বড় হয়ে টেনিসকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার কথা ছোটবেলায় কখনো ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি ইয়েলেনা রিবাকিনা। তবে নিয়তির কি অদ্ভুত ফের! স্রেফ প্যাশন থেকে খেলা শুরু করা সেই রিবাকিনাই গতকাল রাতে ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে উঠে টেনিসের বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানে নিজের নাম খোদাই করলেন।
ইউএস ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ঝেং কিনওয়েনকে ৩-৬, ৬-১, ৬-৪ গেমে হারিয়ে কেবল সেমিফাইনালের টিকিটই নিশ্চিত করেননি, দীর্ঘ ৯৯ সপ্তাহের আরিনা সাবালেঙ্কার অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে সিংহাসন দখল করলেন কাজাখস্তানের এই টেনিস সেনসেশন।
নিউইয়র্কের ফ্লাশিং মিডোজের পথটা মোটেও সহজ ছিল না রিবাকিনার জন্য। ইউএস ওপেন শুরুর মাত্র বারো দিন আগে সিনসিনাটি ওপেনে অ্যাকিলিসের চোটে পড়ে ইগা সিওনতেকের বিপক্ষে ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল তাকে। সেই চোটের কারণে টানা সাত দিন জিম বা অনুশীলনের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাকে।
আসরে নামার আগে শরীর কীভাবে সাড়া দেবে, তা নিয়ে খোদ তার নিজের মনেও সংশয় ছিল। চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে এবং প্রতিনিয়ত ধাপে ধাপে প্রস্তুতি নিয়ে এই টুর্নামেন্টে নামতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু সব অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে ঠিকই বাজিমাত করলেন ২৭ বছর বয়সী এই তারকা।
নিজের এই কঠিন পরিস্থিতি ও সুস্থ হয়ে ওঠার জার্নি নিয়ে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি জিমে নড়াচড়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি কিছু করতে পারিনি, তাই আমাদের সত্যি সত্যি দিন ধরে ধরে এগোতে হয়েছে। এটি এক দারুণ উন্নতি। সবকিছু যেভাবে শেষ পর্যন্ত মিলে গেছে, তাতে আমি সত্যি আনন্দিত। আমরা জানতামই না যে আমি খেলতে পারব কি না। আমার দারুণ একটা টিম আছে, আর ফোনের অপর প্রান্তে সবসময় খুব ভালো একজন ডাক্তারও ছিলেন।’
ম্যাচের শুরুটাও রিবাকিনার অনুকূলে ছিল না। আত্মবিশ্বাসী ঝেং কিনওয়েনের বিপক্ষে প্রথম সেটটি ৩-৬ গেমে হারিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন তিনি। নিজের বর্ণনায় নিজেই স্বীকার করেছেন যে শুরুর দিকে তার মানসিকতা বেশ নেতিবাচক ছিল এবং অনেক আনফোর্সড এরর করেছিলেন তিনি। তবে দ্রুতই সেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। নিজের ধ্বংসাত্মক সার্ভিসের চেনা ছন্দে ফিরে এবং বেসলাইনে আধিপত্য বিস্তার করে ম্যাচে দুর্দান্তভাবে কামব্যাক করেন তিনি। অন্যদিকে, এর আগে তিন কোয়ালিফায়ার ও মূল ড্রয়ের ম্যাচ মিলিয়ে প্রায় ১২ ঘণ্টা কোর্টে কাটানো ঝেং কিনওয়েন শেষ পর্যন্ত ক্লান্তির কাছে হার মানলে সহজেই জয় নিশ্চিত করেন রিবাকিনা।
এই জয়ে মেয়েদের টেনিস ইতিহাসের মাত্র ৩০তম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর স্থান স্পর্শ করলেন তিনি। তবে এই বিশাল অর্জনের পরও তার পা যে মাটিতেই আছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার ম্যাচ-পরবর্তী কথায়। বিশ্বসেরা হওয়ার অনুভূতি ও নিজের জীবন-দর্শন নিয়ে সরাসরি তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ক্যারিয়ার শেষে পেছনে তাকিয়ে এর মূল্য আরও বেশি বুঝতে পারব...খেলা ছাড়ার পর ‘আমি এতগুলো টুর্নামেন্ট জিতেছি, বিশ্বসেরা হয়েছিলাম’ এসব ভাবতে নিশ্চয়ই ভালো লাগবে। আমার মূল লক্ষ্য শিরোপা জেতা, তাই সব মনোযোগ এখন শুধুই পরের ম্যাচ নিয়ে।’
এদিকে কোর্ট ইন্টারভিউতে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এটি এখন কেবলই একটি সংখ্যামাত্র। আমি এই মুহূর্তে সেমিফাইনালে আছি এবং আমার একমাত্র লক্ষ্য হলো আমি যে টুর্নামেন্টেই খেলি না কেন, সেটির শিরোপা জেতা। আমি কেবল আমার খেলার ওপর ফোকাস করতে চাই এবং আগামীকালকের দিনটি উপভোগ করতে চাই।’
ম্যাচের কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে রিবাকিনা জানা, ‘কথা খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। এটি অত্যন্ত কঠিন একটি ম্যাচ ছিল, প্রচুর স্নায়ুর চাপ কাজ করেছে। হয়তো ম্যাচের মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল না, তবে আমি খুশি যে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে পেরেছি। আমি শুরুটা ভালো করতে পারিনি, খুব নেতিবাচক ছিলাম এবং প্রচুর আনফোর্সড এরর হয়েছিল। তবে আমি নিজেকে বলেছিলাম লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’
গত বছর ইউএস ওপেন মৌসুমে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর চোট ও অসুস্থতার ধাক্কা সামলে এ বছর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করেছেন রিবাকিনা। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয়ের পাশাপাশি স্টুটগার্ট ও নিংবোর শিরোপা এবং ইন্ডিয়ান ওয়েলস ও টরন্টোতে রানার্সআপ হয়ে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে বর্তমান টেনিস দুনিয়ায় তার ফর্ম কতটা অপ্রতিরোধ্য। সেমিফাইনালে তার প্রতিপক্ষ এখন যুক্তরাষ্ট্রের তারকা কোকো গফ। ইনজুরি আর হাজারো শঙ্কাকে বুড়ো আঙুল দিয়ে সিংহাসন দখলের পর এবার নিউইয়র্কের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মিশনে আরও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছেন এই কাজাখ তারকা।