বিসিএস ১৭তম ব্যাচের পুলিশ ক্যাডারের এক উপমহাপরিদর্শক চাকরি হারান মাস চারেক আগে। অবসরে যাওয়ার আগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করেছেন। সততা ও পেশাদারত্ব নিয়ে পুলিশে তার বেশ সুনাম আছে। কিন্তু আওয়ামী ঘরানার পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে ‘ভালো সম্পর্ক’ থাকায় তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। যদিও অবসরের কথা জানেন না তার সন্তানরা। বিষয়টি গোপন রাখতে তিনি প্রতিদিন আগের মতোই অফিস সময়ে বাসা থেকে বের হয়ে ফেরেন রাতে। তা ছাড়া সংসার চালাতে একটি প্রাইভেট কোম্পনিতে অল্প বেতনের চাকরি নিয়েছেন। প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও মিলছে না সাড়া। তার মতো এভাবে অবসরে যাওয়া অনেকেই পারিবারিক, সামাজিক সংকটে আছেন। এমনকি তারা পরিচয় সংকটেও পড়েছেন।
একইভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকেও ‘রাজনৈতিক তকমা’ লাগিয়ে অবসরের পাঠনো হয়। তারাও মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছেন। অবসরে যাওয়া দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলছি না। আমাদের যে পাওনা, সেটি কেন দেওয়া হচ্ছে না। আবেদন করার পরও যদি কোনো সমস্যা থাকে তাও জানানো হচ্ছে না। চাকরি হারিয়ে খুব কষ্টে আছি। স্ত্রী ছাড়া সন্তানরাও জানেন না এখন তাদের চাকরি নেই। প্রাইভেট কোম্পানিতে কেউ কেউ চাকরি করছেন। পেশাদারত্ব নিয়ে চাকরি করেছেন অনেকে। আওয়ামী লীগ সরকারও বিএনপির রাজনীতি করার দোহাই দিয়ে অনেক ভালো অফিসারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। একই কাজ করেছেন ড. ইউনূস সরকারের পাশাপাশি বর্তমান সরকারও। এসব থেকে বের হয়ে না এলে পেশাদারত্ব নিয়ে কেউ কাজ করবে না পুলিশে।’
হঠাৎ অবসরে দিশাহারা : পুলিশসংশ্লিষ্টরা জানান, চাকরিজীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে পুলিশের পোশাকে। চাকরির নিয়মিত অবসরের আগে হঠাৎ করেই যখন হাতে আসে বাধ্যতামূলক অবসরের প্রজ্ঞাপন, তখন তারা দিশাহারা হয়ে পড়েন। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাদের ভবিষ্যৎ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশে ব্যাপক রদবদলের পাশাপাশি অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। পুলিশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়েই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে রদবদল, বদলি কিংবা অবসর গমনের ঘটনা ঘটেছে। চাকরি হারিয়ে অবসরকালে পাওনা অর্থ সময়মতো না পাওয়া, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিকভাবে পরিচয় সংকট এবং সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে শেষ বয়সে এসে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র বেতনে চাকরি নিতে বাধ্য হচ্ছেন কেউ কেউ।
আবেদনেও মিলছে না সুযোগ-সুবিধা : গত দুই বছরে পুলিশের বিভিন্ন স্তরের ১৩৫ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অবসরে পাঠানো এসব কর্মকর্তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রাপ্য সুবিধা পেতে আবেদনও করেছেন (পিআরএল)। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের কাউকেই প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের প্রশ্ন বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হলে আইন অনুযায়ী যে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার কথা, সেটি পেতে তাদের এতদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে কেন? এ নিয়ে তারা একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের কাছে ধরনা দিয়েও ব্যর্থ হচ্ছেন।
নিয়মানুযায়ী স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যারা অবসরে যান, তারা এক মাস আগেই মন্ত্রণালয়ে পিআরএলের আবেদন করেন। এরপর অবসরে যাওয়ার ১০ দিন আগেই তাদের অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) মঞ্জুর হয়ে যায়। পরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তারা পাওনা পান। আবার যাদের জনস্বার্থে অবসর দেওয়া হয়, তারা চিঠি পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। ১৫ দিনের মধ্যে তাদের পিআরএল মঞ্জুর হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময় ৮৬ ক্যাডার কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র চারজনকে পিআরএল মঞ্জুর করে পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন অতিরিক্ত আইজিপি তৌফিক মাহমুদ, আলিম মাহমুদ, মাসুদুর রহমান ও ডিআইজি মো. রেজাউল হায়দার। বাকিরা কবে পাবেন কেউ বলতে পারছেন না। ২০২৫ সালের শুরুতেই পুলিশের তিন অতিরিক্ত আইজিপিকে ‘জনস্বার্থে’ অবসরে পাঠানো হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল তারা বিধি অনুযায়ী অবসর-পরবর্তী সুবিধা পাবেন। এখন পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে। কাগজ-কলমে অবসর সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলেও বাস্তব চিত্র উল্টো।
সংসার চালাতে হিমশিম : ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর অবসরসংক্রান্ত বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা, হিসাব-নিকাশ, ছাড়পত্র, দেনা-পাওনা সমন্বয় এবং পেনশন-গ্র্যাচুইটির প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে একদিকে চাকরি নেই, অন্যদিকে কাক্সিক্ষত অর্থ না থাকায় তারা পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে সন্তানদের পড়াশোনা, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, পারিবারিক ব্যয় নিয়ে সংকটে পড়েছেন। ফলে অনেক পরিবারকে জীবনযাত্রার মান কমাতে হচ্ছে। কেউ গাড়ি বিক্রি করছেন, কেউ বাড়িভাড়া কমানোর চেষ্টা করছেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারও করছেন বলে জানা গেছে। এমন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কেউ সংসার চালানোর জন্য, কেউবা পরিচয় সংকটের কারণে কম বেতনেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন। আবার অনেকেই চাকরি খুঁজছেন।
বলির পাঁঠা হয়েছেন অনেকে : পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজনরা বরাবরের মতোই ভালো সুবিধা পেয়ে আসছেন। অনেকেই ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগবিরোধী হওয়ার চেষ্টায় আছেন এখনো। এতে কেউ কেউ সফলও হয়েছেন, কেউ কেউ ভালো স্থানে পোস্টিং নিয়ে পুলিশকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা আওয়ামী লীগের ১৬ বছর সুবিধা নিয়েছেন। তারা ওই সময় চাকরিচ্যুত হননি। অথচ এখন তারা বিশাল আওয়ামী লীগবিরোধী হয়ে আছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘চাকরিচ্যুতদের মধ্যে অনেকেই পেশাদারত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। তারা কখনো রাজনৈতিক দলের আদর্শ নিয়ে চাকরি করেননি। কোনো কর্মকর্তার অধীনে থেকে কাজ করায় কেউ কেউ বলির পাঁঠা হয়েছেন। গত সরকারের আমলে তারা ভালো অবস্থানে থাকলেও কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনবিরোধী ছিলেন না। আওয়ামী লীগ সরকারও একই কাজ করেছে, এখন যারা ভালো স্থানে আছেন, তাদের অনেককেই তখন বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডি করে রাখা হয়েছিল। তারা মানবেতর জীবনযাপন করেছিলেন।’
আওয়ামী লীগ সরকারও একই কাজ করেছে : ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত মতাদর্শী আখ্যা দিয়ে অন্তত অর্ধশত কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি অনেককে ওএসডিও করা হয়। দীর্ঘ সময় ওএসডি থাকার কারণে তাদের পদোন্নতি, দায়িত্ব পালনের সুযোগ ও ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বাধ্যতামূলক অবসর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতেই পারে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকার আইন অনুযায়ী এমন সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একজন মানুষের দীর্ঘ কর্মজীবন, তার পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং তার ন্যায্য আর্থিক অধিকারের প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের প্রশাসনিক কাঠামোয় যে পরিবর্তন এসেছে, তার যৌক্তিকতা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক আছে। অন্তর্বর্তীকাল ও বিএনপি সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারও একই কাজ করেছে। ‘রাজনৈতিক তকমা’ লাগিয়ে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
যাদের বিরুদ্ধে বেশি মামলা : পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে। এরপর রয়েছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিসি ইকবাল হোসাইন, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি এসএম মেহেদী হাসান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, সহকারী পুলিশ কমিশনার, একাধিক থানার ওসি, ইন্সপেক্টর, এসআই ও কনস্টেবলদের নামে হয়েছে একাধিক মামলা। ঢাকার মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানায়। তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে আন্দোলন দমাতে যে মাত্রার নির্দেশনা পেয়েছিলেন, তার চেয়ে প্রয়োগ করেছেন বহুগুণ বেশি। তা ছাড়া সাবেক আইজিপি শহীদুল হকের বিরুদ্ধে সাতটি, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।