পুকুরখেকোদের কাছে অসহায় রাজশাহীর প্রশাসন!

পুকুর ভরাট ঠেকাতে প্রশাসনের অভিযান, বালু-মাটি তুলে পুনরুদ্ধার সবই হয়েছে। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই পুকুর আবারও ভরাট হয়ে গেছে। রাজশাহী নগরীর মোল্লাপাড়া এলাকার প্রায় দুই বিঘা আয়তনের একটি পুকুরের এ ঘটনা যেন নগরীর জলাধার রক্ষায় প্রশাসনের অসহায়ত্বেরই উদাহরণ। আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে একের পর এক পুকুর ভরাট করে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, মার্কেট ও আবাসিক স্থাপনা। একসময় রাজশাহী শহরে ছিল কয়েক হাজার পুকুর। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ২০০-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। গত ২০ বছরে নগরীতে যেসব উঁচু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই একসময় পুকুর কিংবা জলাধার ছিল এমন জমিতে গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আইন অনুযায়ী, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট নিষিদ্ধ। ভরাটের ঘটনায় জেল-জরিমানার বিধানও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই আইন কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ। নগরবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কখনো আর্থিক, কখনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুকুর ভরাট করছেন। প্রশাসনের সিদ্ধান্তকেও অনেক ক্ষেত্রে পাত্তা দেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে জলাধার রক্ষার কথা বলা হলেও প্রতি বছরই নতুন করে পুকুর ভরাট হচ্ছে। পরে সেখানে গড়ে উঠছে অট্টালিকা।

গত বছর নগরীর মোল্লাপাড়া এলাকার প্রায় দুই বিঘা আয়তনের একটি পুকুর বালু ফেলে ভরাট করেন এর মালিকরা। স্থানীয়রা জানান, খাইরুল ইসলাম ও মাহমুদুল হাসান নামে দুই ব্যক্তি পুকুরটির মালিক। বড় এই পুকুরটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য একসময় এই পুকুরে শিশুরা সাঁতার কাটত, বাড়ির প্রয়োজনে পানি ব্যবহার করা হতো। আগুন নেভানোর ক্ষেত্রেও পুকুরটি ছিল বড় পানির আধার। পুকুর ভরাটের বিষয়টি স্থানীয়রা বিভাগীয় কমিশনারকে জানান। খবর পেয়ে গত বছরের ২৫ নভেম্বর বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে ভরাট করা পুকুর থেকে বালু ও মাটি অপসারণ করা হয়। তৎকালীন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ ঘটনাস্থলে গিয়ে পুকুরটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর খননযন্ত্র দিয়ে ভরাট করা মাটি ও বালু তুলে পুকুরটি পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। প্রশাসনের এ উদ্যোগ তখন প্রশংসিতও হয়। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই পুকুরটি আবার ভরাট করা হয়েছে। গত মাসে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরো পুকুরই বালু-মাটি দিয়ে ভরাট করে সমতল করে ফেলা হয়েছে। সেখানে লাগানো হয়েছে কিছু চারাগাছও। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুকুরটি পুনরায় ভরাটের পর এ বিষয়ে আর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

শুধু মোল্লাপাড়া নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বছরের পর বছর ধরে পুকুর, ডোবা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধার ভরাটের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও রাতারাতি মাটি ফেলে পুকুর ভরাট করা হচ্ছে, আবার কোথাও ময়লা-আবর্জনা ফেলে ধীরে ধীরে জলাধারের অস্তিত্ব বিলীন করা হচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণা ও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় দশকে রাজশাহী শহরে অন্তত চার হাজার পুকুর ভরাট করা হয়েছে। ২০১৪ সালেও নগরীতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৯৫২টি পুকুর ছিল। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে প্রায় ২০০-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাদের হিসাবে, গত ১০ বছরেই প্রায় ৮০০ পুকুর ভরাট করে সেখানে বহুতল ভবন, মার্কেট ও আবাসিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।

পুকুর ভরাটের ক্ষেত্রে অনেকেই কৌশলী হয়। কেউ রাতারাতি পুকুর ভরাট করেন প্রশাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়কে ম্যানেজ করে। আবার যারা দীর্ঘমেয়াদে পুকুর ভরাট করতে চান, তারা প্রথমে পুকুরের পাশে বাড়ির ময়লা আবর্জনা ফেলতে শুরু করেন। বছরের পর বছর ময়লা পড়তে পড়তে সেগুলো ছোট হয়ে আসে। এরপর তা বন্ধ করে লাগানো হয় নিজেদের কাজে।

নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান এলাকায় থাকা পুকুর ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করলে জমির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে আর্থিক লাভের আশায় অনেকে জলাধার ভরাটে ঝুঁকছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে যেমন নগরীর জলাধার কমছে। অন্যদিকে বাড়ছে জলাবদ্ধতা, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ও নগরের তাপমাত্রা।

আগুন নেভানোর ক্ষেত্রেও একসময় শহরের পুকুরগুলো গুরুত্বপূর্ণ পানির আধার হিসেবে কাজ করত। এসব পুকুর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অগ্নিকা-ের সময় কোথাও কোথাও পানির উৎসের সংকট তৈরি হচ্ছে।

রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক ফরহাদ হোসেন বলেন, দ্রুত নগরায়ণের কারণে গত ১০ বছরেও অনেক পুকুর ভরাট করে সেখানে মার্কেট, বহুতল ভবন ও আবাসিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এতে অগ্নিনির্বাপণের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কিছু বহুতল ভবনে ভূগর্ভস্থ পানির রিজার্ভ থাকলেও অগ্নিকা- মোকাবিলায় খোলা পানির উৎস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী শহরে এখনো যেসব পুকুর ও অন্যান্য পানির উৎস রয়েছে, সেগুলো ভরাট না করার জন্য মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিীদ সমিতির রাজশাহী অঞ্চলের সমন্বয়ক তন্ময় সান্যাল বলেন, পুকুর ভরাটের খবর পেয়ে স্থানীয়রা অনেক সময় অভিযোগ করেন। প্রশাসন খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে এই কার্যক্রম বন্ধ করলেও সেটিই স্থায়ী সমাধান হয় না। আবারও ভরাটকারীরা নতুন সময়ের অপেক্ষায় থাকে। সুযোগ পেলেই তারা পুকুরটি ভরাট করে নেন। এ কারণে দিনকে দিন পুকুর কমছে। এটা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়। জমির শ্রেণি  পরিবর্তনের শাস্তির বিধান আছে আইনে। সেই আইনের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করা খুবই দরকার।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চন্দন রায় বলেন, রাজশাহী নগরীতে পুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ নতুন নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ ও দ্রুত নগরায়ণ। রাজশাহীতে জনসংখ্যার চাপও বেড়েছে। এখানে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষও আবাসনের জন্য নগরীতে আসছেন।

তিনি বলেন, পুকুর শুধু পানি ধরে রাখার জায়গা নয়, প্রতিটি পুকুরের নিজস্ব একটি প্রতিবেশ ব্যবস্থা রয়েছে। বৃষ্টির সময় পুকুর প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণ করে। একই সঙ্গে নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও জলাধার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পুকুর কমে গেলে আরবান হিট আইল্যান্ডের প্রভাব বাড়বে, নগরের তাপমাত্রা আরও বাড়বে এবং জীববৈচিত্র্যেরও ক্ষতি হবে। সব দিক বিবেচনায় পুকুর ভরাটের প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মহিনুল হাসান বলেন, পুকুর ভরাটের কোনো তথ্য প্রশাসনের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো পুকুর ভরাটের পর্যায়ে নিয়ে গেলে সেটি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। গত দুই বছরে রাজশাহী মহানগরীর কোনো পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়নি। পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য অনেক আবেদন এলেও কোনোটিই অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, প্রশাসন পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তন করলে সেটি অন্যদেরও পুকুর ভরাটে উৎসাহিত করতে পারে। নগরীর জলাধার রক্ষার স্বার্থেই শ্রেণি পরিবর্তনের আবেদনগুলো অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি পুকুর-জলাশয় ভরাট করে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজশাহীতে কারা এভাবে পুকুর ভরাট করে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, তা নগরবাসীর অনেকেরই জানা। এসব জলাশয় যেন আর কেউ ভরাট করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। রাজশাহীকে আধুনিক, বাসযোগ্য, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে জলাধার রক্ষা জরুরি।