৯০ শতাংশ সরকারি গাড়ির আয়ু শেষ

প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত সরকারি গাড়ির ৯০ শতাংশই আয়ুষ্কাল বা লাইফটাইম হারিয়েছে। পরিবহন পুল হিসেবে পরিচিত সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের অধীনে থাকা গাড়ির সংখ্যা বর্তমানে ২ হাজার ৬০টি। এসব গাড়ির বেশিরভাগই ১৫ থেকে ২০ বছর বা তারও বেশি পুরনো। গাড়িগুলোর বডি ও ইঞ্জিন দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারপরও সেগুলোই মেরামত করে সচল রাখা হয়েছে। এ কারণে প্রতিবছর কয়েকশত কোটি টাকা সরকারের বাড়তি ব্যয় বা অপচয় হচ্ছে। অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১২-১৩ সালের পর আর কোনো গাড়ি ক্রয় করা হয়নি।

পরিবহন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) রাজা মুহম্মদ আব্দুল হাই দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিগগিরই আমরা গাড়ি ক্রয়ের অনুরোধপত্র উপরে পাঠাবো। পুরনো গাড়ির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, মেইনটেন্যান্স কস্ট (গাড়ির ব্যবস্থাপনা ব্যয়) বর্তমানে একটু বেশিই হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গাড়ির বয়স ১০ বছর অতিক্রম করলে গাড়ির কন্ডিশন বা অবস্থা বিবেচনায় প্রতিস্থাপন করা যায়। তবে, এটিই একটি গাড়ির চূড়ান্ত আয়ুষ্কাল নয়। এটি নির্ভর করে গাড়ির ব্যবহার ও মেইনটেন্যান্স, দুর্ঘটনা বা অগ্নিকান্ডজনিত ক্ষতির ওপর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি কাজে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতে ব্যবহৃত গাড়ি ও নৌযানের সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কোনো দপ্তরে নেই। পরিবহন পুলের কাছে যে হিসাব রয়েছে তা সরকারের সব গাড়ির মোট হিসাবকে প্রতিনিধিত্ব করে না। কারণ, টেবিল অব অরগানাইজেশন অ্যান্ড ইক্যুইপমেন্ট (টিওঅ্যান্ডই) অনুযায়ী প্রত্যেক মন্ত্রণালয় বা অধীনস্থ সংস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ আয় বা বাজেট বরাদ্দ থেকে গাড়িসহ প্রয়োজনীয় সব ক্রয় করার সুবিধা পায়। ওইসব গাড়ির হিসাব পরিবহন পুলে নেই। এর বাইরে বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প বা এডিপির আওতাধীন ক্রয় করা কয়েকশত গাড়ির হিসাবও পরিবহন পুলে নেই। এই দুই ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গাড়ির তথ্য চেয়েও পায় না সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর।

টিওঅ্যান্ডইর আওতায় ক্রয় করা গাড়ির তথ্য নেই পরিবহন পুলে : কোনো মন্ত্রণালয় বা অধীনস্থ দপ্তর কিংবা কোনো বিভাগ ও সংস্থা কোনো গাড়ি ক্রয় করলে তার তথ্য যানবাহন অধিদপ্তরকে দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্ত তা প্রতিপালন করা হয় না। যানবাহন অধিদপ্তর চিঠি দিয়ে ওই তথ্য চেয়েও পায় না। অথচ, হিসাবের বাইরে ওইসব গাড়ির তেল ও মেরামত খরচ পরিশোধ করে যানবাহন অধিদপ্তর। রাজধানীতে একটি কেন্দ্রীয় পুল ছাড়াও জেলা এবং উপজেলায় পরিবহন পুল থেকে ওই সুবিধা দেওয়া হয়। বিধি অনুযায়ী, কোনো সরকারি গাড়ি মেরামতের প্রয়োজন হলে তা পরিবহন পুলেই করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাড়ি মেরামতের কাজ পরিবহন পুলে করা সম্ভব না হলে সেখান থেকে ক্লিয়ারেন্স ও সম্ভাব্য ব্যয়ের চাহিদাপত্র নিয়ে অন্যত্র মেরামত করা যাবে। যানবাহন অধিদপ্তর সরকারি গাড়ি মেরামতের ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় অনুমোদন করতে পারে। এর বেশি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়।

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিদের গাড়ি : এদিকে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের গাড়ি সরবরাহ করলেও সংসদ সদস্যদের গাড়ির হিসাব পরিবহন পুল সংরক্ষণ করে না। কারণ, এমপিরা শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে নিজেরাই গাড়ি ক্রয় করে ব্যবহার করতে পারে। পরিবহন পুল থেকে এমপিদের গাড়ি দেওয়া হয় না। পুলিশ, সেনা, নৌ, বিজিবি, র‌্যাব, ফায়ারসার্ভিসসহ সব বিশেষায়িত বাহিনী টিওঅ্যান্ডই অনুযায়ী বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থব্যয় করে গাড়ি কিনে নিতে পারে।

সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) তানভীর আযম সিদ্দিকী জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজে যে গাড়ি ব্যবহার করছেন তা আমাদের (পরিবহন পুলের) নয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নিজস্ব পরিবহন পুল রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পের গাড়ির হিসাব প্রকাশ করা হয়নি : অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রকল্পের গাড়ির হিসাব নেওয়া হবে বলে জানান। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ নভেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠিতে জানানো হয় যে, প্রকল্প শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে গাড়ির সংখ্যা ও অবস্থা সম্পর্কে জানাতে হবে। প্রকল্প শেষের ৬০ দিনের মধ্যে গাড়ি সরকারি পরিবহন পুলে জমা দিতে হবে। এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে সংবাদ মাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছিলেন, মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো সমাপ্ত প্রকল্পের গাড়ির হিসাব দিয়েছে। কিন্ত পরে আর সেই হিসাব প্রকাশ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার।

গাড়ির চাহিদা ও ঋণসুবিধা : আগে সরকারের কর্মকর্তাদের পরিবহন পুল থেকেই সরাসরি মন্ত্রণালয়, অধীনস্থ দপ্তর বা সংস্থার রিকুইজিশনের ভিত্তিতে গাড়ি সুবিধা দেওয়া হতো। ২০১৭ সালে মার্চে সরকার এক নীতিমালার মাধ্যমে সরকারের উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের গাড়িক্রয় বাবদ সুদবিহীন ৩০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া শুরু করে। একইসঙ্গে তাদের গাড়ি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মাসে ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দও দেয় সরকার। ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে ২ হাজার ৩৫৭ কর্মকর্তা ওই ঋণসুবিধা পায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ওই সুবিধা অব্যাহত ছিল। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৬- এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২২৬ উপসচিব ওই ঋণসুবিধা নেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ওই ঋণসুবিধা স্থগিত করে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে চাহিদা থাকলেও অধিকাংশ গাড়ি মেরামতের জন্য কারখানায় থাকার ফলে সব সময় গাড়ি সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয় না।

চব্বিশের ৫ আগস্টের পর পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া ১৯ গাড়ির ১৬টির তথ্য নেই : ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সরকারের যেসব গাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল তার সংখ্যা মোট ১৯টি। এর মধ্যে মাত্র ৩টির রেজিস্ট্রেশন-সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে হস্তান্তর করেছে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর। কিন্তু অবশিষ্ট ১৬টি গাড়ির কোনো তথ্য না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছে অধিদপ্তর। ওইসব গাড়ি এতদিন সচিবালয়ের অভ্যন্তরে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। দুই বছরের বেশি সময় পড়ে থাকায় ওই গাড়িগুলো ব্যবহারোপযোগী নেই। সর্বশেষ নিরাপত্তাজনিত কারণে গাড়িগুলোর কয়েকটি কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে ও পাশ্বর্বর্তী মেরামত ওয়ার্কশপে রাখা হয়েছে। এগুলো শনাক্তকরণে পুলিশ ও বিআরটিএর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

অকেজো গাড়ি নিলামে : দুই লটে মোট ১৩৫টি অকেজো গাড়ি নিলামের মাধ্যমে বিক্রির চেষ্টা করছে যানবাহন অধিদপ্তর। কিন্তু ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। একটি লটে ৬৮টি এবং অপর লটে ৬৭টি অকেজো গাড়ি রয়েছে। নিলামের ক্ষেত্রে প্রতিটি গাড়ির একটি সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ওই দরে বিক্রি না হলে পুনর্মূল্যায়ন করে ফের নিলামের আয়োজন করে যানবাহন অধিদপ্তর।

গাড়ি ক্রয়ে বরাদ্দের অর্থ ফেরত যায় : গাড়ি ক্রয়ে প্রতি অর্থবছরেই প্রায় ৬-৭শ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ থাকে। কিন্ত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১০-১১ বছর কোনো গাড়ি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও দুইবার গাড়ি ক্রয় প্রস্তাব ফেরত দেয়। সর্বশেষ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগের অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ অর্থ দিয়ে নতুন গাড়ি ক্রয়ের প্রস্তাব দিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

পরিবহন পুলের অধীনে গাড়ি : বর্তমানে পরিবহন পুলের অধীনে রাজধানী থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে থাকা ২ হাজার ৬০টি সচল গাড়ির মধ্যে রয়েছে ১৯৬টি কার, ১ হাজার ১৯৬টি জিপ, ১৩০টি মাইক্রোবাস, ১৫৪টি পিকআপ, ৩৭৪টি মোটরসাইকেল, ৬টি মিনিবাস, ১টি রেকার, ২টি ফ্রিজিং ভ্যান ও ১টি অ্যাম্বুলেন্স। এসব গাড়ির মধ্যে কেমরি, ল্যান্সার, বিএমডাব্লিউ ও পাজেরোর মতো বিলাসবহুল দামি গাড়িও রয়েছে।

এর বাইরে নৌযান হিসেবে ৬০টির মতো স্পিডবোট রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে যা দিয়ে প্রায় ১০০টির মতো স্পিডবোট কেনা যাবে।

অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, এ-গ্রেডের জেলা ১২-১৪টি, বি-গ্রেডের জেলা ১০টি ও সি-গ্রেডের জেলা ৮টির মতো সরকারি গাড়ি পেয়ে থাকে।

পরিবহন পুলের ব্যয় বেড়েছে : জানা যায়, পরিবহন পুলের জন্য সরকার প্রতিবছর প্রায় ৫ থেকে ৭শ কোটি টাকা পরিচালন ব্যয় বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এর বেশিরভাগই অচল গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে চলে যায়। অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় হয় সরকারি গাড়ির তেলসুবিধা দিতে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অচল গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় বেশি হচ্ছে।

জনবল : বর্তমানে কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপে কর্মরত রয়েছেন ১৬০ জন। প্রতি শিফটে ৮০ থেকে ৯০ জন একসঙ্গে দিনরাত ডিউটি করেন। মোট ১৫টি লাইনে গাড়ি মেরামত করা হয় এখানে। এ ছাড়া, সারা দেশে বিভাগে, জেলায় ও উপজেলায়ও পরিবহন পুলে অর্গানোগ্রামের তুলনায় কম জনবল কাজ করছে।