সা  ক্ষা  ৎ  কা  র রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা

ভক্তদের নির্জলা ভালোবাসায় ধন্য

সংগীত ভুবনে সুবাস ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। মিষ্টি কণ্ঠের জাদুতে জয় করেছেন কোটি শ্রোতার হৃদয়। তিনি কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। চার দশকের সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। আজ ১১ সেপ্টেম্বর, গুণী এই শিল্পীর জন্মদিন। বিশেষ দিনটি উপলক্ষে কথা হয় তার সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক আনন্দ

বিদেশে বেশ কিছু শো শেষ করে দেশে ফিরলেন।

ভক্তদের ভালোবাসা, এবারের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

এবারের বিদেশ ট্যুর খুবই ভালো ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, অত্যন্ত সফল একটি সফর। ইতালির রোম ও বোলোনিয়া, সুইডেন, ফ্রান্সের প্যারিস এবং লন্ডনে শো ছিল। মানুষের যে ভালোবাসা ও সম্মান দিন দিন পাচ্ছি, তাতে সত্যি আমি আবেগাপ্লুত।

জীবন থেকে আরও একটি বছর পেরিয়ে গেল। এ সময়ের উপলব্ধি জানতে চাইলে কী বলবেন?

সময় আর নদীর ঢেউ কারও জন্য বসে থাকে না, এটা চিরন্তন সত্য। আগে যখন বয়স বিশ-পঁচিশ ছিল, ভাবতাম ৩০ বছর মানে অনেক পরিণত বয়স। ৫০ পার করার পর অন্যরকম এক আবেগ কাজ করেছিল, অর্ধশতক পার করা জীবনের কথা ভেবে। এবার তো ৫৬ পেরিয়ে ৫৭-তে পা দিচ্ছি। মনে হয় সময় কত দ্রুত চলে যাচ্ছে! সামনের বছরগুলোতে বয়স বাড়বে, আর পৃথিবীর আলো-বাতাসে

থাকার সময় তো কমবে। পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ ছেড়ে কেউ যেতে চায় না। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেমন পচা-গলা ব্যাঙও জীবনের কাছে দুই দ- সময় ভিক্ষা চায়, মানুষও তেমনি জীবনকে অনেক ভালোবাসে। অসুস্থ, দুঃখী মানুষও বাঁচতে চায়। আমার তো আলহামদুলিল্লাহ ফুলের বাগানের মতো সাজানো সংসার, সুন্দর এক পৃথিবী! আমি মানুষ,

প্রকৃতি, ফুল-পাখি সবকিছু খুব ভালোবাসি। আমার জীবনের মূল কথা হলো ‘ভালোবাসি পৃথিবী, ভালোবাসি প্রাণ’। মনে হয় সময়টা কত দ্রুত কেটে গেল! তবে এত কিছুর পরও জন্মদিনের ১১ সেপ্টেম্বর তারিখটি আমার খুব প্রিয়।

জন্মদিন উদযাপনে আপনার নিজের অনিচ্ছা থাকলেও পরিবার ও ভক্তরা আয়োজনে কমতি রাখেন না। তাদের এই উচ্ছ্বাস কেমন লাগে?

আমার রক্তসম্পর্কের বাইরেও আরেকটা বড় পরিবার আছে। আমার গড়া অনলাইন স্কুল। সেই স্কুলের শিক্ষার্থীরা আমাকে ‘মা’ বলে ডাকে। আমরা নিরেট মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ; কেক কেটে ধুমধাম করে জন্মদিন পালন করা আমাদের সংস্কৃতি ছিল না। কিন্তু এখন এমন দাঁড়িয়েছে, পৃথিবীর যেখানেই যাই, সেখানেই জন্মদিনের উচ্ছ্বাস। কখনো অস্ট্রেলিয়া, কখনো কানাডা, আবার কখনো যুক্তরাষ্ট্রে ভক্তদের মাঝে জন্মদিনের ভালোবাসা পেয়েছি। আমার পরিবারের সদস্যরা তো আছেই, পাশাপাশি ফেসবুকের শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকেও অনেক আগে থেকে শুভেচ্ছা আসতে থাকে। এত শুভেচ্ছা যে, উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যাই! কিন্তু দিন শেষে এগুলো খুব ভালো লাগার স্মৃতি। মানুষের শ্রদ্ধাবোধ, অজস্র ভালোবাসা আর সুদীর্ঘ হায়াতের জন্য তাদের প্রার্থনাই এই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

অনেক কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। কনকচাঁপার নিজস্ব প্লে-লিস্টে কী ধরনের গান বাজে?

আমি নিজেকে সবসময় একজন ‘কণ্ঠশ্রমিক’ মনে করেছি। শ্রমিকের মতোই কাজ করে গেছি। কালজীয় হওয়া, জনপ্রিয় হওয়া বা পুরস্কার পাওয়ার উদ্দেশ্যে কখনো গাইনি। ভালোবেসে গেছি আর চেষ্টা করেছি সুরের অস্পষ্টতা বা আবেগের ঘাটতি যেন না থাকে। আমি মূলত উচ্চাঙ্গ সংগীত, নজরুল সংগীত এবং আমাদের মরমী কবি ও শিল্পীদের গান বেশি শুনি। পপ বা ইংরেজি গান খুব একটা শোনা হয় না। আর অদ্ভুত বিষয় হলো, আমার নিজস্ব প্লে-লিস্টে নিজের কোনো গান থাকে না! নিজের গান শুনলেই মনে হয়, এই জায়গাটার সুর আরেকটু ভালো দেওয়া যেত, কিংবা আরেকটু ভালো গাইলে ভালো হতো। আমাদের উপমহাদেশের অনেক গুণী শিল্পীর গান আমার প্রিয়। তবে দিন শেষে আমি অগণিত বার শুনি হৈমন্তী শুক্লার গান। তার গান শুনলে এক ধরনের নিজস্ব সৌরভ পাই, আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করি।

নতুন গানে এখন আপনাকে নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। এই দূরত্ব কেন?

এটা সর্বজনবিদিত। আমাকে নতুন গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বা আমি পাচ্ছি না। এ ছাড়া একটা জেনারেশন গ্যাপও তৈরি হয়েছে। আমরা যাদের সুরে গান গেয়েছি, তারা অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। নতুন প্রজন্মের সুরকাররাও অনেক মেধাবী, তবে তাদের সঙ্গে আমার নিয়মিত কাজ হওয়াটা হয়ে ওঠেনি। আমি এটাকে সংকট মনে করি না। যুগ বদলায়, শিল্পী বদলায়, এটা স্বাভাবিক নিয়ম। আজীবন তো একজন শিল্পী গান গেয়ে যাবেন না। আমার মনে হয়, গাওয়ার মতো বেশিরভাগ গান আমি গেয়ে ফেলেছি। তবে ভবিষ্যতে ভালো কোনো গান এলে অবশ্যই গাইব। গান কম হচ্ছে বলে যে মন খারাপ কিংবা পতন হচ্ছে, তা নয়। আমার জীবনে অনেক উত্থান ছিল, কিন্তু আমি মনে করি পতনের কিছু নেই। সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করাই আমার স্বভাব।

শিল্পীরা একটু বেশি অভিমানী হয়। অভিমান বা ভেতরের জমানো ক্ষোভ কীভাবে সামাল দেন?

আবেগের জায়গা বড় থাকলেও আমার কারও প্রতি কোনো ক্ষোভ, রাগ নেই। যা হয়েছে, তা সৃষ্টিকর্তার ফয়সালা। আমি তো গান ছেড়ে দিইনি, আর আমি কোনো দিন কোনো ইঁদুর দৌড়ে অংশও নিইনি। সুরকার-প্রযোজকরা যখন ডেকেছেন, গেয়েছি। লবিং করে কখনো কাজ করিনি। এখন নতুন গান হচ্ছে না, এতে কোনো আক্ষেপ নেই। আমার নিয়ম হলো, মা, স্বামী আর সন্তান ছাড়া আমি কারও ওপর রাগ করি না। আর কারও দেওয়া আঘাতও নিজের গায়ে মাখি না। আমি নিজের একটা সুরক্ষিত গ-ির মধ্যে থাকি, যাতে বাইরের কোনো বিষাদ ভেতরে আসতে না পারে। এ দেশের মানুষ, আমার ভক্তদের নির্জলা ভালোবাসাতেই আমি ধন্য। সত্যিই আমার জন্ম ধন্য হয়েছে।

রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে চান কি? দল যদি কখনো মূল্যায়ন করে, নতুন ডাকে সাড়া দেবেন?

রাজনীতি নিয়ে আসলে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না; কারণ আমি পেশাদার রাজনীতিবিদ নই, একজন রাজনীতিমনস্ক মানুষ। আমার উদ্দেশ্য ছিল দেশ ও মানুষের সেবা করা। সেখানে কোনো মূল্যায়ন হলো কী হলো না, তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। রাজনীতির পদে থাকি বা না থাকি, সবসময় যেভাবে দেশের মানুষের পাশে ছিলাম, এখনো সেভাবেই আছি এবং সারাজীবন থাকব। এ দেশের মানুষ আমার প্রাণের মানুষ। তাদের বিপদে-আপদে পাশে থাকার চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। আমি

পৃথিবীর সব সুন্দর ও ভালো কাজের সঙ্গে আজীবন যুক্ত থাকতে চাই।