ব্রিকস সম্মেলন

যৌথ ঘোষণাপত্রে সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্য

ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর সর্বসম্মতিক্রমে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হয়েছে। ঘোষণাপত্রে ‘সব ধরনের যুদ্ধ পদক্ষেপের’ কঠোর সমালোচনা করার পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ (ইউএনএসসি) বিশ্বের বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ‘কাঠামোগত সংস্কারের’ দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি জোটের সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনায় জোর দেওয়া হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত নিরসনে জোটভুক্ত দেশগুলোকে শান্তি প্রতিষ্ঠাতার ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের পক্ষে না। সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমসহ একাধিক নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন।

গতকাল শনিবার সম্মেলনের জোটের এই যৌথ ঘোষণাপত্র উন্মোচন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক জলসীমায় নাবিকদের সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক নৌচলাচল নিরাপদ রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে ঘোষণাপত্রে। ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য দিন দিন নিজস্ব মুদ্রায় পরিচালনা করা উচিত।

সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আজকের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, এই পরিবর্তনশীল বিশ্বকে কোনো সেকেলে প্রতিষ্ঠান দিয়ে চালানো সম্ভব নয়। বিশ্ব প্রতিনিধিত্ব, দায়িত্বশীলতা এবং নীতি-নিয়ম নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখন অপরিহার্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং তা পরিচালনার নীতিমালা তৈরিতে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের সমান অংশীদারত্ব থাকতে হবে।’ ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নে জোর দিয়ে মোদি বলেন, ‘আজ গৃহীত এই নয়াদিল্লি ঘোষণা আমাদের যৌথ সংকল্পের এক স্পষ্ট রূপরেখা। এখন আমাদের মূল দায়িত্ব হলো এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবগুলোকে দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করা।’

এই সম্মেলন উপলক্ষে সাত বছর পর ভারত সফর করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ব্রিকসের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে তিনি বলেন, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই সংকট উত্তরণে চীন অন্যান্য ব্রিকস সদস্য দেশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শান্তির পক্ষে কাজ করতে প্রস্তুত। ব্রিকস জোটকে উন্নয়নশীল বিশ্বের ‘নেতৃস্থানীয় শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে শি জিনপিং বলেন, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আত্মনির্ভরশীলতার বড় মডেল হতে পারে এই জোট। একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলোকে উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি, আগামী বছর চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকস-এর সভাপতিত্ব গ্রহণ করবে এবং পরবর্তী ১৯তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন নিজ দেশে আয়োজন করবে বলে ঘোষণা দেন চীনা প্রেসিডেন্ট।

শনিবার সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেন শি জিনপিং। এ সময় ভারত ও চীন একে অন্যের শক্তি থেকে শিখে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অভিন্ন উন্নয়নে কাজ করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বৈঠকে সীমান্ত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। শি জিনপিং বলেন, গত কয়েক বছরে মোদি ও তার মধ্যে ২১টি বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে দুই নেতা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন, যা ভারত-চীন সম্পর্ককে স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে পরিচালিত করেছে। চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘বিশ্বের দুই বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ও গ্লোবাল সাউথের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ভারত ও চীনের বড় দায়িত্ব রয়েছে। মানবতার ভবিষ্যৎ ও জনগণের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা উচিত দুই দেশের।’

ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান  যুদ্ধ এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতার পটভূমিতে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতে জড়িত সদস্য দেশ ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার বিভেদ ও দূরত্ব কমিয়ে একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছানোই ছিল এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সম্মেলনের আগের দিন গত শুক্রবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন মোদি। সেখানে পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকট নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে সমুদ্রপথে অবাধ জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন মোদি। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল দুই নেতার দ্বিতীয় বৈঠক।

‘ইনক্লুসিভ গ্লোবাল গভর্নেন্স অ্যান্ড স্ট্রেন্থেনিং মাল্টিলাটারালিজম’ শীর্ষক অধিবেশনের মধ্য দিয়ে শনিবার সম্মেলনের শুরু হয়। এরপর নেতারা ভারত মণ্ডপমে ‘ভারত ইনোভেটস’ প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। একটি যৌথ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির দেওয়া রাজকীয় নৈশভোজের মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শেষ হয়।