‘সুমন বিদায়... দেড়যুগ একসঙ্গে কাজ করেছি, কখনো কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। যদি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও।’ সুদীর্ঘ দেড় দশকের কাজের স্মৃতিঘেরা সেই চেনা অফিসে বসে, সহকর্মীর উদ্দেশে লেখা এক টুকরো কাগজে নিজের শেষ আকুতি এভাবে রেখে গেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি (৫৭)।
শারীরিক যন্ত্রণা ও চাকরি হারানোর নীরব হতাশার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে, যে সমকাল অফিস ছিল তার প্রতিদিনের চেনা আঙিনা, সেখানেই শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় মিলল বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদকের ঝুলন্ত মরদেহ। নগরীর প্যারারা রোডের সমকাল ব্যুরো অফিস থেকে মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি পুলিশ তার হাতে লেখা পাঁচটি আলাদা সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে। যেখানে ফুটে উঠেছে এক অভিমানী সাংবাদিকের সংসার, সন্তান ও শেষ জীবনের চরম বাস্তবতার চিত্র।
প্রশাসনের উদ্দেশে
‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শরীরের রোগ সহ্য করতে পারছিলাম না। সুস্থ থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। ইন্ডিয়ার ভেলোরে পর্যন্ত ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু সুস্থ হতে পারি নাই। অসুস্থতা আমাকে সামাজিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে। শরীরের যন্ত্রণাকালে কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কোনো প্রকার হয়রানি না করে আমার লাশ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।’
স্ত্রী প্রিয়াংকা ও মেয়ে প্রকৃতির উদ্দেশে
‘আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতি তুমি পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেও। প্রিয়াংকা, আমার অনুপস্থিতি তোমার জীবনে পূরণ হবার নয়। তারপরও কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। তোমার দীপক (চান) ভাইয়ের সঙ্গে থেকো। দীপক তোমাকে আগলে রাখবে।’
বরিশাল প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনের উদ্দেশে
‘বিদায়। তোমার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। আমার মরদেহ হয়রানি ছাড়া পরিবারের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করিও। যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহনন করলাম তাই ময়নাতদন্ত করার প্রয়োজন নাই। পারলে তোমার বৌদি ও প্রকৃতিকে মাঝে মাঝে খোঁজ নিও।’
ছোট ভাই দীপক ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ইতির উদ্দেশে
‘বিদায়। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখিস। তোর উপর অনেক বড় বোঝা চাপিয়ে দিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস। মুক্তিযুদ্ধের ভাতা ও আমার ব্যাংক হিসাবের দেবাশীষের সঙ্গে আলাপ করে পদক্ষেপ নিস। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে তোর কাছে রাখিস।’
সমকালের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে
‘সুমন বিদায়। তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দুঃখিত। একসঙ্গে প্রায় দেড়যুগ কাজ করেছি, কখনো কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। যদি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও।’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে পুলক চ্যাটার্জি নগরীর বরিশাল কলেজ এলাকার নিজ বাসা থেকে বের হন। এরপর থেকে মুঠোফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি তা ধরছিলেন না। স্বামী ফোন না ধরায় চিন্তিত হয়ে তার স্ত্রী নীলোৎপলা মুখার্জি (প্রিয়াংকা) সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুমন চৌধুরীকে বিষয়টি জানান।
সুমন চৌধুরী জানান, ফোন পেয়ে তিনি সন্ধ্যার দিকে সমকাল অফিসে এসে দেখতে পান ভেতরের দরজা আটকানো। পরে দরজার ফাঁক দিয়ে পুলক চ্যাটার্জিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তিনি অন্যান্য সংবাদকর্মী ও পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে মরদেহ উদ্ধার করে।
তিনি আরও জানান, ২০২৩ সালের মে মাসে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর থেকেই পুলক চ্যাটার্জি মানসিকভাবে বেশ বিপর্যস্ত ও হতাশায় ভুগছিলেন। জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী ও সাবেক ব্যুরো প্রধান হওয়ায় শ্রদ্ধা জানিয়ে অফিসে আসার জন্য তাকে একটি অতিরিক্ত চাবি দেওয়া ছিল। শুক্রবার অফিসের পিয়ন ছুটিতে থাকায় ফাঁকা অফিসের সেই চাবি ব্যবহার করেই তিনি ভেতরে ঢোকেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী নীলোৎপলা মুখার্জি ও ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক চ্যাটার্জি জানান, চাকরি হারানোর পর থেকে তিনি হতাশায় ভুগলেও এমন চরম পথ বেছে নেবেন তা তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি।
অপরদিকে খবর পেয়ে রাত ৯টার দিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ ও কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ কমিশনার জানান, ঘটনাস্থল থেকে কয়েক পাতার পাঁচটি সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ এবং আলামত দেখে এটি আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে। সিআইডির একটি দল বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে।
পরবর্তীতে রাত ৯টার দিকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিকের মর্মান্তিক আত্মহননের খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা বরিশাল নগরী। রাত থেকেই স্তব্ধ হয়ে যায় বরিশালের সাংবাদিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন। যে মানুষটি বরিশালের প্রগতিশীল আন্দোলন ও সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আজীবন সামনের সারিতে ছিলেন, তার এভাবে চলে যাওয়াকে মেনে নিতে পারছেন না কেউ।
ঘটনার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র সাংবাদিকদের বঞ্চনা, চাকরিচ্যুতি এবং বকেয়া পাওনা না দেওয়ার নির্মমতার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন সহকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ নাগরিকরা। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই লিখছেন, ‘এটি কেবল আত্মহত্যা নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার।’
এদিকে সমকাল তাদের এক প্রতিবেদনে পুলক চ্যাটার্জির পাওনা টাকার বিষয়ে মানবসম্পদ বিভাগের বক্তব্য উল্লেখ করেছে। সমকালের মানবসম্পদ বিভাগ জানায়, পুলক চ্যাটার্জির পাওনার হিসাব চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সমকালের বিজ্ঞাপন ও আইটি বিভাগের অনাপত্তি নিয়ে তার সঙ্গে লম্বা সময় আলোচনা চলে। গত মাসে দুই বিভাগ অনাপত্তিপত্র হিসাব বিভাগে জমা দেয় এবং তারা হিসাবটি চূড়ান্ত করছিল।
সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুতে সমকাল পরিবার গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।