নারীর প্রতি ডিজিটাল ও এআই-সহিংসতা বন্ধে ঢাকায় সংলাপ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নারীদের হয়রানি, মানহানি ও অনলাইনে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার ঘটনা মোকাবিলায় ঢাকায় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ সংলাপে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আইন, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ডিজিটাল ও এআই-নির্ভর সহিংসতা প্রতিরোধের উপায় নিয়ে সংলাপে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, আইনগত প্রতিকার এবং অনলাইনে কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও ও শব্দ ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, নারীর প্রতি ডিজিটাল ও এআই-সহিংসতা মোকাবিলায় অভিন্ন সংজ্ঞা, নীতিমালা ও মানদণ্ড তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এসব ঘটনা শনাক্ত, তদন্ত ও প্রতিকারের জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সংলাপে প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্টের যথাযথ পরিচিতি ও উৎস শনাক্তকরণের মানদণ্ড তৈরির প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়।

বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আইন প্রণয়ন ও পর্যালোচনা, পুলিশ, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের ডিজিটাল প্রমাণ এবং এআই-ভিত্তিক ফরেনসিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগীদের সহায়তায় হেল্পলাইন শক্তিশালী করা এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকেও নজর রাখার কথা বলা হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সংলাপটিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অনলাইনে নারীর দৈনন্দিন নিরাপত্তার বিষয়টিকে যুক্ত করছে।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, রাস্তাঘাটের পাশাপাশি অনলাইনেও যখন নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তখন জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ও ভুক্তভোগীদের সহায়তার কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে হবে।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এআই-নির্ভর অপরাধ তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে এখনো আইনি ও প্রমাণসংক্রান্ত নানা ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে কোনো ছবি বা কণ্ঠস্বর কৃত্রিমভাবে তৈরি হলে তাতে সংঘটিত ক্ষতি প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জারাত আদিব চৌধুরী বলেন, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে শুরু থেকেই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্ট সম্পর্কে স্বচ্ছতাকে ন্যূনতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলেও তিনি মত দেন।

মায়ের ডাকের প্রতিষ্ঠাতা ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলী ডিজিটাল ও এআই-নির্ভর সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য এমন প্রতিষ্ঠান ও সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানানোর শুরু থেকেই আস্থা ও সহযোগিতা পাবেন। একই সঙ্গে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে না হয়—এমন কার্যকর হেল্পলাইন ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীরা আইনগত ঘাটতি, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্ট মোকাবিলা এবং বিভিন্ন দেশে ভুক্তভোগীদের সহায়তার পদ্ধতি নিয়ে মতবিনিময় করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী ধাপে আগ্রহী কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্রকে ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ডায়ালগ’ হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি অভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ড নিয়ে একটি প্রাথমিক নথি তৈরির জন্য কারিগরি কর্মদল গঠন করা হবে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে নথিটি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে গত ২০ এপ্রিল আফ্রিকার শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক দশম ডাকার আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ যে ‘ঢাকা সংলাপ’ উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছিল, তা এগিয়ে নেওয়া হবে।