হরফের ভেতর দিয়ে ভাষার জগতে

দিনাজপুরের একটি ছাপাখানার শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছিল আবু জার মো. আককাসের হরফের জগতে প্রবেশ। বাড়ির পাশেই ছিল শহরের সবচেয়ে আধুনিক ও বড় ছাপাখানাগুলোর একটি। নির্বাচন কিংবা বছরের শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপার সময় রাত অবধি চলত তার কাজ। ছোটবেলায় খুব কাছ থেকে দেখেছেন কম্পোজিটারদের সামনের চারটি ডালার অসংখ্য খোপ থেকে না দেখে একের পর এক সিসার হরফ তুলে শব্দ, লাইন, অনুচ্ছেদ, পৃষ্ঠা ও অধ্যায় সাজিয়ে তোলা। আককাসের চোখে সেটি নিছক সাজানো নয়, বরং এক ধরনের বুনন যেখানে প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তা একসঙ্গে কাজ করে।

সেপ্টেম্বর ১৯৭০-এ দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া আককাসের ভাষা ও লিপির প্রতি আগ্রহ অবশ্য শুধু ছাপাখানায় থেমে থাকেনি। স্কুলজীবন থেকেই ভাষা তাকে টেনেছে। আরবি পড়া, সহপাঠীর কাছ থেকে সংস্কৃত শেখা, দিনাজপুরের উর্দুভাষী মানুষের সংস্পর্শে উর্দু শেখা প্রতিটি নতুন ভাষা তার সামনে খুলে দিয়েছে নতুন একটি জগৎ। আতোয়ার রহমানের গল্প যখন ভাষা নিয়ে বইটি তাকে ভাষার জগতের দিকে আরও গভীরভাবে নিয়ে যায়। সেখানেই প্রথম জানতে পারেন এস্পেরান্তোর কথা। বহু বছর পর, ২০২৩ সালের শুরু থেকে প্রতিদিন অল্প অল্প করে এস্পেরান্তো শেখা শুরু করেন। তার কাছে ভাষা শেখার আনন্দের একটি কারণ প্রতিটি ভাষার নিজস্ব ধরনকে আবিষ্কার করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য ও ভাষা নিয়ে পড়াশোনার সময়ই তার হরফের নকশার সঙ্গে সম্পর্ক আরও প্রত্যক্ষ হয়। নব্বইয়ের দশকে এক বন্ধুর হাত ধরে ফন্টোগ্রাফারে হরফের নকশা তৈরির কাজ শেখেন। আন্তর্জাতিক ধ্বনিতাত্ত্বিক বর্ণমালার জন্য একটি ফন্ট তৈরি করেছিলেন, যা নিজের পাঠ-পরিকল্পনার কাজে ব্যবহার করতেন। পরে ফন্টল্যাব ও পিএফএ-এডিটে কাজ করেছেন; পিএফএ-এডিটের বর্তমান নাম ফন্টফোর্জ।

বাংলা ছাড়াও ওল চিকি ও চাকমা লিপি নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের ছোট ছোট ভাষার লেখ্যরূপ সংরক্ষণ এবং তাদের ব্যাকরণ ও সাহিত্য ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে এসব ভাষার জন্য ফন্ট তৈরির স্বপ্নও ছিল তার। বাংলা হরফের নতুন ছাঁদ নিয়েও তৈরি করেছিলেন ষাট-সত্তরটির মতো ফন্ট, যদিও সেই কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।

আককাসের কাছে হরফের নকশা কেবল অক্ষরকে সুন্দর দেখানোর বিষয় নয়। হরফের ইতিহাস, অক্ষরের মধ্যবর্তী ফাঁক, জোড়া-হরফের গঠন এবং ছাপার কালো-সাদার ভারসাম্য সব মিলিয়ে এটি এক সূক্ষ্ম নকশার চর্চা। তার মতে, ভালো হরফের নকশায় নকশাকারের মুনশিয়ানা থাকবে, কিন্তু তা যেন পাঠকের চোখে আলাদা করে ধরা না পড়ে।

এই চর্চাকে ব্যক্তিগত কাজের বাইরে নিয়ে যেতে ২০২৩ সালে শুরু করেন হরফচর্চা সুস্নাত চৌধুরী ও সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। বাংলা হরফ নিয়ে প্রচ্ছদ নিবন্ধ, ফন্টের জন্মকাহিনি, বইয়ের পর্যালোচনা, পুরনো লেখার পুনর্মুদ্রণ এবং হরফ বিষয়ক বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে পত্রিকাটি বাংলা হরফচর্চার একটি নতুন পরিসর তৈরি করছে।

নিজের শেখার পদ্ধতি সম্পর্কে আককাসের বক্তব্যও তার দীর্ঘ চর্চার সঙ্গে মিলে যায়। তার কাছে শুরু করার চেয়ে শেখার কাজটি ধরে রাখা বেশি জরুরি। প্রতিদিন মাত্র পনেরো মিনিট করেও এস্পেরান্তো শেখার অভ্যাস তিনি চার বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন। তার ভাষায়, সাধারণ কোনো কাজ বছরের পর বছর প্রতিদিন করলে তা একসময় অসাধারণ হয়ে ওঠে। তার তিন দশকের হরফচর্চাও যেন সেই স্থৈর্যেরই দীর্ঘ উদাহরণ।