চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফল জালিয়াতির উর্বর কেন্দ্র বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টার। শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাসে যতগুলো ফল জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে সবই ঘটেছে এই সেন্টারে। ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বোর্ডের সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফল জালিয়াতি, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পুনঃনিরীক্ষণে ৩২ খাতায় অতিরিক্ত নম্বর ইনপুট দেওয়া এবং সর্বশেষ এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর খাতার নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত নম্বরের অমিল পাওয়া গেছে। আর এসবের পেছনে বোর্ডের কম্পিউটার শাখার দুই স্থায়ী কর্মকর্তার পাশাপাশি দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা ১৫ অপারেটরে চোখ শিক্ষা বোর্ডের।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট না থাকায় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট বিকাশ চন্দ্র মল্লিক কয়েক দফায় এসে ফল তৈরির কাজে সহযোগিতা করে আসছেন। কিন্তু কুমিল্লা বোর্ডে ফল জালিয়াতির ঘটনা না ঘটলেও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে কেন ঘটছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বিকাশ চন্দ্র মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফল তৈরির কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারে সিকিউরিটি দুর্বলতা রয়েছে। আর এই দুর্বলতার কারণে একজন আরেকজনের ওপর দোষ চাপানোর সুযোগ রয়েছে। এতেই হয়তো অপরাধগুলো হচ্ছে।’
সিকিউরিটি বলতে কোন ধরনের দুর্বলতার কথা বলছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বোর্ডে দৈনিক ভিত্তিতে কিছু অপারেটর কাজ করছেন বছরজুড়ে। এদের কেউ কেউ প্রায় ১৬ বছর ধরে কাজ করছে। এখন একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে তখন একটি ফল তৈরির অনেক সিস্টেম কিন্তু জেনে যায়। অথচ তারা এসব জানার কথা নয়। যদিও তারা শুধু স্ক্যান করার কথা, কিন্তু তাদের দিয়ে বোর্ড অনেক ধরনের কাজ করায়। এতে তারা দক্ষ হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, এই অপারেটরদের বোর্ডের সিস্টেমের কতটুকু এক্সেস দেওয়া হয়েছে, তা প্রোগ্রামারই ভালো বলতে পারবেন।
দৈনিক ভিত্তিতে ১৫ অপারেটর কাজ করছে ১৬ বছর ধরে : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে কম্পিউটার সেন্টারে জনবল ঘাটতি রয়েছে। আর এই জনবল ঘাটতির কারণে ২০১০ সালের দিকে ৭ জন অপারেটরকে ফল স্ক্যান করার জন্য দৈনিক ৮০০ টাকা মজুরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আবু জাভেদ শিবলু, জুয়েল, রবি, রুবেল, নোমান, ফারুখ ও কামরুল হাসান নামের এই সাত অপারেটর ২০১৫ সাল পর্যন্ত ফল তৈরির কাজ করলেও ২০১৫ এর পর থেকে প্রবেশপত্র, রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ট্রান্সক্রিপ্ট ও সার্টিফিকেটের দ্বি-নকল কপি প্রদানের কাজ করে আসছেন। তাদের কাজের বিষয়ে জানতে কথা হয় আবু জাভেদ শিবলুর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা ২০১৫ সালের পর থেকে ফল তৈরির কোনো কাজ করি না। আমরা শুধু দ্বি-নকল কপি সরবরাহের রুটিন কাজগুলো করি বছরজুড়ে।
তাহলে ফল তৈরির কাজ কে করে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিক্ষা বোর্ড দৈনিক ভিত্তিতে আরও ৮ জনকে পৃথক নিয়োগ দিয়েছে। যারা শুধু স্ক্যানিংয়ের কাজগুলো করে থাকেন। এই ৮ জন শুধু পরীক্ষার ফল তৈরির সময় কাজ করেন।
এই ৮ জনের একজন হলেন রাশেদুল ইসলাম নাসির। তিনি বলেন, আমরা ফরহাদ, শাহীন, মারুফ, রায়হান, ইমতিয়াজ, জিসান ও রাশেদুল হক নামে ৮ জন শুধু স্ক্যানিংয়ের কাজ করি। পরীক্ষার হল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের পরিচিতি অংশ (ই টাইপ) এবং প্রধান পরীক্ষক থেকে আসা অংশ (এইচ টাইপ) স্ক্যান করে এডিট করে প্রসেসিং রুমে পাঠিয়ে দেই।
প্রসেসিং রুমে পাঠানোর পর বাকি কাজ কে করেন? এই প্রশ্নের জবাবে রাশেদুল ইসলাম নাসির বলেন, ‘বাকি কাজ স্যারেরা (প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামার) করেন। ওখানে আমাদের কোনো কাজ নেই।’
দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা অপারেটরদের কথা অনুযায়ী স্ক্যান করে দেওয়ার পর বাকি সব কাজ করেন বোর্ডের স্যারেরা (প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামার)। কিন্তু আদৌ কি তা সম্ভব?
বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারে স্থায়ী কর্মকর্তা ২ জন! : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ পরীক্ষার্থী ছিল এবারের এসএসসি পরীক্ষায়। একজন শিক্ষার্থী ১২টি পত্রে পরীক্ষা দিয়েছে। ১২টি পত্রের জন্য একজন শিক্ষার্থীর দুটি করে কপি (ই টাইপ ও এইচ টাইপ) স্ক্যান করতে হয়েছে। তাহলে একজন শিক্ষার্থীর ১২টি বিষয়ের জন্য স্ক্যান কপির সংখ্যা হবে ২৪টি। ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ পরীক্ষার্থীর স্ক্যান কপি হওয়ার কথা ৩১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৬টি। এই বিশাল ডেটা প্রসেস করা কি একজন (এবার সহকারী প্রোগ্রামার আবুল হাসনাত মোহাম্মদ রাজুর সন্তান এসএসসি পরীক্ষার্থী থাকায় ফল তৈরির সময় তিনি কম্পিউটার সেন্টারে যাননি। তাহলে কাজ করেছেন মাত্র একজন।) প্রোগ্রামার আবদুল মালেকের পক্ষে সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা আবু জাভেদ শিবলু বলেন, ‘তা আমি কি করে বলব? আমরা তো ওই কম্পিউটারে কাজ করি না।’
আপনারা কি ফল তৈরির রুমে প্রবেশ করেন না? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফল তৈরির সময় বিভিন্ন কাজে আমাদের ডেকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় জনবল সংকটের কারণে।
প্রোগ্রামারই ফল তৈরি করেন : ফল কাদের দিয়ে তৈরি করানো হয়? এই প্রশ্ন করা হলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রোগ্রামার আবদুল মালেক বলেন, ‘কুমিল্লা বোর্ড থেকে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট এসে ফল তৈরি করেন। আমরা শুধু ওনার পরামর্শ মেনে চলি।’
কিন্তু আপনি তো বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের প্রধান। আপনার টিমের বাকিদের কাজ তো আপনি বুঝিয়ে দিয়ে থাকেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, আমি কাউকে কাজ দেই না। আমাকে অফিশিয়ালি দায়িত্বের কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি। তবে বর্তমান কাঠামোতে পদাধিকার বলে আমি সিনিয়র।’
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রোগ্রামার আবদুল মালেকের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট বিকাশ চন্দ্র মল্লিক বলেন, ‘এটা মোটেই সঠিক নয়। আমি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফল তৈরির জন্য দুই থেকে তিনবার গিয়ে এক বা দুই দিন করে কাজ করে আসি। তারা সব কাজ করে রাখে। আমি শুধু ফল তৈরির ধাপগুলো রি-চেক করি। কোনো মেশিনেও আমি বসি না। প্রোগ্রামারই সব কাজ করেন। এ ছাড়া কুমিল্লা বোর্ডের ফল তৈরির পদ্ধতি আর চট্টগ্রাম বোর্ডের পদ্ধতি এক প্রোগ্রামে হয় না। সে জন্য আমি তাদের প্রোগ্রামে হাত দেই না। ’
ডি কোডিংয়ের আগে কি ম্যাচিং করা যায়? : ফল তৈরির সর্বশেষ স্তর হলো ডি কোডিং (একজন পরীক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ ফল, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফল ও বোর্ডভিত্তিক ফলসহ সব ধরনের আঙ্গিকে ফল তৈরির পন্থা)। কিন্তু এই ডি কোডিংয়ের আগে ‘ই’ টাইপ (শিক্ষার্থীর পরিচিতি অংশ) ও ‘এইচ’ টাইপ (প্রাপ্ত নম্বরের অংশ কিন্তু শিক্ষার্থীর পরিচিতি থাকে না) ম্যাচিং করা সম্ভব কি না? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বিকাশ চন্দ্র মল্লিক বলেন, ‘প্রোগ্রামার অবশ্যই তা ম্যাচিং করতে পারেন। এখন প্রশ্ন হলো প্রোগ্রামার এই ম্যাচিং করার যে সিকিউরিটি কোড তা অন্য কাউকে দিয়েছেন কি না অথবা দিয়ে থাকলেও এর দায় ওনার ওপরই বর্তায়।’ এবারের এসএসসি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর খাতার নম্বর কম থাকলেও প্রকাশিত ফলে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বাড়িয়ে দেওয়ার কাজটি ডি কোডিংয়ের আগে হয়েছে বলে ধারণা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বক্তব্য : কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে কম্পিউটার সেন্টারে কতজন রয়েছে? এই প্রশ্নের জবাবে সেখানকার সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট বিকাশ চন্দ্র মল্লিক বলেন, ‘একজন সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট, সিস্টেম এনালিস্ট, ২ জন প্রোগ্রামার, ২ জন সহকারী প্রোগ্রামার ও মেইনটেনেন্স ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া ডেটা এন্ট্রি অপারেটরসহ প্রায় ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এ ছাড়া ফল তৈরির সময় প্রতি বছর বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দৈনিক ভিত্তিতে ৫ থেকে ১০ জন অপারেটর নিয়োগ দিয়ে থাকি স্ক্যানিংয়ের জন্য।’ এদিকে চট্টগ্রাম বোর্ডে বর্তমানে মাত্র একজন প্রোগ্রামার ও একজন সহকারী প্রোগ্রামার রয়েছেন। আর কোনো কর্মকর্তা এই সেন্টারে নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, কম্পিউটার সেন্টারে ৪২ জন জনবল নিয়োগের সব অনুমোদন শেষ করে এবং বুয়েটের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করে এসেছি। এতদিনে তা হয়ে যাওয়ার কথা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, ‘বুয়েটের অধীনে পরীক্ষা হলেও সব পদে দক্ষ লোক পাওয়া যায়নি। তারপরও একজনকে হয়তো আমরা শিগগিরই পেয়ে যাব। আর তা করা গেলে কম্পিউটার সেন্টারের জনবলের ঘাটতি কিছুটা হলেও কমবে।’
উল্লেখ্য, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর ফল জালিয়াতির পর বোর্ডের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির শিগগিরই রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা। এই জালিয়াতি নিয়ে দেশ রূপান্তরে ‘চট্টগ্রাম বোর্ডে আবারও ফলাফল জালিয়াতি!’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গত ৭ সেপ্টেম্বর। জালিয়াতিতে একটি বিষয় ছাড়া সব বিষয়ের ফল পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বোর্ডের এই ফল জালিয়াতিতে কম্পিউটার সেন্টারটি একটি কালো বিড়াল বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা বোর্ডের সাবেক একাধিক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তাদের মতে, একসময় দুর্নীতিকে কালো বিড়াল বলা হতো, আর চট্টগ্রাম বোর্ডের ফলের কালো বিড়াল হলো এই কম্পিউটার সেন্টার। এখানেই ফলের যত অনিয়ম হয়ে আসছে।