এআই প্রযুক্তি ও ব্যবহারকারীর ইচ্ছা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যাপক প্রসার, বিশেষত সাম্প্রতিককালে বৃহৎ ভাষা মডেল বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) এবং এই প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত চ্যাটবট ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিরুদ্ধে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য কি কোনো এআই ভাষা মডেলের প্রশিক্ষণ ডেটার অংশ? সেসব মডেলে দেওয়া আমাদের নির্দেশাবলী কি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সরকার বা কোনো তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে আমাদের না জানিয়ে হস্তান্তর করা হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সন্ধান দরকার বৃহৎ স্বার্থ ও প্রয়োজনে।  দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা ব্যক্তিগত তথ্য এবং আধুনিক এআই টুলগুলোকে ক্ষতিকর অসামাজিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার ঝুঁকি বাড়ছে। ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষিত জেনারেটিভ এআই টুলগুলো মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি তাদের পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সম্পর্কিত তথ্যও সংরক্ষণ বা মুখস্থ করে রাখতে পারে। এই তথ্য পরবর্তী সময় স্পিয়ার-ফিশিংসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে পারে; যেখানে অন্যের পরিচয় চুরি বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ইন্টারনেটের বাণিজ্যিকীকরণ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ডেটা সংগ্রহের কারণে বিগত বছরগুলোতে আমরা যে ধরনের গোপনীয়তার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছি, এআইয়ের জনপ্রিয়তা তার অনেকগুলোর বিস্তৃতি প্রসারিত করছে। কিন্তু ঝুঁকি আগের মতোই রয়ে গেছে। পার্থক্যটা হয়েছে কেবল পরিধিতে।

 এআই সিস্টেমগুলোর তথ্যক্ষুধা ব্যাপক এবং তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া বেশিরভাগ সময়ই অস্বচ্ছ। তাই ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে কী তথ্য, কখন, কীভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা কীসের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, কোন প্রক্রিয়ায় ও  কত সময়ব্যাপী সংরক্ষণ করা হবে, নির্দিষ্ট সময়ান্তে কীভাবে সেগুলো বিনষ্ট করা হবে, আমরা কীভাবে এ ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সংশোধন বা সেখান থেকে মুছে ফেলতে পারি প্রভৃতির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ এখন বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। জীবনবৃত্তান্ত বা ছবির মতো ডেটা, যা আমরা কোনো একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে শেয়ার বা পোস্ট করেছি, তা প্রায়ই আমাদের অজান্তে বা সম্মতি ছাড়াই এবং কখনো কখনো সরাসরি নাগরিক অধিকারের বিপরীতে গিয়ে এআই সিস্টেমকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য নতুন করে ব্যবহার করা হচ্ছে।  কয়েক দিন আগেই সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদসূত্রে জানা গেল সম্প্রতি দেশীয় একটি জব সাইট থেকে বিপুল পরিমাণ সিভি ডার্ক ওয়েবে বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। আবার  এআইয়ের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থী বাছাই করতে এবং নিয়োগকর্তাদের শূন্য পদের জন্য কাকে সাক্ষাৎকার নিতে হবে তা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করার জন্য ভবিষ্যদ্বাণীমূলক এআই সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। দুনিয়ায় এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে চাকরিপ্রার্থী বাছাইয়ে সাহায্য করার জন্য ব্যবহৃত এআই প্রযুক্তি স্পষ্টতই পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। আরেকটি উদাহরণ হলো অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করার জন্য ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার। স্বভাবতই এটা ভাবা সহজ, ফেসিয়াল রিকগনিশনের মতো এআই টুল থাকা আমাদের সমাজের জন্য ভালো। কারণ এটি অপরাধী ও খারাপ লোকদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে আইন প্রয়োগকারীদের সহায়তা করবে।

প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ ও বিচারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। যেমন ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি  সাফল্য দেখা গেছে। তবে এও সত্য, বিদ্যমান অধিকাংশ মুখ শনাক্তকরণ অ্যালগরিদমগুলোকে প্রশিক্ষণ দিতে ব্যবহৃত ডেটার অন্তর্নিহিত পক্ষপাতিত্বের কারণে পৃথিবীর অনেক দেশে পক্ষপাতমূলকভাবে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের অসংখ্য মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার হতে দেখা গেছে, যেখানে অ্যালগরিদমগুলো এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, কেবল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভুলভাবে শনাক্ত করে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট পেশাজীবীরা যেমন চিকিৎসক, পুলিশ, কর এবং অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবী, আইনজীবী, বিচারক, ব্যাংক ও বীমা কর্মকর্তা প্রভৃতি পেশার মানুষ পেশাগত কাজে এলএলএম টুল ব্যবহার করলে এবং সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্ন গোপন তথ্য গণহারে সেখানে প্রদান করলে তার নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এভাবে ব্যক্তির গোপনীয় তথ্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারে পেশাজীবীদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। মেটা সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, ইনস্টাগ্রামের পাবলিক প্রোফাইলে শেয়ারকৃত ছবি এআই ইমেক তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে। কেউ সেটি না চাইলে তাকে নিজ উদ্যোগে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেটিংসে গিয়ে অপশনটি বন্ধ করেতে হবে। অথচ বিধানটি হওয়া উচিত ছিল, মেটা পাবলিক প্রোফাইল হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীর ছবি এআইতে ব্যবহারের সুযোগ পাবে না।

বরং এক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর নিকট থেকে প্রত্যক্ষ সম্মতি নিতে হবে। কারণ ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট তৈরির সময় এ বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং তার ছবি বা ভিডিও যেকোনো কাজে ব্যবহৃত হবে সে সম্পর্কে আগাম সম্মতিও দিয়ে রাখেননি। ঠিক তেমনি চ্যাটজিপিটি, ক্লড, ডিপসিক, জেমিনির মতো প্রচলিত এলএলএম মডেলেরও উচিত ব্যবহারকারীর তথ্য মডেল উন্নতিকরণ বা প্রশিক্ষণে ব্যবহারকারীর তথ্য ব্যবহারের আগে স্পষ্ট সম্মতি নিয়ে নেওয়া। যেকোনো ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত এবং শেয়ারকৃত তথ্য বাণিজ্যিক বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করতে চাইলে প্রত্যক্ষ সম্মতি নেওয়া আবশ্যক হওয়া উচিত। কেউ যখন অনলাইনে কিছু ব্রাউজ করেন বা কোনো এলএলএম কিংবা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, তখন ব্যবহারকারীর নিজ ইচ্ছায় কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত তার তথ্য সংগ্রহ করা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এমনকি সেক্ষেত্রে ব্যবহারকারী বা গ্রাহক সম্মতি না দিলে সে সম্পর্কিত তথ্যকে সর্বজনীন বলে গণ্য করাও সমীচীন নয়।

লেখক : আয়ারল্যান্ডে ডক্টরাল গবেষণারত। সহযোগী অধ্যাপক (শিক্ষা ছুটিতে), আইন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।