‘হামের টিকা না কেনা’ অর্থ অন্তর্বর্তী সরকার কোন খাতে ব্যয় করেছে

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৯ মাসে হামের টিকা সংগ্রহ না করায় দেশের অনেক শিশু মারা গেছে, অথচ ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দের সব টাকা ব্যয় করা হয়েছে। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে হামের টিকার এই অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন সংসদ সদস্য মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা। জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বরাদ্দকৃত অর্থ প্রধানত দুটি খাতে ব্যয় করা হয় বলে জানান।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে এবং স্বাস্থ্যসেবা বজায় রাখতে মোট ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় উন্নয়নে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে এই অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। বরাদ্দকৃত অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রধান খাতে ব্যয় করা হয়েছে। প্রথমত, পরিচালন খাতে চিকিৎসাকেন্দ্র ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান। রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ। চিকিৎসা অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক খরচ। দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সংগ্রহ। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে শিশুদের হাম রুবেলাসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধক টিকার সংগ্রহ ও দেশব্যাপী বিতরণ।

অটোরিকশার জন্য আসছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং : ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে একটি ডিজিটাল, নিবন্ধিত ও শৃঙ্খলিত ব্যবস্থার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এক নোটিসের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, অটোরিকশা চালকদের কর্মসংস্থান অক্ষুণœ রেখে ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্রুতই নতুন নীতিমালা ও বিধিমালা কার্যকর করা হচ্ছে। এই নীতিমালার অধীনে প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম যুক্ত করা হবে, যাতে একটি নম্বরের অধীনে অবৈধভাবে একাধিক রিকশা চালানোর সুযোগ না থাকে। একই সঙ্গে লেদ-এসিড ব্যাটারি তুলে দিয়ে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক রিকশা চলাচলের ওপর কঠোর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর ৭১ বিধিতে আনীত নোটিসের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অটোরিকশা ও ইজিবাইকের দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সারা দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। বিপরীতে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩৩শ। শুধু রাজধানীতেই প্রায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট চলছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে প্রতি বছর সরকারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশেই যুক্ত ছিল অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা।

সাড়ে ১১ হাজার চিকিৎসক পদ শূন্য : সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসকের ১১ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি করা হবে। এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এসব ইউনিটে সাধারণ রোগের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হবে। প্রতিটি ইউনিটে থাকবে মিনি ল্যাবরেটরি ও ফার্মেসি। এর অধীনে থাকবে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক।

ঢাকার চারপাশে চালু হবে ওয়াটার বাস : সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজধানীর যানজট কমানো ও নৌপথকে জনপ্রিয় করতে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথে আবারও ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণের বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রী জানান, নদীদূষণের উৎস হিসেবে ৪২৪টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে এবং দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম জানান, নৌপথে দুর্ঘটনা কমাতে এক ইঞ্জিনের পরিবর্তে দুই ইঞ্জিনের লঞ্চ পরিচালনায় মালিকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের যেসব জায়গা অবৈধভাবে লিজ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাতিল করা হচ্ছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে বন্দরের সব জায়গা পুরোপুরি দখলমুক্ত করা হবে। সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহনমন্ত্রী জানান, গত ৩৫ বছরে দেশে নৌ-দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৫২ জন মারা গেছেন এবং ৮০৭ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে নৌযানের বিরুদ্ধে ৪৭ হাজার ৬০৬টি মামলা করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৯ হাজার ৯৩৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নারের’ নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব : দেশের সরকারি-বেসরকারি পাঠাগার ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপন করা ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নারের’ নাম পরিবর্তন করে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই কর্নার’ করার প্রস্তাব দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ। জবাবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, জাতীয় পর্যায় থেকে গ্রাম পর্যন্ত দেশে অনেক পাবলিক লাইব্রেরি রয়েছে। সংসদ সদস্য যেসব লাইব্রেরির কথা বলেছেন, সেগুলো সরকারের আওতায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংসদ সদস্য ফাহমিদা হকের প্রশ্নের জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী জানান, সরকার একটি জাতীয় ডিজিটাল সাংস্কৃতিক ভা-ার প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। গেজেটভুক্ত ৫৫৪টি স্থাবর প্রতœতাত্ত্বিক স্থানের তালিকা ইতিমধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া পান্ডুলিপি, লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন সংরক্ষণ, সেগুলোকে বিশ্বব্যাপী সহজলভ্য করা এবং ডিজিটাল আর্কাইভে রূপান্তরের জন্য আর্কাইভ ও গ্রন্থাগার বিভাগ ২৩৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জাতীয় ওলামা পরামর্শক কমিটি গঠন : সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) জানিয়েছেন, ধর্মীয় বিভ্রান্তি নিরসন ও সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সামাজিক সংঘাত প্রতিরোধে বিভিন্ন মত ও পথের আলেম-ওলামাদের সম্পৃক্ত করে জাতীয় ওলামা পরামর্শক কমিটি গঠনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে ধর্মমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরে সংগৃহীত জাকাতের পরিমাণ ৭ কোটি টাকা।