নিরপত্তার অভাবে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য কালারমারছড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি শামসুল আলমের গালাগাল ও হুমকিতে বাধ্য হয়ে তারা স্কুল ছাড়ছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে গত সোমবার নবম শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগের দুই ছাত্রী ছাড়পত্র নিয়েছে। এ ছাড়া গতকাল বুধবার একই শ্রেণির আরও তিন ছাত্রী ছাড়পত্র নিতে চাইলেও দেয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে ছাড়পত্র না দিলেও নবম শ্রেণির আরেক ছাত্র গতকাল বুধবার অন্যত্র ভর্তি হয়েছে। এদিকে এই প্রতিবেদকের মাধ্যমে খবর পেয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্কুলটি পরিদর্শন করে প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শাতে বলেছেন।
স্কুল কর্তৃপক্ষ, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত রবিবার টিফিনের সময় নবম শ্রেণির পাঁচ ছাত্রীসহ অনেকেই স্কুলসংলগ্ন একটি কোচিং সেন্টারে খাবার খেতে যায়। ওই সময় বহিরাগত চারজন ছেলে সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা বাধা দেয়। পরে ওই চারজনের একজন তার চাচা বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য
কৃষক দলের নেতা শামসুল আলমকে ডেকে আনে। তিনি এসেই শিক্ষার্থীদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। পরে তাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নিয়ে আসেন এবং অভিভাবকদের ডেকে ওই শিক্ষার্থীদের চরিত্রহনন করে কথা বলেন। অভিভাবকরা এর প্রতিবাদ করলে শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে বের করা দেওয়াসহ অভিভাবকদের হুমকি দেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শামসুল আলম বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, স্কুল চলাকালে ওই পাঁচ ছাত্রী একটি কোচিং সেন্টারে অবস্থান করছিল। স্কুলের শিক্ষক রফিকের কাছ থেকে খবর পেয়ে আমি সেখানে যাই এবং তাদের নিয়ে স্কুলে আসি। এরপর প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে তাদের অভিভাবকদের খবর পাঠাই। অভিভাবকদের সন্তানদের নজরে রাখার পরামর্শ দেই। শিক্ষার্থীদের একটু শাসন করি। এর বাইরে কিছুই ঘটেনি। শিক্ষার্থীরা কেন ছাড়পত্র নিয়ে চলে যাচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর কারণ আমার জানা নেই। এটা অভিভাবকরা ভালো বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা বলে, আমাদের স্কুলের খাবার পানি ব্যবহার অনুপযোগী এবং এখানে খাবারের জন্য আলাদা স্থান নেই। আর কোচিং সেন্টারটি স্কুল থেকে দুই-তিন মিনিটের পথ। সে কারণে আমরা সেখানে টিফিন করতে গেছি। টিফিন থেকে ফেরার আগেই ওই নেতা সেখানে যান। এরপর কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করেই আমাদের বাবা-মা তুলে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেন। পরে আমাদের স্কুলে নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও আমাদের অভিভাবকদের সামনে আমাদের চরিত্রহননসহ নানা কটু কথা বলেন। এসব আমাদের অভিভাবকরাও সহ্য করতে পারেননি।
তারা আরও বলেন, আমাদের ক্লাসের ছয়জন ছেলে মাঝেমধ্যেই আমাদের উত্ত্যক্ত করে, পথ গতিরোধ করে, নানা ধরনের খারাপ প্রস্তাব দেয়। তাদের পক্ষে আমাদের ক্লাসের তিন মেয়ে সাফাই গাইত। এ নিয়ে আমরা প্রধান শিক্ষককে লিখিত অভিযোগ দেই। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিলাম তাদের দুজন ওই অভিভাবক সদস্যের আত্মীয়।
ছাড়পত্র নিয়ে চলে যাওয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, রবিবারের ঘটনার বিষয়ে আমি প্রধান শিক্ষককে ব্যবস্থা নিতে বলি। কিন্তু তিনি অপরাগতা প্রকাশ করেন। এরপর তাকে বলি তাহলে রবিবার আপনার সামনে যা ঘটেছে তা লিখে দেন আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব। সেটিও তিনি দেননি। তারপর আমার বোনসহ অন্য শিক্ষার্থীদের স্কুলের ভেতরে নিরাপত্তা দিতে তারা পারবে কি না জানতে চাইলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন কোনো নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। পরে আমরা দুজনের জন্য ছাড়পত্র নিই। বাকি তিনজন মঙ্গলবার ছাড়পত্রের জন্য গেলেও প্রধান শিক্ষক না থাকায় পায়নি।
আরেক অভিভাবক বলেন, ওই স্কুলে যে পরিবেশ সেখানে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর অবস্থা নেই। নিরাপত্তা নেই। তাই আমিসহ তিন অভিভাবক মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দিন স্কুলে ছাড়পত্র আনতে গিয়েছি। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ এখন অনুনয়-বিনয় করে ছাড়পত্র দিতে রাজি হচ্ছে না। কিন্তু আমার মেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। সে ওই স্কুলে পড়তেই চাচ্ছে না। এ বিষয়ে স্কুল কমিটির সভাপতি আবু হেনা মোস্তফা বলেন, স্কুল সময়ে কোচিংয়ে থাকায় ওই শিক্ষার্থীদের প্রধান শিক্ষকের কাছে ডাকা হয়। এর পর অভিভাবকদের ডাকা হয়। সেখানে আমি ছিলাম না, গালমন্দ করার বিষয়টি আমার জানা নেই।