খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন

২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সর্বজিৎ ঘোষ হৃদয়কে জানানো হয়েছিল, সে ফেল করেছে। বরিশালের উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ওই শিক্ষার্থীকে হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে অকৃতকার্য দেখানো হয়েছিল। কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়ার হতাশায় সেদিনই আত্মহত্যা করে সে। তার মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি গল্প। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ফলে ভুল ছিল।

সংশোধিত ফলে দেখা গেছে, সর্বজিৎ ফেল করেনি, সে ৪.৬৭ জিপিএ নিয়ে পাস করেছিল। একই ভুলে ওই বছর আরও ১ হাজার ১৪১ শিক্ষার্থী ফেল করেছিল, পরে পুনর্মূল্যায়নে পাস করে তারা। এক দশক পর ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে ৪ হাজার ৫৮৫ শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছে।

আবারও পুরনো প্রশ্ন সামনে এসেছে ভুল মূল্যায়ন যখন শিক্ষার্থীর জীবন কেড়ে নিতে পারে, তখন খাতা মূল্যায়নের এ ব্যবস্থার দায় কে নেবে? ফল প্রকাশের পর জানা যায়, কেউ ফেল থেকে পাস করেছে, কেউ জিপিএ-৫ পেয়েছে; পাস করা শিক্ষার্থীর বেড়ে গেছে গ্রেড। তাহলে ফল প্রকাশের আগে খাতা দেখার সময় ভুলগুলো ধরা পড়ে না কেন?

আগে পুরো উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ ছিল না। এবার প্রথমবারের মতো পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ শিক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করে। তাদের আবেদনের পর ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৮টি উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। ৫৬ হাজার ২৫৯টি খাতায় নম্বর পরিবর্তিত হয়েছে এবং ২৭ হাজার ৮৩৬ শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন করে ৪ হাজার ৫৮৫ জন ফেল থেকে পাস করেছে এবং ৩ হাজার ৭৯ জন নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এবার উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মূল্যায়নব্যবস্থার ভেতরের ভুলের ব্যাপকতাও দৃশ্যমান হয়েছে।

পাঁচ বছরে বদলেছে হাজারো ফল : গত ৫ বছরের পরিসংখ্যানেও রয়েছে উদ্বেগজনক চিত্র। ২০২২ সালে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৫৪টি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়ে। ২ হাজার ৭৮৩ জনের ফল পরিবর্তিত হয়। ২০২৩ সালে আবেদন বেড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি হয়; ফল পরিবর্তিত হয় ১১ হাজার ৩৬২ শিক্ষার্থীর। ২০২৪ সালে প্রায় ৫ লাখ খাতা চ্যালেঞ্জ করা হয়, ফল পরিবর্তিত হয় ৮ হাজার ৮৭৫ জনের। ২০২৫ সালে ৬ লাখ ২৩ হাজার খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়ে এবং ১৫ হাজার ২৪৩ জনের ফল পরিবর্তিত হয়।

২০২৩ সালে পুনর্নিরীক্ষণের পর ২ হাজার ২১২ জন ফেল থেকে পাস করে এবং ১ হাজার ৮১১ জন নতুন করে জিপিএ-৫ পায়। ২০২৪ সালে ১ হাজার ১১০ জন ফেল থেকে পাস এবং ১ হাজার ২২৪ জন নতুন করে জিপিএ-৫ পায়। ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৯২৫ জন ফেল থেকে পাস করে এবং ১ হাজার ৪৫ জন নতুন করে জিপিএ-৫ অর্জন করে।

২০২৬-এ বদলে গেল নিয়ম, বেরিয়ে এলো আসল চিত্র

এতদিন পুনর্নিরীক্ষণ মানে ছিল মূলত হিসাবের ভুল খোঁজা। ২০২৬ সালে আবেদন করা উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে পরীক্ষক যে নম্বর দিয়েছেন, তা যথাযথ হয়েছে কি না, সেটিও প্রশ্নের আওতায় আসে। এর ফলেই মাত্র এক দফা পুনর্মূল্যায়নেই ৫৬ হাজারের বেশি উত্তরপত্রে নম্বর বদলেছে এবং ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের গ্রেড বদলেছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫৮৫ জনের আগের ফল ছিল ফেল। পুনর্মূল্যায়নে তারা পাস করেছে। ফলে খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন একজন শিক্ষার্থী জানে সে জিপিএ-৫ পাবে কিন্তু ফলাফলের পর দেখে, ফেল করেছে; তখন তার মধ্যে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। বিষয়টি খুব সিরিয়াস, এটা উপলব্দি করেই এবার পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেসব পরীক্ষকের খাতায় ১০ নম্বরের বেশি বা কম দেওয়া হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে আগামী সপ্তাহে আমাদের বৈঠক আছে। পরীক্ষা আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

সংসদে সম্প্রতি ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে, যার অধীনে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষাসহ পাবলিক পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত বেশি বা কম নম্বর প্রদানকারী পরীক্ষকদের ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে।

অল্প সময়ে বেশি খাতা, মূল্যায়নে গাফিলতির অভিযোগ

শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র অল্প সময়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে পরীক্ষকদের ওপর চাপ তৈরি হয়। নির্ধারিত পরিবেশের বাইরে খাতা মূল্যায়নের অভিযোগও রয়েছে। বাড়িতে নিয়ে খাতা দেখা, অন্যের সহায়তা নেওয়া কিংবা অনিয়মিত পরিবেশে উত্তরপত্র মূল্যায়নের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। তারা বলেন, একজন পরীক্ষক প্রশ্নের উত্তর না দেখলে, নম্বর যোগে ভুল করলে বা প্রাপ্য নম্বরের চেয়ে কম নম্বর দিলে তার প্রভাবে শিক্ষার্থীর পুরো শিক্ষাজীবন বদলে যেতে পারে। একজন শিক্ষার্থী যদি খাতা মূল্যায়কের ভুলে ফেল করে, তাহলে তার শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটতে পারে, কখনো কখনো আত্মঘাতী হতে পারে। আবার যারা কম নম্বর বা গ্রেড পায় তারা যদি পছন্দের প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে না পারে, তাহলে পরিবারে মানসিক চাপে পড়তে পারে। তাই পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ভুলকে নিছক প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

খাতা দেখায় পেশাদারি কতটা?

উত্তরপত্র মূল্যায়ন একটি পেশাগত দায়িত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে, পরীক্ষক নির্বাচনে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতার পাশাপাশি মূল্যায়নের পরিবেশ ও সময় নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না।

একজন শিক্ষককে যদি বিপুলসংখ্যক খাতা অল্প সময়ে মূল্যায়ন করতে দেওয়া হয়, তাহলে দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ তৈরি হতে পারে। আবার খাতা মূল্যায়নের নির্ধারিত পরিবেশ, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত না হলে ভুল বা অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে। ফলে শুধু পরীক্ষককে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। পরীক্ষক নির্বাচন, খাতা বণ্টন, মূল্যায়নের সময়সীমা, পর্যবেক্ষণ, প্রধান পরীক্ষক যাচাই মাননিয়ন্ত্রণের পুরো ব্যবস্থাটিই পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এতদিনের পুনর্নিরীক্ষণ ব্যবস্থাই কি শিক্ষার্থীবান্ধব ছিল?

গত ৫ বছরের তথ্য বলছে প্রতি বছর লাখ লাখ খাতা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে শিক্ষার্থীরা। এতদিন তাদের মূল উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ ছিল না। ফলে কোনো পরীক্ষক কোনো উত্তর ভুলভাবে মূল্যায়ন করলেও শুধু যোগ-বিয়োগ ঠিক থাকলে ভুল অনেক ক্ষেত্রে পুনর্নিরীক্ষণে ধরা পড়ত না। ২০২৬ সালের পরিবর্তন এ সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

শুধু নম্বরের যোগ-বিয়োগ পরীক্ষা করে একজন শিক্ষার্থীর ফলের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যায় না। এবারের ফলাফলের পর শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের সামনে বড় সুযোগ এসেছে উত্তরপত্র মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াকে নতুন করে সাজানোর।

প্রথমত, পরীক্ষকদের মান ও যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, খাতা মূল্যায়নের পরিবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তৃতীয়ত, একজন পরীক্ষক কতগুলো খাতা নির্দিষ্ট সময়ে দেখতে পারবেন, তার যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ করতে হবে। চতুর্থত, প্রধান পরীক্ষকের নমুনা যাচাই আরও কার্যকর করতে হবে। পঞ্চমত, মূল্যায়নের পর ঝুঁকিপূর্ণ বা অস্বাভাবিক নম্বরের খাতা প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে পুনরায় যাচাই করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়নের অধিকার স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষাকে শিক্ষার্থীবান্দব করার লক্ষ্যে কাজ করছি। যারা খাতা দেখার দায়িত্বে ছিলেন, তারা যদি ইচ্ছাকৃত ভুল করেন কিংবা তাদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’