নজিরবিহীন ঘটনা আপিল বিভাগে

একটি মামলায় এক আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা খরচা (কস্ট) আরোপ এবং এ সংক্রান্তে কথোপকথনের জেরে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর এজলাস ত্যাগ করার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার কিছু পরে আপিল বিভাগের ১ নম্বর এজলাসে (প্রধান বিচারপতির এজলাস) নজিরবিহীন এ ঘটনা ঘটে। এমনিতে আপিল বিভাগের কার্যক্রম দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত চললেও গতকাল এ ঘটনার পর আদালত আর বসেনি। নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ সংক্রান্ত এ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (সুপ্রিম কোর্ট বার) সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন ও প্রধান বিচারপতির মধ্যে এ কথোপকথন হয়।

প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এই বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি। এ ঘটনার পর দুপুরে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল তার নিজ কার্যালয়ে এবং মাহবুব উদ্দিন খোকন সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। 

আদালতে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে ঘটনার বিষয়ে বলেন, কর্মদিবসে আপিল বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয় সকাল ৯টা থেকে। গতকাল সকাল ৯টার কিছু পরে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ এক আদেশে একই বিষয়ে একাধিক রিট আবেদন করা এবং আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগে রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহমেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা খরচা আরোপের আদেশ দেয়। এই টাকা আদেশের এক মাসের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দিতে নির্দেশ দেয় সর্বোচ্চ আদালত। তবে, আদেশের সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন এজলাসে ছিলেন না। তিনি নূর আলমের পক্ষের আইনজীবী। একপর্যায়ে ১২টার কিছু পরে তিনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) আদালতে এসে ওই নারী আইনজীবীর পাঁচ লাখ টাকা খরচা মওকুফের আরজি জানান। প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, উনি (সুফিয়া আহমেদ) একজন জুনিয়র ল’ইয়ার। ৫ লাখ টাকা কস্ট অনেক বেশি হয়ে গেছে।

এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, আদালতের সঙ্গে গুরুতর প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ কারণে এ আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আদেশটি পরিবর্তন করা হবে না।

একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলতে থাকেন, ‘আপনি তো খুব স্ট্রিক্টলি সব মেইনটেইন করেন। আপনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেওয়ার পরে আইনজীবীদের মামলা ও আয় রোজগার কমে গেছে।’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনজীবীদের মামলা রোজগার কমে গেছে?’ এ সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন আসলে কী বলতে চাচ্ছেন তা জানতে চান প্রধান বিচারপতি।  

মাহবুব উদ্দিন খোকন তার আগের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করতে থাকলে প্রধান বিচারপতি বলেন, তিনি আদালতে দিনের বাকি সময়ের বিচারিক কার্যক্রমে বসবেন না এ বক্তব্যের পর এজলাস ছেড়ে যান প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারকরা।

যা বললেন মাহবুব উদ্দিন খোকন

দুপুরে মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতিকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আপিল বিভাগে মামলা খুব একটা হচ্ছে না। আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে। একজন জুনিয়র আইনজীবী। তাকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়েছে, তাকে মাফ করে দেন।’

সুপ্রিম কোর্ট সভাপতি একটি মামলার উদাহরণ তুলে বলেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতিকে বোঝাতে চেয়েছি,  আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন। বেঞ্চ ছিল তিনটি। এখন একটি বেঞ্চ। একটি মামলায় স্টে (স্থগিতাদেশ) হলে সেখানে শুনানি করতে পারছি না। এমনকি চেম্বার জজ আদালতে স্টে করছে, শুনানি করতে এক বছর লাগে।’

মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘কেন কোনো মেনশন (শুনানির জন্য উপস্থাপন) করা যায় না? কেন এই মামলাটা ওপরে (কজলিস্টে) ছিল, নিচে গেলে কেন মেনশন করা যায় না? যেহেতু একটি বেঞ্চ, মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না, মামলা শুনানি করতে পারছে না। মামলা হলে আইনজীবীদের ইনকাম হবে। কম হোক, বেশি হোক।’ তিনি বলেন, ‘আমি চিন্তা করিনি যে উনি (প্রধান বিচারপতি) এত রিঅ্যাক্ট করবেন। ওনারা তো রাগ-অভিমানের ঊর্ধ্বে বিচার করার কথা। আর আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে ওনার কাছে আবেদন করার আমার অবলিগেশন (বাধ্যবাধকতা) আছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল যা বললেন :

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতি বলেছেন, আদালতের সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতির বিষয় বিবেচনা করে আদেশটি দেওয়া হয়েছে। আদেশটি দেওয়ার সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতে ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে আপনি (মাহবুব উদ্দিন  খোকন) যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজ আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’ এ কথা বলে উনি (প্রধান বিচারপতি) উঠে (এজলাস থেকে) গেছেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের অভিভাবক। আদালতে আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারকদের ভুল বোঝাবুঝি বা মতপার্থক্য হতে পারে, কিন্তু তা সাধারণত আদালতের কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।’ তিনি আরও বলেন, “ব্যারিস্টার খোকন একজন সংসদ সদস্য হওয়ায় তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিল।” 

মামলার পূর্বাপর :

আইনজীবীদের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে যাত্রাবাড়ীর ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে মো. মিজানুর রহমান মুরাদ নামে এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর এ নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন নুর আলম। ২০২২ সালে হাইকোর্ট মুরাদের নিয়োগ বাতিল করে রায় দেয়। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতির আবেদন) করেন মুরাদ। সেই আপিল গতকাল মঞ্জুর করে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে হাইকোর্ট। আদালতে আপিলের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অনিক আর হক, মোহাম্মদ শিশির মনির ও আইনজীবী অমিত দাসগুপ্ত।