‘১০০ পুলিশ থাকলেও গুলি করে মেরে ফেলব’

‘টাকা না পাঠালে অনেক বড় বিপদ হয়ে যাবে। তোমার পেছনে আমাদের লোক লাগানো আছে। তোমার গাড়ির নম্বরও আছে। ১০০ জন পুলিশ থাকলেও তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলব। রোগী সেজে তোমাকে মেরে ফেলা হবে, চেম্বারে গিয়ে।’ চট্টগ্রামে এম ওয়াই এফ পারভেজ নামে এক চিকিৎসককে এভাবেই হত্যার হুমকি দিয়েছেন আলোচিত সন্ত্রাসী মো. রায়হান। ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় মোবাইল ফোনে গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে এ হুমকি দেওয়া হয়। ‘আমি রায়হান কে, তুমি চিন না। বেয়াদবি করতেছ। ১০ লাখ টাকার বদলে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে’ বলেন রায়হান।

কয়েক দফায় এই হুমকি দেওয়ার ঘটনায় গত ৩ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন চিকিৎসক পারভেজ। ডায়েরিতে তিনি উল্লেখ করেন, রোগীদের সিরিয়াল লেখার জন্য তার যে মোবাইল নম্বরটি রয়েছে, সেখানে গত ২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টা ৫৪ মিনিটে একটি বিদেশি নম্বর থেকে এক ব্যক্তি ফোন করেন। তার সহকারী হ্যাপি বড়ুয়া কলটি রিসিভ করেন। তখন ওই ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা বলতে চান। এরপর হ্যাপি বড়ুয়া মোবাইল ফোনটি চিকিৎসককে দেন। মোবাইল ফোনের অন্য প্রান্তে থাকা ব্যক্তি নিজেকে বড় সাজ্জাদ বলে পরিচয় দেন। তার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ লাখ টাকা রেডি রাখতে বলেন। নইলে যেকোনো সময় চেম্বারে এসে মেরে ফেলার হুমকি দেন।’

এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত সোমবার রাতে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন কামরুল হাসান ওরফে সাগর (২৫), মো. রিকু (২৫), মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রোহিত (২০), আহমদুল্লাহ ওরফে মাসুম মেম্বর (৪০), আহমদ রেজা শাকিল (২৫), মো. মানিক (৪০) ও নুরুল আলম। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, আটক ব্যক্তিরা পলাতক শীর্ষ বড় সাজ্জাদ কিংবা রায়হানের নির্দেশে চাঁদা দাবি করেন।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, চাঁদা না পেয়ে চিকিৎসককে হুমকির পর পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ফোনকল ও যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি গোপন সূত্রে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আগে গ্রেপ্তার ডেভিড ইমন ও গলাকাটা মোবারককে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি আরও বলেন, আটক ব্যক্তিরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে বিদেশি নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করতেন।

টার্গেট ব্যক্তিদের সম্পর্কে আগে তথ্য সংগ্রহ করে পরে ডেভিড ইমন, গলাকাটা মোবারক, বড় সাজ্জাদ ও রায়হানের মতো পরিচিত সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে ভয় দেখানো হতো। তবে তারা মূলত নিজেদের পৃথক চাঁদাবাজ চক্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ডাকাতির প্রস্তুতি, অপহরণ ও হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মাসুদ আলম বলেন, ‘গ্রেপ্তার সাতজন বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছে সন্ত্রাসী রায়হান, বড় সাজ্জাদসহ আন্য সন্ত্রাসীর পরিচয়ে চাঁদা দাবি এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছে। তারা চিকিৎসক পারভেজকেও হুমকি দিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।’

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার সবাই কারাবন্দি ‘সন্ত্রাসী’ মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনের সহযোগী। ডেভিড ইমন বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পরিচিত। ভুক্তভোগী চিকিৎসক এম ওয়াইএফ পারভেজ হাটহাজারী উপজেলার চিকনদন্ডী ইউনিয়নের বাসিন্দা। স্থানীয় আমান বাজারে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চেম্বার করেন তিনি।

হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত ও অডিও বার্তা পাঠিয়ে চাঁদা দাবি ও হত্যার হুমকির ঘটনায় আতঙ্কে আছেন চিকিৎসক পারভেজ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘চাঁদা চাওয়ার পর থেকে আতঙ্কে আছি। কারণ পেশাগত প্রয়োজনে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। পুলিশ চাঁদাবাজ চক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করায় স্বস্তিতে আছি। তবে মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করতে হবে।’

পুলিশ বলছে, ‘যশোর হয়ে ভারতে পালানোর সময় গত ২৯ জুলাই সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ইমন কারাগারে থাকলেও তার কিছু সহযোগী ভয়ভীতি দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে আসছেন।’