আর কি কখনো বিশ্বকাপ জিতবে ব্রাজিল?

ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পেলের জাদুকরী পা, হলুদ জার্সির ঐতিহ্য আর সাম্বা নৃত্যের ছন্দ। অথচ সেই গৌরবের সিংহাসন আজ চরম সংকটে। কার্লো আনচেলত্তির দল যখন এক অন্ধকার সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সেলেসাওদের এমন করুণ দশা নিয়ে বোমা ফাটিয়েছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি মিডফিল্ডার পাউলো সিলাস।

শেষ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে দলের বিদায় এবং সামগ্রিক অধঃপতন নিয়ে ইএসপিএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সোজাসাপ্টা মন্তব্য করে ১৯৮৯ সালের কোপা আমেরিকা জয়ী এই তারকা বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের পক্ষে আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া খুবই কঠিন হবে।’ 

১৯৮৬ ও ১৯৯০ বিশ্বকাপের অংশ নেওয়া এই সাবেক তারকা এখানেই থেমে থাকেননি। ব্রাজিলের ফুটবল কাঠামো এবং আধুনিক প্রজন্মের মানসিকতা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে গিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মোহ এবং ক্লাবের ভুল নীতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। সেলেসাওদের এই সংকট নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ব্রাজিল অনেক দিন ধরে কোনো প্রকৃত নম্বর ১০ বা নম্বর ৯ পজিশনের খেলোয়াড় পাচ্ছে না; সবাই এখন ডান উইংয়ে খেলতে চায়। আমাদের ভালো কোনো ফুল-ব্যাক নেই, কারণ কেউ এখন আর ফুল-ব্যাক হতে চায় না; কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় ফোন হাতে পোজ দিলে তো আর লাইক পাওয়া যায় না!’ 

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বর্তমান ফর্ম এবং নিজেদের দুর্দশার তুলনা টেনে সিলাস জানান, ‘আর্জেন্টিনা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। এমনকি কোনো বড় ট্রফি না জিতেও পর্তুগাল আমাদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। আমাদের ফুটবলের শিকড়েই বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে।’

এছাড়া ক্লাব ফুটবলের ব্যর্থতার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, গ্রেমিওর মতো বড় ক্লাবগুলো জাতীয় দলে খেলে না এমন ১৩ জন বিদেশি খেলোয়াড়কে দলে ভিড়িয়ে স্থানীয় তরুণদের বিকাশ আটকে দিচ্ছে, যা জাতীয় দলের ভবিষ্যৎকে আরও অন্ধকার করে তুলছে।

তবে দলের বর্তমান প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির প্রতি সমর্থন জানিয়ে সিলাস বলেন, ‘আমি আনচেলত্তিকে পছন্দ করি, এসি মিলানে একসঙ্গে খেলার সুবাদে আমি তাকে চিনি। সমস্যা কোচকে নিয়ে নয়, সমস্যা আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে। কারণ আজকের দিনের বাচ্চারা জানেই না তাদের আসল আদর্শ কে।’ এমনকি ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ‘সুপারস্টার’ না বলে ‘উৎকৃষ্ট খেলোয়াড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। সিবিএফ-এর প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতার প্রসঙ্গ টেনে সিলাস আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের দেশে গত চার বছরে চারজন সভাপতি পরিবর্তন হয়েছে। এমন বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে কীভাবে একটি দল সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারে?’ 

ব্রাজিল ফুটবলের এই ব্যবচ্ছেদ কেবল একটি দলের হার-জিতের গল্প নয়; এটি একসময়ের অপ্রতিরোধ্য এক ফুটবল সংস্কৃতির শেকড়ে উইপোকার মতো বাসা বাঁধা সংকটের প্রতিচ্ছবি।  মাঠের ছন্দ হারিয়ে সাম্বা নৃত্যের এই দেশ হয়তো সত্যিই কেবল স্মৃতির পাতাতেই খুঁজে ফিরবে তাদের সুদূর অতীতের সেই গৌরবময় দিনগুলোকে।