বিনিয়োগ বাড়াতে শুল্ক সংস্কার করার পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের

আমদানিতে বাংলাদেশে নমিনাল (নামমাত্র) শুল্কহার ১৫ শতাংশ। দেশীয় পণ্যে সুরক্ষা ও অপ্রয়োজনীয় আমদানি ঠেকাতেই এ ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংক বলছে, বিদ্যমান সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ প্রকৃত শুল্কহার ২২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এসব শুল্ক কমালে স্বল্প মেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয় কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল মিলবে। এতে বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা বলেন বিশ্বব্যাংকের সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. নোরা ডিহেল। ‘বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতির সন্ধিক্ষণ : জাতীয় শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ ও আগামী প্রজন্মের বাণিজ্যচুক্তির প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি।

পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক মো. ফজলুল হক। আলোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন ও নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানসহ খাতসংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।

ড. নোরা ডিহেল বলেন, বাংলাদেশে সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলোর (এমএফএন) গড় শুল্কহার ৭ শতাংশ। তবে নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক যুক্ত হলে গড় নামমাত্র সুরক্ষার হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে। এসব শুল্কসহ মোট শুল্কহার ২২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এ ধরনের শুল্ক কাঠামো পণ্যের সুরক্ষায় অসমতা তৈরি করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে আমদানি প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়। সুতরাং সংশ্লিষ্ট খাতে এসব শুল্ক কমালে স্বল্প মেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয় কমতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ শুল্কহার কমালে সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার কমতে পারে। তবে শুল্ক সংস্কারের ফলে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) করা সহজ হবে। তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া এফটিএ করলে বাংলাদেশ লাভবান হওয়ার বদলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়লে ও এফটিএ হলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের মূল্য সংযোজনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সিপিডি সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, মুক্ত বাণিজ্য থেকে ৪০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয়ের যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তা উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। তৈরি করতে হবে সক্ষমতা।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, বাণিজ্য উদারীকরণ বা শুল্ক যৌক্তিকীকরণের বিরোধিতা কেউ করছেন না। তবে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং গভীর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া এফটিএ করলে বাংলাদেশ লাভবান হওয়ার বদলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতি জোরদার হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়া করে শুল্ক কমানোর প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করতে হবে।

পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশের শুল্কহার ৭ শতাংশের মতো হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক মিলিয়ে তা অনেক বেশি। শুল্ক কমানো না হলে দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে না।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, এলডিসি উত্তরণ ও মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ আছে। নতুন বাণিজ্যচুক্তি করার আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।