বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পরও ছাত্রলীগ বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না জাকসু ভিপি জিতুর

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আন্দোলন শুরু হলে ছাত্রলীগ থেকে সরে এসে তিনি আন্দোলনে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন। পরে জাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে ভিপি নির্বাচিত হন। চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। তবে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না।

সম্প্রতি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা, এক ছাত্রলীগ কর্মীকে আটকের পর ছেড়ে দিতে তদবির এবং কথোপকথনে ছাত্রলীগ কর্মীদের প্রতি নিজের প্রভাবের ইঙ্গিত দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় জিতুর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আসাদুল আলম শেখকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল থেকে আটক করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চ্যানেল ১৪-এর প্রতিনিধিও।

এর আগে হল প্রশাসনের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা তাঁর মুঠোফোন পরীক্ষা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সেখানে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীর সঙ্গে তাঁর (আসাদুলের) যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের ভাষ্য, নেত্রকোনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাওন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি এনামুল হক এনাম ওরফে ময়লা এনামসহ একাধিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায় বলে তারা দাবি করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, আসাদুলের মুঠোফোনে জাকসুর ভিপি জিতুর সঙ্গে কথোপকথনের একটি চ্যাটও পাওয়া যায়। জাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে হওয়া ওই কথোপকথনে আসাদুলকে উদ্দেশ করে জিতু লেখেন, ‘আমি ভিপি হওয়া মানে তুই ভিপি, তোরা ভিপি—একটু মাথায় রাখিস। কোনো কারণে হেরে গেলে তোদেরও ঝামেলা হবে পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে।’

পরদিনের আরেকটি কথোপকথনে জিতু আসাদুলকে লেখেন, ‘আসাদ, তুই নির্বাচনটা করলে ঝামেলায় পড়বি। আমাকেই নিয়ে এত কিছু শুরু করছে, তাহলে ভাব তোর কী হবে।’

মুঠোফোনে পাওয়া কথোপকথনে জিতু আসাদুলকে আরও লেখেন, ‘তুই নাকি নির্বাচন করবি? তোদের কোনো কিছু নিয়ে ভাবনা নেই মেবি। সবাই ফাঁদ পেতে রাখছে তোদের জন্য। নিজের ভালো চাইলে এসব কিছু করা যাবে না… আমি তোর মঙ্গলের জন্য বলতেছি নির্বাচন না করতে।’

জবাবে আসাদুল লেখেন, ‘ভাই, আপনার জন্য আমার যা যা করা লাগে করে যাচ্ছি। আপনি ভিপি হবেন ইনশাআল্লাহ ভাই।’

আসাদুলকে আটকের বিষয়ে আশুলিয়া থানার ওসি তারিকুল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি অভিযোগ দায়ের করেছে। সাইবার সুরক্ষা আইনে এটি মামলা হিসেবে থানায় জিডি হয়েছে। উক্ত মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন আছে।

এ ধরনের কথোপকথনে জিতুর সঙ্গে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের যোগাযোগের ইঙ্গিত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও জিতুর সঙ্গে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ ছাড়া আসাদুল আলম জাবি ভিসিকে নিয়ে একটি মিথ্যা সংবাদ প্রচার করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সে সময় ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু, আসাদুল আলমকে নিয়ে ভিসির সঙ্গে মীমাংসা করে দেন।

এর আগে গত ৫ আগস্ট আল-বেরুনী হল থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান আবীরকে আটক করেন একদল শিক্ষার্থী। পরে জাকসুর ভিপি জিতুর তদবিরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর ফেসবুক পোস্টে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার বিষয়টি আবীর স্বীকার করে ক্ষমা চান। পরে জিতু তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলেন এবং মুচলেকা দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা জানান। এ সময় ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় ছাত্রশক্তির জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, ছাত্রলীগ কর্মী আসাদুলের সঙ্গে জিতুর কথোপকথন থেকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে। জাকসু নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের শেল্টার দেওয়ার অভিযোগ জিতুর বিরুদ্ধে উঠেছে দাবি করে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের তৎপরতার বিষয়ে প্রশাসনের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, আটক শিক্ষার্থী আসাদুল আলম শেখের মুঠোফোনে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মী এবং জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে জিতুর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে আসাদুলের বিরুদ্ধেও আইনগত পদক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কোনো তৎপরতা মেনে নেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

জিতুকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি বিষয় তাঁর আবাসিক হলে অবস্থান। ছাত্রত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রায় পাঁচ মাস আল-বেরুনী হলে অবস্থানের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য, বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী ছাত্রত্বের মেয়াদ শেষ হলে আবাসিক হলে থাকার বৈধতা নেই। তবে জিতু দাবি করেন, জাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের স্বার্থে ছাত্রত্ব শেষ হলেও হলে থাকার বিষয়ে প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

এ ছাড়া গত ৫ আগস্ট আল-বেরুনী হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত তিন নেতাকে গালিগালাজ করার অভিযোগও ওঠে জিতুর বিরুদ্ধে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সবশেষে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে জিতুর রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিবর্তন এলেও তাঁর অতীত ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতা এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারি বিএনপিতে যোগদানের অনুষ্ঠানে জিতুর পাশাপাশি জাকসুর হল সংসদের সাতজন ভিপি, তিনজন জিএস ও একজন এজিএসও ছাত্রদলে যোগ দেন। নয়াপল্টনে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দল ও ছাত্রদলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর মুঠোফোনে সারাদিনের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।