মানুষের মর্যাদা রক্ষার তাগিদ

মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কটু কথা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মতো আচরণ মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে। অথচ অনেক সময় রসিকতা, রাগ বা অহংকারের বশে আমরা এমন কথা বলে ফেলি, যা অন্যের আত্মসম্মানকে আহত করে। ইসলাম মানুষের সম্মানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং কাউকে অপমান, অপদস্ত করার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। কারণ মানুষের প্রতি সম্মান ও সদাচরণই পারস্পরিক ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব এবং শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরা যেন অন্য নারীদের ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারিণীদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অন্যের নিন্দা করো না, একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ইমান গ্রহণের পর মন্দ নাম কতই না নিকৃষ্ট! (এসব হতে) যারা তওবা না করে তারাই জালেম।’ (সুরা হুজুরাত ১১) এই আয়াতই প্রমাণ করে, অন্যকে হেয় করা ইসলামে বড় ধরনের অপরাধ এবং এর মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে যে ক্ষত তৈরি হয়, তা সহজে সারতে চায় না।

অপমান ও অপদস্ত করার ক্ষতি বহু দিক থেকেই স্পষ্ট। প্রথমত, এতে ব্যক্তির আত্মসম্মান ভেঙে যায়, সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আত্মসম্মানবোধ হারানো মানুষ সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে না, বরং অনেক সময় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, সমাজে পারস্পরিক শত্রুতা, হিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণতার জন্ম হয়। যার ফলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ভেঙে গিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। তৃতীয়ত, ধারাবাহিক অপমান মানুষকে হতাশা ও আত্মগ্লানিতে ঠেলে দেয়, যা আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পরিণতির কারণ হতে পারে।

অপরকে অপমান-অপদস্ত করার চর্চা কেবল ব্যক্তি ও সমাজে ক্ষতিই ডেকে আনে না, বরং আখেরাতেও এর কঠিন শাস্তি রয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি) অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘একজন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান হারাম।’ (সহিহ মুসলিম) এই হাদিসটির অর্থ হলো কোনো মুসলিমের জন্য আরেকজন মুসলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা, তার সম্পদ লুট করা কিংবা তার সম্মানহানি করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও হারাম। কারও সম্মান ক্ষুন্ন করা যেমন গুনাহ, তেমনি এর জন্য আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে। এমনকি হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন মানুষ নামাজ, রোজা, দান-খয়রাত নিয়ে হাজির হবে, কিন্তু সে যদি কাউকে গালি দিয়ে থাকে, কাউকে অপমান করে থাকে, কারও সম্মান হানি ঘটিয়ে থাকে, তবে তার নেকি কেটে নিয়ে ওই ব্যক্তিকে দেওয়া হবে। যদি তার সৎকর্ম ফুরিয়ে যায়, তবে অপরের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম)

অন্যকে অপমান করার প্রবণতা অনেক সময় ছোট বিষয় থেকে শুরু হয়। যেমন কারও চেহারা নিয়ে ঠাট্টা করা, দারিদ্র্য বা শিক্ষার অভাব নিয়ে কৌতুক করা, কারও ভুল তুলে প্রকাশ্যে তাকে হেয় করা ইত্যাদি। এগুলো অনেকের কাছে সাধারণ রসিকতা মনে হলেও বাস্তবে এগুলো সম্মানহানি এবং ইসলামে গুরুতর অপরাধ। মহানবী (সা.) মুমিনদের সম্পর্কে কটু কথা বলাকে নিষিদ্ধ করেছেন। কারণ এতে সম্পর্ক ও ঐক্য নষ্ট হয়।

সমাজে যখন অপমান-অপদস্ত করার প্রবণতা বেড়ে যায়, তখন মানুষ একে অপরকে অবিশ্বাস করতে শুরু করে। পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে যায়, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের মধ্যে সৌহার্দ্য নষ্ট হয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও বিভাজন তৈরি হয়। একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে হলে প্রতিটি মানুষকে অপরের সম্মান রক্ষা করতে হবে, অপরকে মর্যাদা দিতে হবে। ইসলাম এ জন্য পরস্পরকে সালাম দেওয়ার, ভালোবাসা প্রকাশ করার, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার নির্দেশ দিয়েছে।

এ ধরনের খারাপ অভ্যাস থেকে বিরত থাকার কিছু উপায় রয়েছে। প্রথমত, মানুষকে আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, আমি অন্যকে আঘাত করার মতো কিছু বলছি কিনা, আমি মানুষের মন ভাঙছি কিনা? দ্বিতীয়ত, আমাদের মনে রাখতে হবে, আল্লাহর দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে তাকওয়ার ওপর, ধন-সম্পদ, বংশগৌরব বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর নয়। তৃতীয়ত, কোরআন-সুন্নাহ পাঠ ও আলোচনা মানুষের মনে নম্রতা আনে, অহংকার ও দম্ভ দূর করে। নিয়মিত দোয়া ও আল্লাহর ভয়ে হৃদয় সিক্ত রাখা দরকার।

একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল দেশ গড়ে তুলতে হলে নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেমন অফিসে, বাজারে, রাস্তায় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ যেন কাউকে কটূক্তি না করে, অবজ্ঞা না করে। সবাই যদি অন্যের মর্যাদা রক্ষা করে চলে, তাহলে সমাজে ভালোবাসা, সহযোগিতা ও শান্তির পরিবেশ তৈরি হবে।

অপমান-অপদস্ত করা বন্ধ হলে সামাজিক সম্পর্ক উন্নত হবে। এতে প্রতিবেশী হবে আপনজন, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীরা হবে বন্ধু। রাষ্ট্রে নাগরিকরা হবে একে অপরের শক্তি। ইসলাম এজন্য পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বকে অপরিহার্য ঘোষণা করেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরস্পর সম্পর্ক ছিন্ন করো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে থাকো।’ (সহিহ বুখারি)

লেখক : ইসলামি গবেষক