কাজল চোখের বাঘাটিকি

ষোল বছর আগের কথা। পহেলা নভেম্বর বিকেলে পাখির সন্ধানে ক্যামেরা হাতে বর্তমান কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছি। শুরুতেই ভরত পাখির দেখা পেলাম। খানিক এগোতেই বৈদ্যুতিক তারের উপর একজোড়া লাটোরাকে বসে থাকতে দেখলাম। এরপর খামারের দিকে এগোতেই একটি ভাঙা গাছের গোড়ায় ছোট লালপিঠ কাঠঠোকরার দেখা পেলাম। ওর ছবি তুলে খামারের কাছাকাছি পৌঁছতেই মাটির উপর একজোড়া লালচে-বাদামি রঙের পাখি দেখলাম।

পাখি দুটোর একটি বারবার খাবার খাওয়ার জন্য মুখ হা করছিল। এতেই বোঝা গেল ওরা বাচ্চা পাখি। দ্রুত ওদের কটি ছবি তুললাম। ছানাগুলো হয়তো বাসা থেকে পড়ে গিয়েছে। তাই আশপাশটা একটু ভালোভাবে খুঁজতে লাগলাম যদি ওদের বাসার সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে ওদের বাসায় তুলে দেওয়া যাবে। বেশিক্ষণ খুঁজতে হলো না, সামনের গাছটির দিকে তাকাতেই ডালে আরেকটি ছানার দেখা পেলাম। পাশেই একটি পাখির বাসা। বুঝতে আর বাকি রইল না যে, এখান থেকেই ছানাগুলো নিচে পড়েছে। ছানাগুলোকে বাসায় তোলার জন্য যেই না ধরতে গেছি অমনি ওরা আমাকে ঠোঁকর দিতে এলো। একটুও ভয়-ডর নেই। আবারও ধরতে গেলে সদ্য উড়তে শিখা পাখিগুলো খানিকটা উড়ে গিয়ে গাছের ডালে বসল। কাজেই আর কোনো চিন্তা নেই। ওরা এখন পরিবেশে টিকে থাকার উপযোগী হয়ে উঠেছে। কাজেই ওদের রেখে সামনের দিকে এগোলাম।

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখা পাখির ছানাগুলো এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি বাঘাটিকির। বাঘাটিকি ছাড়া এরা কসাই, লেঞ্জা লাটোরা, মেটে লাটোরা, ভদ্রাইয়া বা চিকচিকে নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Long-tailed Shrike  বা Rufous-backed Shrike। ল্যানিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Lanius schach। লেনিয়াস ল্যাটিন শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে যার অর্থ কসাই। পাখিটির নয়টি উপ-প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা মিলে।

বাঘাটিকি ডিম্বাকার মাথা-দেহ ও লম্বালেজের পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ২০-২৮ সেন্টিমিটার ও ওজন ৫০-৫৩ গ্রাম। মাথা, ঘাড়, ডানা ও লম্বা লেজের উপরিভাগটা কালো। চোখেও যেন কাজল দেওয়া। গলা-বুক সাদা। পিঠ, পেট, বুক-পেটের দু-ধার, কোমর ও লেজের গোড়া কমলা। কালো ডানায় সাদা পট্টি। চোখের মনি, ঠোঁট, পা ও নখ কালো। স্ত্রী-পুরুষ দেখেতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক পাখির চোখের পট্টি ও ডানার প্রাথমিক পালক কালচে-বাদামি। মাথাসহ দেহের উপরটায় হালকা মরচে-বাদামির উপর গাঢ় বাদামির ডোরাকাটা দাগ এবং নিচটায় ঘিয়ে বাদামির উপর হালকা আঁশের মতো ছোপে ভর্তি। ঠোঁট কমলা-ধূসর।

এরা সারাদেশব্যাপী ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। অত্যন্ত সাহসী পাখি। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। নিজস্ব বিচরণক্ষেত্রে সচেতনভাবে ঘোরাফেরা করে। মূলত বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ, টিকটিকি, গিরগিটি, সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুরের ছানা, ছোট পাখি, পাখির ছানা ইত্যাদি খায়। শিকার ধরে জ্যান্ত অবস্থাতেই নৃশংসভাবে বাবলা, বেল বা এ জাতীয় গাছের কাঁটায় গেঁথে খাবার মজুদ করে রাখে। কর্কশভাবে ‘শ্চেররক্ ---’, ‘ক্রেরেরক্-ক্রেরেরক্ ---’, ‘টের্রট-টের্রট-টিউ-টিউ ---’ স্বরে ডাকে। অন্য পাখির ডাকও নকল করতে পারে।   

এপ্রিল থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় ভূমি থেকে ১-৯ মিটারের মধ্যে গাছের শাখায় ঘাস, লতাপাতা, ডালপালা ইত্যাদি দিয়ে বড়সড় বাসা বানায়। ডিম পাড়ে তিন থেকে ছয়টি। ঘিয়ে-সাদা ডিমগুলোর ওপর কালচে-বাদামি ও ধূসর ঘন ছিটছোপ থাকে। ডিম ফোটে ১৩-১৬ দিনে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ছানারা উড়তে শিখে ১৪-১৯ দিনে ও বাসা ছাড়ে ২০-২৩ দিনে। কোকিল, চোখ গেল, চাতক ইত্যাদি পাখি এদের বাসায় ডিম পাড়ে। আয়ুষ্কাল চার থেকে সাত বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ