‘সংগঠন শক্তিশালী হলে সরকার শক্তিশালী হবে’

দলের নেতৃত্ব নির্বাচন এবং শূন্য পদ পূরণে চলতি বছরের ডিসেম্বরে দলের সপ্তম কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। কাউন্সিলের আগে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি অনেকটা চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। যেকোনো সময়ে এ কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। এ ছাড়া দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচন করতে হবে। পাশাপাশি দলের যেসব গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে সরকারে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে সেসব জায়গায় নতুন নেতা নির্বাচন করা দরকার। সংগঠন শক্তিশালী হলে সরকারও শক্তিশালী হবে। গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে এমনটাই জানিয়েছেন দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা।

সপ্তম কাউন্সিলের বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি বছরেই দলের কাউন্সিল করার কথা ভাবা হচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। দিন, তারিখ ঠিক হলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।’

বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিসেম্বরে দলের জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা। শিগগিরই স্থায়ী কমিটির সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করবেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারপর কাউন্সিলের ঘোষণা আসবে।’

এদিকে বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জাতীয় কাউন্সিল এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়ে দলীয়ভাবে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। অনেক নেতার মতে, স্থানীয় নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়ো করে কাউন্সিল করতে গেলে তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠন নিয়ে অন্তর্কোন্দল বা অসন্তোষ তৈরি হতে পারে, যা নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কাউন্সিলের তারিখ কিছুটা পেছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে এ নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

জাতীয় কাউন্সিলের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা প্রদানের কারণে যথাসময়ে দলের কাউন্সিল করা যায়নি। আওয়ামী লীগের পতনের পর নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম আমরা। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সপ্তাহে একদিন জেলা নেতাদের সঙ্গে বসছেন। কাউন্সিলের বিষয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা হলেও স্থায়ী কমিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা হয়নি। আগামীকাল (আজ) স্থায়ী কমিটির বৈঠক রয়েছে। বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।’

প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে গত ১ সেপ্টেম্বর ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর এটিই ছিল দলটির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তবে পাঁচ দিনের কর্মসূচির আনুষ্ঠানিকতা ছাপিয়ে বিএনপির ভেতরে এখন আলোচনার কেন্দ্রে প্রায় এক দশক ধরে না হওয়া সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল। কাউন্সিল কবে হবে, নেতৃত্বে কী পরিবর্তন আসবে এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উত্তরসূরি হিসেবে মহাসচিবের দায়িত্ব কে পাবেন এ নিয়েই নেতাকর্মীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার পর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়েছে। এখন তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হবেন নাকি নতুন কাউকে মহাসচিব করা হবে তা দলটির সপ্তম কাউন্সিলে দলের কাউন্সিলরা ঠিক করবেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর দলের কাউন্সিল হওয়ার কথা। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়েছিল। এদিকে রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদ খালি হয়েছে। এ পদে কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে। অবশ্য ইতিমধ্যে স্থায়ী কমিটিতে নেওয়া হয়েছে রুহুল কবির রিজভী, দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও ইসমাইল জবিউল্লাহকে।

বিএনপির এক যুগ্ম মহাসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংগঠন শক্তিশালী হলে সরকার শক্তিশালী হবে। আর সংগঠন দুর্বল হলে সরকার দুর্বল হবে। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজপথে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে দল ও অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনগুলো শক্তিশালী না হলে রাজপথে তাদের মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই বিলম্ব না করে অবিলম্বে দল গোছাতে হবে। পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে।’

এদিকে কাউন্সিলের আগে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। তারা বলছেন, দলের চেয়ারম্যান এ নিয়ে কাজ করছেন। শিগগিরই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।

গত ১৩ আগস্ট বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরসহ ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বসেছিলেন। এ সময় নতুন কমিটি ঘোষণার কথা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। বৈঠক শেষে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে বিদায়ী স্ট্যাটাস দেন।

১৩ আগস্ট রাত ১টার দিকে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে রাকিব বলেন, ‘অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে।’

পরের দিন ১৪ আগস্ট সকালে নাছির উদ্দীন নাছির ফেসবুক পোস্টে তার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলা, দায়িত্বকালের নানা অভিজ্ঞতা, সাফল্য-ব্যর্থতা, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন এবং সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। বিদায়ী বার্তায় তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন।’

সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের এমন স্ট্যাটাসের পর ছাত্রদলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা আশা করেছিলেন দুই-একদিনের মধ্যে নতুন কমিটির ঘোষণা আসবে। কিন্তু এরপর প্রায় এক মাস কেটে গেছে। এদিকে নতুন কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে সম্ভাব্য নেতারা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। পদপ্রত্যাশী নেতারা নিজ নিজ পদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে এবং নীতিনির্ধারকদের আস্থা অর্জন করতে জ্যেষ্ঠ নেতাদের বাসভবন, কার্যালয় কিংবা বলয়ে নিয়মিত দৌড়ঝাঁপ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিসহ দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকছেন। নেতারা আশা করছেন নতুন কমিটিতে আসার জন্য ত্যাগ ও মেধার বিচার করবে দলের হাইকমান্ড।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। সংসদ অধিবেশন চলাকালে নতুন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার জন্য সম্ভাব্য নেতাদের জাতীয় সংসদে দেখা গেছে। দলের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে। তারা দলের চেয়ারম্যান ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন।

ছাত্রদলের নতুন কমিটির শীর্ষপদে কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, সহসভাপতি মঞ্জরুল আলম রিয়াদ, খোরশেদ আলম সোহেল, তৌহিদুর রহমান আউয়াল, মো. কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ইজ্জাজুল কবির রুয়েল, সহসভাপতি এইচএম আবু জাফর ও যুগ্ম সম্পাদক গাজী সাদ্দাম হোসেন। আরও আলোচনায় রয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, রাজু আহমেদ, ফারুক হোসেন, মো. মোস্তাফিজুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ আদনান, আজিজুল হক জিয়ন এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স।

এ ছাড়া যুগ্ম সম্পাদক পদমর্যাদায় প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন ইশরাকও রয়েছেন আলোচনায়।

জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান দুজনই সংসদ সদস্য হয়েছেন। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রাজীব আহসান। এমন পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছাসেবক দলকে গতিশীল করতে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে যাচ্ছে বিএনপি। এদিকে স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটিতে আসার জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা দৌড়ঝাঁপ করছেন। দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিজ নিজ সমর্থক নেতাকর্মীদের নিয়ে শোডাউন করছেন।    

স্বেচ্ছাসেবক দলের আসন্ন কমিটিতে শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় আছেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন, কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক কাজী মোখতার হোসাইন, আব্দুর রহিম হাওলাদার সেতু, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাদরেজ জামানের নাম।

এ ছাড়া কাজী আব্দুল্লাহ আল মামুন, এমজি মাসুম রাসেল, নজরুল ইসলাম নোমান, শেখ ফরিদ হোসেন, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল ও অধ্যাপক ওয়াহিদ বিন ইমতিয়াজ বকুলের নামও আলোচনায় রয়েছে। অবশ্য জুয়েলের নাম যুবদলেও আলোচনা রয়েছে।