কবরের আজাব থেকে বাঁচতে সুরা মুলক তেলাওয়াত

মৃত্যুর পর শুরু হয় নতুন জীবনের অধ্যায়। দুনিয়ার জীবন শেষে মানুষ প্রবেশ করে কবরের জীবনে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে শান্তি কিংবা শাস্তি। তাই একজন মুমিনের কাছে কবরের জীবন নিয়ে ভাবা এবং সেটার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কবরের আজাব থেকে মুক্তির জন্য ইসলাম বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ইমান, নেক আমল, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, তওবা ও আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার পাশাপাশি সুরা মুলক তেলাওয়াতের কথাও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কোরআনের ৬৭ নম্বর সুরা এটি। মাত্র ৩০ আয়াতের এই সুরা মানুষের অন্তরে আল্লাহর মহত্ত্ব, তার অসীম ক্ষমতা এবং আখেরাতের জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা মুলকের বিশেষ মর্যাদার কথা জানিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোরআনে ৩০ আয়াতের একটি সুরা রয়েছে, যা একজন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হবে। সেটি হলো ‘তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলক’, অর্থাৎ সুরা মুলক। (জামে তিরমিজি ২৮৯১)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সুরা মুলক পড়বে আল্লাহ তাকে এর মাধ্যমে কবরের আজাব থেকে মুক্ত রাখবেন। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর যুগে এ সুরাকে আমরা ‘মানেআ’ অর্থাৎ কবরের আজাব প্রতিরোধকারী বলতাম। (সুনানে কুবরা নাসায়ি)

হাদিসের অন্যান্য বর্ণনায়ও সুরা মুলককে কবরের আজাব থেকে রক্ষাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণেই মুসলিমদের মধ্যে রাতের বেলায় সুরাটি তেলাওয়াতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

তবে সুরা মুলকের ফজিলত শুধু তেলাওয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রতিটি আয়াত মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসকে নাড়া দেয়। সুরার শুরুতেই ঘোষণা করা হয়েছে, সমস্ত কর্র্তৃত্ব ও রাজত্ব আল্লাহর হাতে। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। এরপর আল্লাহ জানান, তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য। কে আমলে উত্তম, তা যাচাই করাই এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মানুষের সফলতা শুধু বেশি বেশি কাজ করার মধ্যে নয়। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য আমল হতে হবে বিশুদ্ধ ও সুন্দর। নিয়ত হতে হবে খাঁটি। কাজ হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। মানুষের দুনিয়ার জীবন উদ্দেশ্যহীন নয়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি কাজ এবং প্রতিটি সুযোগ এক ধরনের পরীক্ষা।

সুরা মুলক আরও স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের কোনো কাজই আল্লাহর অজানা নয়। মানুষ গোপনে যা করে, প্রকাশ্যে যা বলে এবং অন্তরে যা লুকিয়ে রাখে, সবই তার জানা। মানুষের চোখ হয়তো অন্যের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই আড়াল করা সম্ভব নয়। এই বিশ্বাস একজন মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং নেক কাজের প্রতি উৎসাহিত করে।

কবরের আজাব থেকে মুক্তির আশা করে সুরা মুলক তেলাওয়াত অবশ্যই একটি ফজিলতপূর্ণ আমল। কিন্তু এটিকে এমনভাবে দেখা ঠিক নয় যে, শুধু সুরাটি পড়লেই অন্য সব দায়িত্ব শেষ। একজন মানুষ নিয়মিত সুরা মুলক পড়বেন, অথচ ফরজ ইবাদতে অবহেলা করবেন, মানুষের অধিকার নষ্ট করবেন বা গুনাহ থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করবেন না, ইসলামের শিক্ষা এমন নয়।

কোরআন তেলাওয়াতের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো, এর শিক্ষা জীবনে ধারণ করা। সুরা মুলক আমাদের আল্লাহকে চিনতে শেখায়। তার ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। জীবন ও মৃত্যুর উদ্দেশ্য বুঝতে সাহায্য করে। আখেরাতের জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগায়। এই শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে মানুষের জীবনও বদলে যেতে পারে।

প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে সুরা মুলক তেলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। যারা মুখস্থ জানেন, তারা মুখস্থ পড়তে পারেন। আর যারা জানেন না, তারা দেখে তেলাওয়াত করতে পারেন। একই সঙ্গে সুরাটির অর্থ বোঝার চেষ্টা করা দরকার। কারণ কোরআন শুধু পাঠের জন্য নয়, জীবন পরিচালনার জন্যও নাজিল হয়েছে।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক