যশোরের বাজারে সস্তায় ‘বিদেশি’ ইলিশ

দেশি ইলিশের সঙ্গে দেখতে প্রায় একই রকম। আকারেও বড়। অথচ দামে প্রায় অর্ধেক। যশোরের বড় বাজারসহ জেলার বিভিন্ন মাছের বাজারে এমন ইলিশের আধিক্য দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের কাছে এসব মাছ ‘মিয়ানমারের ইলিশ’ নামে পরিচিত। ক্রেতাদের অভিযোগ, দেশি ইলিশ মনে করে এসব মাছ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন তারা। স্বাদ ও গন্ধে দেশি ইলিশের সঙ্গে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও অনেক বিক্রেতা সেগুলো দেশি ইলিশ বলে বিক্রি করছেন। এতে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতাসাধারণ।

বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম বলেন, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে এসেছে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি। আমদানিকৃত এসব ইলিশের মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। মোট ২২ জন আমদানিকারক এই ইলিশ এনেছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিয়ানমারের এসব মাছ ভারত হয়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। তবে একটি সূত্রের দাবি, অনেক ইলিশ অবৈধভাবেও দেশে এসেছে। গত ২২ জুলাই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সাদা মাছের ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা ১২ কার্টন (প্রায় ৩৬০ কেজি) ভারতীয় ইলিশ মাছ জব্দ করে বেনাপোল কাস্টমস।

যশোর বড় বাজারে ইলিশ কিনতে আসা লোন অফিসপাড়ার বাসিন্দা সাজেদুর রহমান বলেন, দেশি ইলিশ মনে করেই তিনি একটি মাছ কিনেছেন। পরে খাওয়ার পর বুঝতে পারেন, মাছটির স্বাদ ও গন্ধ দেশি ইলিশের মতো নয়। তার অভিযোগ, দেখতে প্রায় একই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বিদেশি ও দেশি ইলিশের পার্থক্য বোঝা কঠিন।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১২০০ থেকে ১৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি প্রায় ৩৩০০ থেকে ৩৪০০ টাকায়। আর ১৩০০ থেকে ১৪০০ গ্রাম ওজনের মিয়ানমারের ইলিশের ১৪০০ টাকায় কেজি বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ আকারে বড় হলেও বিদেশি ইলিশের দাম দেশি ইলিশের তুলনায় অনেক কম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতাদের একটি বড় অংশ কম দামের মাছের দিকে ঝুঁকছেন।

বড় বাজারের মাছ ব্যবসায়ী মেসার্স শেখ পিয়ারু ফিসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ পিয়ারু বলেন, এসব মাছ মিয়ানমার থেকে ভারত হয়ে আসছে বলে তিনি জানেন। তার দাবি, বাগআঁচড়ার কুদ্দুস ও বেনাপোলের জাফর নামের দুই ব্যক্তি এসব মাছ আমদানি করছেন। তবে মাছগুলো এলসির মাধ্যমে বৈধভাবে আমদানি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর বড় বাজারের পদ্মা ফিস, গৌরব ফিস, মেসার্স তিতাস ফিস ও মেসার্স জামান ফিসসহ কয়েকটি আড়তে এসব মাছ বিক্রি হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। অন্যদিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি তথ্য বলছে, আগস্ট মাসেই ইলিশ আমদানির পরিমাণ জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেড়েছে। জুলাইয়ে যেখানে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছিল, আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজিতে। এই বিপুল পরিমাণ মাছের একটি অংশ যশোরের বাজারে আসার ফলে দেশি ইলিশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

বড় বাজারের দেশি ইলিশ ব্যবসায়ী সত্যপদ, এরশাদ ও মো. আলমগীরসহ কয়েকজন বলেন, কম দামে বড় আকারের এসব বিদেশি ইলিশ বাজারে আসায় দেশি ইলিশের বিক্রি কমে গেছে। ক্রেতারা দামের পার্থক্যের কারণে বিদেশি মাছ কিনছেন। এতে প্রকৃত দেশি ইলিশ ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিদেশি ইলিশকে দেশি ইলিশের নামে বিক্রি করা হলে একই সঙ্গে দুটি পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতারণার শিকার হচ্ছেন ক্রেতারা এবং বাজার হারাচ্ছেন দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরা।