পে: একাদশ মাঠে নামে তাদের সবার মধ্যে সঠিক সংযোগ তৈরি করে সেরাটা বের করার এক দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি আমার আছে। দল থেকে নির্দিষ্ট তিনজনকে আলাদা করে বিচার করায় আমি বিশ্বাসী নই। এটি গণমাধ্যমের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে কারণ এতে মুখরোচক খবর তৈরি হয়, তবে আমি সবসময় দলগতভাবে চিন্তা করি।
টানা দুই মৌসুম কোনো ট্রফি না পাওয়ায় সমর্থকদের হতাশার বিপরীতে আপনার ভেতরে কি কোনো দায়বদ্ধতা কাজ করছে?
এমবাপ্পে: আমি শুধু সামনের ম্যাচগুলো নিয়ে ভাবছি। রিয়াল মাদ্রিদে প্রতিদিন নতুন অভিজ্ঞতা হয়, তাই বেশি দূর নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই। ইন্তারের বিপক্ষে কীভাবে নিজের সেরাটা দিয়ে দলকে জয় এনে দেওয়া যায়, সেদিকেই আমার পুরো মনোযোগ।
মরিনহো বলেছেন, 'আমরা জানি সেরা খেলোয়াড় কোথায় আছে,' যা সবাই আপনার দিকেই নির্দেশ বলে মনে করছেন। আপনি কি মনে করেন যে ব্যালন ডি’অর আপনার প্রাপ্য?
এমবাপ্পে: বিশ্বের সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে খেললে এ ধরনের ব্যক্তিগত ও দলীয় পুরষ্কারের সাথে নামটি স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। রাস্তায় বের হলে অনেকেই আমাকে ব্যালন ডি’অর বিজয়ী হিসেবে দেখতে চাওয়ার কথা বলেন। এই গ্রীষ্মে বিশ্বকাপ আসরে আমি অনেক ইতিহাস গড়েছি। অনুভূতি বলছে এবার বিজয়ী হওয়ার ভালো সুযোগ আছে, তবে সাংবাদিকেরা যাকে সেরা মনে করবেন তাকেই ভোট দেবেন।
ব্যালন ডি’অর পান বা না পান—নিজেকে কি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় মনে হয়?
এমবাপ্পে: (হেসে) আমার নিজের দৃষ্টিতে সবসময়ই আমি সেরা! তবে এটি ব্যক্তিগত বিষয়। আপনি হয়তো আমাকে সেরা ভাবতে পারেন, আবার অন্য কেউ নাও ভাবতে পারে। সবাই একই মতামত রাখবে—এমনটা ভাবা ভুল।
গোলদাতার কাছে প্রশ্নটি অস্বাভাবিক শোনালেও জানতে চাই—দলের রক্ষণে বা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে কি এমবাপ্পে আর ভিনিসিয়ুসের আরও ভূমিকা রাখা উচিত?
এমবাপ্পে: শুধু আমি আর ভিনিসিয়ুস? (নীরবতা)... খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে, এটি স্বাভাবিক। তবে আমি যদি চালাকি করে বলি, আপনি যাদের নাম বললেন (দেম্বলে ও রাফিনহা) তাদের চেয়ে আমি অনেক বেশি গোল করি এবং আমার পর্যায়ে আসতে তাদের আরও গোল করতে হবে! আমি তুলনা পছন্দ করি না কারণ আমি এমন অনেক কাজ করি যা অন্যরা করে না। তবে এটি সত্যি যে রক্ষণভাগকে সহায়তা করতে ও কম গোল হজম করতে আমার এবং রিয়ালের সব খেলোয়াড়েরই কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
বলা হচ্ছে যে দলে শৃঙ্খলার অভাব ছিল বলেই মরিনহোককে আনা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?
এমবাপ্পে: ‘শুনেছি’ বা ‘বলা হচ্ছে’ টাইপ কথা দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। কে বলছে? সবাই তো কিছু না কিছু বলে! মরিনিয়ো এমন একজন ব্যক্তি যিনি কীভাবে জেতাতে হয় তা জানেন। তিনি পুরো ক্লাব এবং দলকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের দিকে চালিত করার ক্ষমতা রাখেন।
সাবেক কোচদের সময়ের চেয়ে এখন কি ড্রেসিংরুমের পরিবেশের কোনো উন্নতি লক্ষ্য করছেন?
এমবাপ্পে: গত বছরের চেয়ে পরিবেশ খারাপ ছিল—এমন ধারণা কেন আসছে বুঝতে পারছি না। পরিবেশ আগের মতোই চমৎকার আছে। শুধু কোচ পরিবর্তন হয়েছে। আমরা মৌসুমের সেরা প্রস্তুতি নিয়েছি। বেতিসের কাছে হারলেও আমরা ভালো খেলেছি, কেবল গোল পাওয়া ছাড়া। গোল করার সেই দায়িত্বটা আমার। দল পুরোপুরি শান্ত ও ইতিবাচক আছে।
ট্রফি ছাড়া ৬০ গোলের চেয়ে ট্রফিসহ ৪০ গোল করা এমবাপ্পেকে পছন্দ করবেন বলে জানিয়েছেন মরিনিয়ো। আপনিও কি এই হিসাব সমর্থন করেন?
এমবাপ্পে: ট্রফিসহ ৩০ গোল দিলেও আমি রাজি! (হাসি)। তবে এটি একপ্রকার নিরর্থক বিতর্ক। আমি ৪০ গোল করার পর কি গোল করা বন্ধ করে দেব যাতে মানুষের কথা সত্যি হয়? খেলোয়াড় হিসেবে আমরা মাঠের ভেতরের বিষয় নিয়েই ভাবি। যদি ট্রফি ও গোলের মধ্যে বেছে নিতে হয়, আমি ট্রফিকেই প্রাধান্য দেব। তবে গোল করা এবং ট্রফি জেতা—দুটো কাজ একসাথে করাই সম্ভব।
বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে হার কি আপনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের?
এমবাপ্পে: জাতীয় দল ও ক্লাব সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জায়গা। বিশ্বকাপ জিততে না পারাটা কঠিন ছিল, তবে এই আসর আমাদের দেশের মানুষের সাথে এক গভীর আত্মিক টান তৈরি করে দিয়েছে। হার-জিত যাই হোক, ট্রফি জয়ের ক্ষুধা সবসময়ই থাকে। যেদিন সেই ক্ষুধা হারিয়ে যাবে, সেদিনই ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সময় হবে।
রিয়াল মাদ্রিদে কি নিজেকে আরও বড় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন?
এমবাপ্পে: ফরাসি জাতীয় দলে আমি অধিনায়ক, আর এখানে আমি অধিনায়ক নই—দুটো ভিন্ন প্রেক্ষাপট। তবে নিজের পারফরম্যান্স উন্নত করার তাগিদ সবসময়ই থাকে। অনেক কোচের অধীনে খেলে খেলার কৌশল ও পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে আমার অনেক পরিপক্কতা এসেছে, যা প্রতিদিন আমাকে খেলোয়াড় হিসেবে সমৃদ্ধ করছে।
আপনার ক্লাব ছাড়ার পরপরই পিএসজির টানা দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়কে অনেকেই আপনার বিদায়ের সাথে যুক্ত করে দেখছেন, এটি কি আপনার কাছে অন্যায় মনে হয়?
এমবাপ্পে: (একটু থেমে) এটি ফুটবলের একটি বিশ্লেষণমাত্র, যা পাল্টানোর সাধ্য আমার নেই। তবে সত্যি বলতে, এতে আমার কিছুই যায় আসে না। আমি ফুটবল বুঝি এবং জানি কেন এমনটা ঘটেছে। অনেক সময় খেলার চেয়ে সংবাদ বেচাকেনাটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। আমাকে নিয়ে আলোচনা করলে খবর ভালো বিক্রি হয়—তাই মানুষ ভালো বা মন্দ আলোচনা করবেই, এতে কোনো সমস্যা নেই।