নবায়নযোগ্য জ্বালানি

নীতি ও কৌশলে কেন অবজ্ঞা 

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার অপরিহার্য হলেও এর ব্যবহার জাতীয় গ্রিডে এখনো বলতে গেলে উল্লেখযোগ্য সংযুক্তি নেই। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, দেশের তৈরি পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর এবং জ্বালানি সার্বভৌমত্বকে শিল্প কৌশলের কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ৯ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে বেসরকারি খাতের এমন আগ্রহের বিপরীতে সরকারি প্রকল্পে এর বিপরীত চিত্রের যে প্রতিফলন ঘটেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থা রাখা হলেও এর বাস্তবায়নে ধীরগতি, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার চিত্র দেখা যাচ্ছে। এক কোথায় বলা যায় সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে অগ্রগতি অনুল্লেখযোগ্য।

অথচ আমরা জানি, বিদ্যমান জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। বিস্ময়কর হলো, সরকারি কয়েকটি প্রকল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে অবহেলার যে বার্তা মিলেছে তা সরকারপ্রধানের নির্দেশনার সঙ্গে কতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নি®প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি প্রকল্পে সংকটেও কেন নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনিশ্চয়তা? ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, বেশিরভাগ প্রকল্পেই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা অকেজো, আবার কোথাও অবহেলিত। কয়েকটি প্রকল্পে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের কথা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। কেন সরকারি সিদ্ধান্ত অবহেলিত-উপেক্ষিত খোদ সরকারি প্রকল্পেই এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের এড়ানোর অবকাশ নেই। ‘বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় ছোট দ্বীপ এবং নদীর চরের জন্য অভিযোজন উদ্যোগ’ প্রকল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা সত্ত্বেও বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে মন্থর গতি। উপেক্ষার এ যন্ত্রণা মানুষের জন্য কতটা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এও ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।

‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্পে’ দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং সৌরশক্তিচালিত স্ট্রিট লাইট স্থাপনের কথা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল কার্যক্রমে তা কেন রাখা হয়নি তাও প্রশ্নের বিষয়। রাস্তা, ড্রেন, ফুটপাত ও খেলার মাঠ নির্মাণে টেকসই প্রযুক্তি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সংস্থান না রেখে গতানুগতিক নকশা কেনইবা অনুসরণ করা হচ্ছে? সৌরশক্তির স্ট্রিট লাইটের বদলে সাধারণ বিদ্যুতের এলইডি স্ট্রিট লাইট বসানো হচ্ছে! অথচ এই প্রকল্প দুবার সংশোধিত হয়ে দুবছর মেয়াদ বাড়লেও কার্যত ভৌত অগ্রগতি এখনো মূল লক্ষ্য থেকে বেশ দূরে। সোলার প্যানেলগুলোর বজ্রপাতের অভিঘাত থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি! এর ফলে বাড়ছে বহুমুখী ঝুঁকি। বিদ্যমান জ্বালানি সংকটে যদি সরকারি প্রকল্পেই সৌরবিদ্যুৎ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা যায় তাহলে বেসরকারি খাতে এ ব্যাপারে আগ্রহে ভাটা পড়াটাই স্বাভাবিক। সোলার প্যানেল, সোলার সিস্টেমের বিভিন্ন সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যের জালে ব্যক্তি বা মহল বিশেষের লাভের খতিয়ান দীর্ঘ হলেও দেশের বা জনগণের কোনো কল্যাণ সাধিত হয়নি। আমরা জানি না এই ‘হয়নি’র পেছনের কারণগুলোর গর্ভে কোন সমীকরণ রয়েছে।

অভিযোগ আছে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নিম্নমানের যন্ত্রপাতিতে বাজার সয়লাব। এসব যন্ত্রপাতি ইলেকট্রনিক বর্জ্যে পরিণত হয়ে পরিবেশ বিষিয়ে তুলছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলা যায়, সংকটে সাশ্রয়ের পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা সবই অনিশ্চয়তার গর্ভে বিলীন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা-ঘোষণা আলোর মুখ দেখছে না যাদের ব্যর্থতায় এবং দায়িত্বশীল যাদের উপেক্ষা-অবজ্ঞায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা শুধু ঘোষণাতেই আটকে আছে তাদের জবাবদিহি জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কালক্ষেপণ, অর্থ তছরুপের ব্যাধি আমাদের দেশে নতুন নয়। আমরা মনে করি, এর যদি যথাযথ প্রতিবিধান না হয় তাহলে এক ক্ষেত্রের বিরূপ ছায়া বহুক্ষেত্রে প্রসারিত হবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে যে কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে এর প্রতি অবজ্ঞার উৎসে নজর দেওয়া জরুরি। জ্বালানির বহুমুখীকরণ, জ্বালানি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দ্রুত বাস্তবায়ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। আমরা মনে করি, নীতি বাস্তবায়ন ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আরও বাস্তবসম্মত তথ্যভিত্তিক লক্ষ্য, শক্তিশালী অর্থায়ন এবং স্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন।