এডিস মশা ডেকে এনে বংশবিস্তার ঠেকায় ‘ডেন-এক্স-ট্র্যাপ’

দেশে ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরকে ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে মনে করছেন মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন নয়, এডিস মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও নতুন পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটে দেশীয় উদ্ভিদ ব্যবহার করে এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকানোর একটি বিশেষ ফাঁদ তৈরি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। ‘ডেন-এক্স-ট্র্যাপ’ নামের এই ফাঁদে স্ত্রী এডিস মশাকে ডিম পাড়ার উপযোগী পরিবেশে আকৃষ্ট করা হয়। গবেষকদের দাবি, ফাঁদে ডিম পাড়ার পর মশাটি মারা যায় এবং ওই ডিম থেকেও পরবর্তী প্রজন্মের মশার জন্ম রোধ করা সম্ভব।

অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের (আইআরইএস) গবেষক দল প্রায় ৫ বছরের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ফাঁদটি তৈরি করেছে।

কালো-লাল রঙের প্লাস্টিকের নলের মতো দেখতে এই ফাঁদের ভেতরে রাখা হয় ১ লিটার পানি ও দেশীয় দুটি উদ্ভিদ থেকে তৈরি বিশেষ উপাদান। এডিস মশার আচরণ ও ডিম পাড়ার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়েই তৈরি করা হয়েছে এর পরিবেশ।

যেভাবে কাজ করে ডেন-এক্স-ট্র্যাপ : গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ আকর্ষক উপাদানের কারণে স্ত্রী এডিস মশা ফাঁদের দিকে আকৃষ্ট হয়। ভেতরের পানিকে ডিম পাড়ার উপযোগী মনে করে মশাটি সেখানে প্রবেশ করে এবং ডিম পাড়ে। তবে এখানেই শেষ নয়। তার দাবি, বিশেষ উপাদানের প্রভাবে ডিম পাড়ার পর মশাটি মারা যায়। একই সঙ্গে ওই ডিম থেকেও পরবর্তী প্রজন্মের মশা তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

ফাঁদটির উপাদান তৈরির জন্য তিনি ও তার দল প্রায় ২০০টি দেশীয় উদ্ভিদ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। দীর্ঘ গবেষণার পর মশাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করতে সক্ষম দুটি দেশীয় উদ্ভিদ নির্বাচন করা হয়। এসব উদ্ভিদে মশা ধ্বংস করার উপাদানও রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

ফাঁদের কালো ও লাল রঙও গবেষণার ফল। এডিস মশা নির্দিষ্ট কিছু রঙের প্রতি তুলনামূলক বেশি আকৃষ্ট হয়। সেই আচরণকে কাজে লাগিয়ে ফাঁদটির রঙ নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু মশাকে আকৃষ্ট করাই নয়, ভেতরে ঢুকে ডিম পাড়ার উপযোগী পরিবেশও তৈরি করা হয়েছে।

ডেন-এক্স ট্র্যাপের যেসব সুবিধা : অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, ডেন-এক্স ট্র্যাপ নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব। এটি সহজে স্থাপন ও ব্যবহার করা যায় এবং এডিস মশার বিস্তার কার্যকরভাবে রোধ করতে পারে। ফলে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।

ডেন-এক্স ট্র্যাপ তৈরির পেছনে রয়েছে বিদেশি মশার ফাঁদ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা। জাপানে পিএইচডি গবেষণার সময় অধ্যাপক কবিরুল বাশার মশার একটি প্লাস্টিকের ফাঁদ ব্যবহার করেছিলেন। পরে বিদেশ থেকে সেই ফাঁদ দেশে আনতে গিয়ে খরচ ও নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হন তিনি।

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, বিদেশ থেকে একটি ফাঁদ দেশে আনতে ২২ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। সেখান থেকেই কম খরচে দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করে একই ধরনের কার্যকর ফাঁদ তৈরির চিন্তা আসে।

এরপর বিভিন্ন নকশা নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন গবেষকরা। প্রথমে মাটির পাত্র দিয়ে ট্র্যাপ তৈরি করা হয়। পরে বাঁশের তৈরি পাত্র, প্লাস্টিকের বোতলসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। কোন ধরনের ফাঁদ বেশি কার্যকর, তা যাচাই করতে দীর্ঘদিন গবেষণা করা হয়। তবে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় বারবার নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। শেষ পর্যন্ত প্লাস্টিকের পাইপের নকশা ব্যবহার করে তৈরি করা হয় বর্তমান ডেন-এক্স ট্র্যাপ।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কেন এমন ফাঁদের প্রয়োজন : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণত পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনে কীটনাশক ছিটানো, লার্ভার উৎস ধ্বংস এবং বাড়িঘরের আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে এডিস মশা মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে অল্প পরিমাণ স্বচ্ছ পানিতেও ডিম পাড়তে পারে। তাই শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন নয়, মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকরা। তাদের দাবি, ডেন-এক্স ট্র্যাপ এই দুই দিকেই ভূমিকা রাখতে পারে একদিকে স্ত্রী মশাকে আকৃষ্ট করে ফাঁদের ভেতরে নিয়ে আসা, অন্যদিকে ডিম থেকে নতুন প্রজন্মের মশা তৈরি হওয়া বাধাগ্রস্ত করা। গবেষক বলেন, ট্র্যাপটি এডিস মশার বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এটি সহজে স্থাপন ও ব্যবহারযোগ্য হওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং পরিবেশের ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মনে করেন।

কেন নামকরণ করা হলো  ‘ডেন-এক্স ট্র্যাপ’ : ডেন-এক্স ট্র্যাপের নামকরণেও রয়েছে বিশেষ ভাবনা। অধ্যাপক জানান, নামটির ‘ডেন’ অংশটি এসেছে ডেঙ্গু থেকে এবং ‘এক্স’ অর্থ ক্রস বা বন্ধ করে দেওয়া। অর্থাৎ ডেঙ্গুর বিস্তার থামিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য থেকেই এর নাম রাখা হয়েছে ডেন-এক্স ট্র্যাপ।

আইআরইএস নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চলছে মশা নিয়ে গবেষণা : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন বা আইআরইএস মূলত একটি ফিল্ড ল্যাবরেটরি। বিভিন্ন কীটপতঙ্গ নিয়ে গবেষণা করা হলেও এখানে বিশেষভাবে মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ে গবেষণা করা হয়। ২০০৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দ্বীপ আকৃতির জায়গাটি মশাবাহিত রোগ নিয়ে গবেষণার জন্য দেওয়া হয়। এরপর অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষার্থী এখানে নানা বিষয়ে গবেষণা করে আসছেন।

বর্তমানে ল্যাবটিতে বিভিন্ন মশার কলোনিও রয়েছে : কেউ ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা করছেন, কেউ মশার ট্রান্সওভারিয়ান ট্রান্সমিশন নিয়ে কাজ করছেন। এ ছাড়া এডিস মশার প্রজনন, আচরণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও গবেষণা চলছে। অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলো ডেন-এক্স ট্র্যাপ তৈরি করা। তার বিশ্বাস, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এই ট্র্যাপ অত্যন্ত যুগোপযোগী ভূমিকা রাখতে পারে এবং বাংলাদেশের মানুষকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন গবেষক : বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নিয়ে তারা প্রায় দুই মাস আগেই সতর্ক করেছিলেন। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তারা। তিনি বলেন, চলতি মাসে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আগামী মাসেও একই ধরনের পরিস্থিতি থাকতে পারে বলে তার আশঙ্কা।

শুধু দিনে নয়, রাতেও কামড়াতে পারে এডিস : এডিস মশা শুধু দিনে কামড়ায় প্রচলিত এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয় বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে বলে জানান অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, গত ৫ বছর ধরে কোথায়, কখন এবং কোন সময়ে মশা কামড়ায় এসব বিষয় নিয়ে তারা গবেষণা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এডিস মশা দিনে কিংবা রাতে, যেকোনো সময় কামড়াতে পারে।

বাংলাদেশে মূলত ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর বিস্তার শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ডেঙ্গুর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময়। সারা বাংলাদেশই বর্তমানে ডেঙ্গুর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ সময়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কাজ করার নির্দেশ দেওয়াকে স্বাগত জানান তিনি। তার মতে, সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। অন্যথায় দেশ বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।