বাংলাদেশে হাতেগোনা যে কজন মানুষ বাংলা হরফ নিয়ে গবেষণা ও চর্চা করেন, আবু জার মো. আককাস তাঁদের একজন। প্রচারবিমুখ এই মানুষটি তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা, লেখালেখি ও হরফচর্চার কাজ করে যেতে পছন্দ করেন অনেকটাই নিভৃতে। তবে ভাষা ও টাইপোগ্রাফি নিয়ে আগ্রহী তরুণদের জন্য তাঁর অভিজ্ঞতা ও চিন্তার জগৎটি গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা, লিপি ও হরফের ইতিহাস নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান, বিভিন্ন লিপির নকশা নিয়ে কাজ এবং নতুন ভাষা শেখার আগ্রহসব মিলিয়ে তাঁর কাজের পরিসর বেশ বিস্তৃত। তরুণদের ভাষা ও টাইপোগ্রাফি চর্চায় আগ্রহী করে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে তাঁর এই অভিজ্ঞতার মধ্যে। দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
প্রশ্ন : বাংলা হরফ ও টাইপোগ্রাফি নিয়ে আপনার আগ্রহের শুরুটা কীভাবে? কোন জায়গা থেকে এই ফ্যাসিনেশন তৈরি হলো?
আককাস : ব্যর্থ লেখক যেমন সমালোচক হয়, তেমনি হরফের ছাঁদের নকশায় গেল তিন দশক ধরে এক রকমভাবে ব্যর্থ হয়ে হরফচর্চা বা লিপিকৌশলে আগ্রহী হয়ে ওঠি। তবে এর শুরুটা অনেক আগে, আমার ছোটবেলায়। দিনাজপুরে আমার বাসার পাশেই ছিল শহরের সবচেয়ে আধুনিক এবং বড় ছাপাখানা। নির্বাচনের সময় কিংবা বছরের শেষে শিক্ষায়তনে পরীক্ষা প্রশ্নপত্র যখন ছাপা হতো, তখন অনেক রাত অবধি ছাপাখানার শব্দে ঘুম হতো না। সে ছাপাখানা এখন আর নেই। তবে খুব কাছ থেকে দেখেছি কম্পোজিটাররা কী করে সামনের চারটে ডালার খোপ থেকে না দেখে সিসার হরফ পরপর সাজিয়ে শব্দ, লাইন, অনুচ্ছেদ, পৃষ্ঠা এবং অধ্যায় বোনা হতো। কাজটা সাজানোর চেয়ে বেশি বুননের মতোই। তাতে থাকত প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়। শুরুটা সেখান থেকেই। পরে, সিসার হরফে ছাপানো বই দেখে দেখে অনেকটা শিখেছি।
প্রশ্ন : আপনি ১৯৯০-এর দশক থেকে ফন্ট ডিজাইন নিয়ে কাজ করছেন। তখনকার সময়ের সঙ্গে আজকের ডিজিটাল টাইপোগ্রাফির সবচেয়ে বড় পার্থক্য কী?
আককাস : নয়ের দশকে হরফের নকশায় আমার হাতেখড়ি এক বন্ধুর হাত ধরে। তখন অল্টসিস ফন্টোগ্রাফার নামের খুব চালু একটি ফন্ট এডিটর ছিল। নকশা কাটায় বেশ কিছুদিন হাত পাকানোর, একটি ফন্ট বানিয়েছিলাম আন্তর্জাতিক ধ্বনিতাত্ত্বিক বর্ণমালার হরফ বানানোর জন্য। যখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষায় স্নাতকোত্তরের ছাত্র, প্রয়োজন পড়েছিল ধ্বনিতাত্ত্বিক হরফের। সেই হরফ আমি ব্যবহার করি পাঠ্যক্রমের পাঠ-পরিকল্পনা তৈরির জন্য। অনেক খামতি ছিল ফন্টটির। কিন্তু তাতে কাজ চলে যেত। ফন্টটি হারিয়ে ফেলেছি অনেক আগেই। তখনো ব্যাপারটা ডিজিটালই ছিল, তবে এখনকার মতো সুবিধা ছিল না। পরে ফন্টল্যাবে এবং পিএফএ-এডিটে কাজ করেছি। পিএফএ-এডিটের বর্তমান নাম ফন্টফোর্জ। এখন অনেক কাজ সহজে করা যায়। কোনো ভেক্টর ড্রয়িং সফটওয়্যারে একে নিয়ে ফন্ট এডিটরে বাকি কাজটি করা যায়। ফন্টোগ্রাফারে অত সুবিধা ছিল না। ফন্ট এডিটরেই সব কাজ করতে হতো।
প্রশ্ন : বাংলা টাইপোগ্রাফির ইতিহাসের কোন জায়গাগুলো আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সাধারণ মানুষ সেগুলো সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না?
আককাস : হরফের নকশায় ইতিহাস। অনেক নকশাকারই এ সম্পর্কে বেশ অজ্ঞ। কিন্তু এটা জানা বা বোঝা খুব জরুরি। অ আগে কেমন ছিল, কী করে পাল্টেছে, কোন জোড়া হরফ কীভাবে লেখা হতো, কেনই বা পাল্টেছে, এগুলো জানা জরুরি। হরফের নকশার বাইরেও লিপিকৌশলের অনেক বিষয় আছে, যেগুলো ভাবা জরুরি। একজন ভালো মুদ্রকের কাজ হলো প্রতিটি শব্দের মাঝে দৃশ্যত সমান ফাঁক দেওয়া। কিন্তু প্রতিটি হরফের মাঝের ফাঁকটা মূলত নির্ভর করে হরফের নকশাকারের ওপর। একজন মুদ্রকের কাজ ছাপানো লেখায় সাদা এবং কাল রঙের সমতা নিশ্চিত করা। সমতা নিশ্চিত করা অর্ধেক দায়িত্ব নকশাকারের। নকশায় আরেকটা বড় ব্যাপার হলো, নকশাকার তার মুনশিয়ানা দেখিয়ে যাবে, কিন্তু তা চট করে চোখে পড়বে না। একবার তাকিয়ে তা চোখে পড়ে যগেলেই, মুনশিয়ানাটা আর থাকে না। লিপিকৌশল বা হরফের নকশা সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য নয়, বরং না বোঝার জন্য।
প্রশ্ন : বাংলা হরফের নিজস্ব গঠন মাত্রা, যুক্তাক্ষর, কার, ফলা এসবই তো লাতিন টাইপোগ্রাফি থেকে একেবারে আলাদা। বাংলা টাইপ ডিজাইনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
আককাস : লম্বা লেখা ছাপানোর জন্য যে হরফ, ইংরেজিতে যাকে টেক্সটটাইপ বলে, সেখানে দুটো হরফের মাঝে এবং বিশেষ দুটো হরফের মাঝে কতটুকু ফাঁক হবে তা ঠিক করা সবচেয়ে কঠিন। একটু এদিক ওদিক হলে, পড়ায় ক্লান্তি আসবে; চোখের অস্বস্তি হবে; মাথাও ধরতে পারে। জোড়া-হরফের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কাল এবং সাদা রঙের কম বা বেশি হওয়া ঠেকানো। ইদানীং, অনেকে হরফের ওপরের এবং নিচের অনুমিত রেখার মাঝে কার এবং ফলা ঠেসে দেয়। এই প্রবণতা তেমন ছিল না। কারণ এক লাইন থেকে আরেক লাইনের যে ফাঁক, ইংরেজিতে যাকে লেডিং বলে, তার ব্যবহার ছিল বেশ উদার। এখন, দুই রেখার মাঝে হরফ ঠাসতে গিয়ে, রঙের সমতা বজায় রাখা একটু কঠিন হয়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন : আপনি বাংলা, চাকমা, ওল চিকি বিভিন্ন স্ক্রিপ্টের ফন্ট নিয়ে কাজ করেছেন। একটি নতুন স্ক্রিপ্ট শেখা বা বোঝার সময় আপনি কীভাবে শুরু করেন?
আককাস : এই কাজগুলো কখনোই পুরোপুরি শেষ করে উঠতে পারিনি। প্রথমে ওল চিকি হরফের নকশা করেছিলাম ২০০৪ সালের দিকে। সেটা দিয়ে সাঁতালি লেখা যায়। পরে চাকমা পুরো বর্ণমালা এবং খান দশেক জোড়া-হরফও বানিয়েছিলাম। আমার ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশে যে ছোট ছোট ভাষা আছে তাদের লেখ্যরূপ নিয়ে, সেগুলোর জন্য ফন্ট বানিয়ে রাখব। উদ্দেশ্য ছিল সে ভাষার ব্যাকরণ এবং সাহিত্য সংরক্ষণ করা। পরে বাংলার জন্য নতুন ছাঁদের হরফ বানানোর চেষ্টা করেছিলাম। ষাট-সত্তরটার মতো হরফ বানিয়েছিলাম। কিন্তু কাজটি পড়ে রয়েছে প্রায় দুই দশক হলো। তবে এই ফন্টগুলো ঞবঢ নামের একটি বিশেষ সফটওয়্যারে ব্যবহারের জন্য। মেটাফন্ট দিয়ে বানানো। সাধারণ ট্রুটাইপ বা ওটিএফ ফন্ট নয়। বাংলার কাজটা শেষ হবে হয়তো কোনো দিন। ২০১৪ সালে, কমিক বইয়ের জন্য দুটো ফন্ট বানিয়েছিলাম। সেগুলোতে বইও ছাপা আছে। এই কমিক ফন্ট দুটো ইউনিকোডে রূপান্তরিত হয়ে লিপিঘর থেকে বাজারে ছাড়া হবে। স্ক্রিপ্ট বলে ভাষার লিখিত রূপ বোঝালে, আমি সাধরণত শুরু করি তার বর্ণমালা দিয়ে যেভাবে ছাপানো হয় এবং যেভাবে লেখা হয় তা বিবেচনা করে। তবে নতুন কোনো ভাষার হরফ শিখতে খুব বেশি সময় লাগে না।
প্রশ্ন : আপনার টাইপোগ্রাফির কাজের সঙ্গে ভাষা শেখার আগ্রহের একটা সম্পর্ক মনে হয় আছে। আপনি কেন নতুন নতুন ভাষা শিখতে চান? এস্পেরান্তো শেখার আগ্রহটাও কীভাবে এলো?
আককাস : ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। ভাষায় আমার আগ্রহ স্কুলের সময় থেকে। আতোয়ার রহমানের লেখা মুক্তধারার একটা বই ছিল গল্প যখন ভাষা নিয়ে। এই বই-ই আমায় ভাষার জগতে নিয়ে যায়। এরও আগে আমি সংস্কৃত পড়তে শিখি, আমার সহপাঠীর কাছ থেকে। দিনাজপুরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উর্দুভাষীর বাস ছিল তখন, সে থেকে উর্দু শিখি। আরবি পড়া আরও আগে শিখতে হয়েছে। নতুন ভাষা শিখল, নতুন একটা জগৎ হাতের নাগালে এসে পড়ে। প্রতিটি ভাষার একটি নিজস্ব ধরন থাকে। সেটা জানাটা বেশ তৃপ্তিদায়ক। এস্পেরান্তোর নাম প্রথম জানতে পারি গল্প যখন ভাষা নিয়ে বইটি থেকে। তারও দু-বছর পরে, আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিই। এবং প্রায় সে সময় থেকেই ফরাসি শেখা শুরু করি। ২০১৩ সালে একবার শুরু করেও, এস্পেরান্তো নিয়ে এগোতে পারি না। তবে ২০২৩-এর শুরু থেকে প্রতিদিনই একটু করে এস্পেরান্তো শেখার চেষ্টা করি। এটিই আমার প্রথম বানানো-ভাষা শেখা। আরেকটা কারণ, এটি সহজে শেখা যায় এমন একটি অ্যাগ্লুনেটিভ বা সংশ্লেষণাত্মক ভাষা; এতে শুরুতে, শেষে এমনকি মাঝে প্রত্যয় বসে শব্দের মানে পাল্টায়।
প্রশ্ন : একটা নতুন ভাষা শেখা কি আপনাকে নিজের ভাষা বাংলাকে, নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করেছে?
আককাস : অবশ্যই। অনেক ভাষা জানলে কিংবা সে সম্পর্কে জানাশোনা থাকলে নিজের ভাষাকে ভালোভাবে বোঝা যায়। আমরা ভাত খাই আবার পানিও খাই। ফারসিতে অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক ব্যাপার না হলে, তারাও ভাত এবং পানি খায় খোরদ্যান, মানে খাওয়া, পান করা নয়। মুজতবা আলীর লেখায় পড়েছিলাম, পারস্যের লোকেরা পানি খাায় এবং সম্ভবত সে কারণে, আমরাও পানি খাই। ব্যাপারটি নিজে জেনে বুঝতে পারাটা রোমাঞ্চকর।
প্রশ্ন : আজকের একজন তরুণ যদি বাংলা টাইপোগ্রাফি বা টাইপ ডিজাইন নিয়ে আগ্রহী হয়, সে কোথা থেকে শুরু করবে? কী পড়বে, কী দেখবে, কীভাবে প্র্যাকটিস করবে?
আককাস : বাংলার লিপিকৌশল বা হরফচর্চা বুঝতে নির্দিষ্ট কোনো লেখাপত্র বা বই আমরা লিখে উঠতে পারিনি। ইদানীং, খানিকটা আলোচনা হচ্ছে। অনেক ডিজিটাল টাইপ ফাউন্ড্রি হয়েছে। ফিওনা রসের একটা বই আছে; তাতে বাংলা ছাপার ইতিহাস খানিকটা পাওয়া যায়; কিন্তু হরফচর্চা হয় না। ফন্ট বানানোর জন্য প্রথমে সফ্টওয়্যারগুলো শেখা জরুরি। তবে শিখতেই হবে তা নয়। একজন নকশা এঁকে দিতে পারে এবং অন্যজন তা ফন্টে রূপান্তরিত করতে পারে। প্রথম, রোমান হরফচর্চা নিয়ে শুরু করা যেতে পারে। এতে করে, বাংলার হরফ বুঝতে সুবিধে হবে; হরফ দেখার চোখ তৈরি হবে। এটিই সবচেয়ে জরুরি। ভালো ছাপাইয়ের বই দেখে শিখতে হবে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে চারুকলার একটি বিভাগে হরফের নকশা শেখানো হয়। তবে এতে কারুর বিশেষ সুবিধা হয়েছে বলে শুনিনি। একটি ফোরামে কাজ করলে শুরু করাটা সহজ। লিপিকলা এ রকম কাজ করার চেষ্টা করছে। দেখা যাক, ভবিষ্যতে কতটুকু সুবিধা হয়।
প্রশ্ন : আমরা বাংলা হরফকে অনেক সময় শুধু ‘ভাষার বাহন’ হিসেবে দেখি। আপনার কাছে বাংলা হরফ কি এর চেয়ে বেশি কিছু একটি ভিজ্যুয়াল কালচারে?
আককাস : তা তো বটেই। সে কারণে হরফ একটু অন্য রকম করে লিখলে বা আঁকলে, অনেকে হৈ-হৈ করে ওঠে। এটা করা যতটা ঠিক, না করাটাও ততটাই ঠিক। তবে এটা বেশ বোঝা যায় যে, প্রচলিত নিয়মের বাইরে গেলে লোকে সহজভাবে নেয় না। উষ্ণ লিখতে আমরা সাধারণত ষ-এর পিঠে ঞ-এর বোঁচকা চাপিয়ে দিই। অথচ, ষ-এর নিচে ণ-ফলা দিতে পারি। লোকে হয়তো নেবে, হয়তো নেবে না। সেদিক দিয়ে দেখতে অবশ্যই দৃশ্যগত সংস্কৃতি। সে সংস্কৃতি কতটা ভাঙা হবে, কতটা গড়া হবে তার পুরোটাই নির্ভর করে নকশাকারদের ওপর।
প্রশ্ন : আপনি এত বছর ধরে নিজে নিজে এত কিছু শিখেছেন টাইপ ডিজাইন, কম্পিউটিং, বিভিন্ন ল্যাঙ্গুয়েজ, স্ক্রিপ্ট আপনার শেখার পদ্ধতিটা কী? একজন তরুণ কীভাবে এ ধরনের কৌতূহল তৈরি করতে পারে?
আককাস : আমি খুবই অগোছালো লোক। কিন্তু তার মাঝেও একটা ধরন থাকে। এ ধরনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ধৈর্য বা স্থৈর্য। আমি ২০২৩ সালের শুরু থেকে এস্পেরান্তো শিখছি। এক সময়, অনেকটা সময় ধরে শিখতাম। এখন দিনে ১৫ মিনিটের বেশি নয়। কিন্তু গেল চার বছরে মাত্র কয়েক দিন শেখা বাদ ছিল। কিছু শেখা শুরু করাটা জরুরি; তবে তার চেয়েও বেশি জরুরি শেখার ব্যাপারটা ধরে রাখা। সাধারণ কাজ বছরের পর বছর প্রতিদিন করলে তা অসাধারণ হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন : হরফচর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা পালন করছে বাংলা ভাষার লিটল ম্যাগাজিনে এ সম্পর্কে বলবেন।
আককাস : হরফচর্চার শুরুটা হয়েছিল ২০২৩ সালে। ত্রৈমাসিক লিপিকৌশলের পত্রিকা হিসেবে। প্রথম সংখ্যা বের হয়েছিল সে বছরের জুন মাসে। বছরে চারটে, দুই ফর্মার কাগজ। পাঁচ-ছয়টা লেখা নিয়ে। বাংলার হরফ বিষয়ক প্রচ্ছদ নিবন্ধ, কোনো একটি ফন্টের জন্ম কাহিনি, হরফ নিয়ে কোনো অনুষ্ঠানের ওপর প্রতিবেদন, হরফের বইয়ের পর্যালোচনা, হরফচর্চায় ব্যবহৃত শব্দ বা বিষয়ের ব্যাখ্যা, আর শেষ পৃষ্ঠায় থাকবে হরফ দিয়ে বানানো ছরি। এই ছবিটা যে কোনো ভাষার লিপির হতে পারে। সঙ্গে হরফ নিয়ে পুরনো লেখার পুনর্মুদ্রণ; ইংরেজিতে হলে, অনুবাদে। দাম খুব বেশি নয়। পত্রিকাটির লেখা প্রচ্ছদ থেকেই শুরু, সম্পাদকীয় দিয়ে। পুরো কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রধানত তিনজন সম্পাদক সুস্নাত চৌধুরী এবং আমি ছাড়া আরেকজন সম্পাদনা সহযোগী, সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়। সুস্নাত, সে বোধশব্দ পত্রিকার সম্পাদকও বটে এবং সঞ্জীব পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য বাংলার হরফচর্চা নিয়ে কথা বলা শুরু করা এবং পাঠক অন্তত হরফচর্চায় উৎসাহী ব্যক্তিদের দিশা দেখানো। এরপর যতটা দূর যাওয়া যায়। স্থানিক এবং ভাষিক বাংলায় তো বটেই, সম্ভবত বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান অর্থাৎ এই উপমহাদেশে এ ধরনের পত্রিকা এই প্রথম। এবং কাজটা অত্যন্ত জরুরি। তিন বছরে ১০টি সংখ্যা বের হয়েছে; তবে বের হওয়ার কথা ছিল ১২টি। আমরা বিবিধ কারণে মাস ছয়েক পিছিয়ে। প্রথম চারটে সংখ্যা আর পাওয়া যায় না। পরের দুটো সংখ্যাও প্রায় সব বিক্রি হয়ে গেছে। সে কারণে আমরা ঠিক করেছি যে একটি করে বর্ষসংখ্যা বের করব, বই আকারে; সঙ্গে থাকবে একটি বাড়তি লেখা। হরফচর্চা প্রথম বর্ষ অর্থাৎ প্রথম চারটে সংখ্যা নিয়ে প্রথম বর্থের বই আপাতত যন্ত্রস্থ। খুব শিগগির বাজারে আসবে। দ্বিতীয় বর্ষ আসছে বছর বের হবে। হরফচর্চা ১০ অর্থাৎ দশম সংখ্যার বিশেষত্ব হলো, এবার একটিই লেখা পত্রিকাজুড়ে। ১৭৭৮-পূর্ব বাংলা হরফের ছাপা নিয়ে, যার শুরুটা ১৬৯২ সালে। লেখাটি বড় হওয়ায়, পৃষ্ঠার সংখ্যা বেড়ে ৪০, অর্থাৎ আড়াই ফর্মা। আমরা পুরনো ছাপার ছবির ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য দেখাইনি।