রাজবাড়ীতে প্রাণিসম্পদ দপ্তরে তীব্র জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর, ভেটেরিনারি হাসপাতাল, কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরগুলোর প্রায় ৬২ শতাংশ পদই বর্তমানে শূন্য। কাগজে-কলমে যারা কর্মরত আছেন, তাদের অনেকেই আবার দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কিংবা সংযুক্তিতে (ডেপুটেশন) রয়েছেন। এই তীব্র সংকটের কারণে একদিকে গবাদিপশুর চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মরত চিকিৎসক ও কর্মচারীদের ওপর পড়ছে অতিরিক্ত কাজের চাপ। ফলে তাদের প্রতিনিয়ত অমানবিক পরিশ্রম করতে হচ্ছে। জেলা প্রাণিসম্পদ ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জেলা প্রাণিসম্পদ, ভেটেরিনারি হাসপাতাল, জেলা কৃত্রিম প্রজনন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে কর্মকর্তা-কর্মচারীর মোট মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ৯০টি। এর মধ্যে কর্মকর্তা ও চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১৭টি। কর্মচারীর পদ রয়েছে ৭৩টি। মঞ্জুরিকৃত পদের মধ্যে মোট শূন্য পদের সংখ্যা ৫৩টি। এর মধ্যে চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে ৫টি ও কর্মচারীর পদ ৪৮টি। প্রশিক্ষণ ও প্রেষণে রয়েছেন ৩ জন।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে মোট মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ১৩টি। এর মধ্যে কর্মকর্তা ও চিকিৎসকের পদ তিনটি। বাকি ১০টি কর্মচারীর । একজন চিকিৎসক ৬ জন কর্মচারীসহ মোট সাতটি পদই শূন্য রয়েছে। জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে মোট পদ সংখ্যা ৭টি। এর মধ্যে শূন্যপদ রয়েছে তিনটি। দপ্তরটির একমাত্র ভেটেরিনারি সার্জন দীর্ঘদিন যাবৎ মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রেষণে রয়েছেন। তিনজন লোকবল নিয়েই দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
উপজেলা হাসপাতালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থা সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের। দপ্তরটিতে মোট পদ রয়েছে ১১টি। খাতা-কলমে ৫ জন কর্মরত থাকলেও আছেন মূলত ৩ জন। দুজন চুয়াডাঙ্গায় ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে তিন বছরের প্রশিক্ষণে রয়েছেন। হাসপতালটিতে একমাত্র চিকিৎসক ভেটেরিনারি সার্জনের পদটিও শূন্য রয়েছে। এসএএলএস (সম্প্রসারণ) দুজন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ সহকারী, এসএএলও (প্রাণিস্বাস্থ্য) ও অফিস সহায়কের পদসহ মোট আটটি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া পাংশা ও গোয়ালন্দ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে ৭টি করে, বালিয়াকান্দি হাসপাতালে ৪টি ও কালুখালী হাসপাতালে ৪টি পদ শূন্য রয়েছে। এদিকে কাঠামো অনুযায়ী জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে মোট জনবল থাকার কথা ১৭ জন। আছেন মোট দুইজন। বাকি ১৫টি পদ শূন্য রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানায়, জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত গাভীর খামার রয়েছে ৮ হাজার ৯৭৫টি। খামারগুলোতে মোট গরু রয়েছে ৮৭ হাজার ৯০৯টি। মোট মোটাতাজাকরণ খামার রয়েছে ৭ হাজার ১৭৭টি। এসব খামারের মোট গরুর সংখ্যা ৩৩ হাজার ১৮৩টি। মহিষের খামার রয়েছে ৪৫টি। মোট মহিষ রয়েছে ১৬৭টি। ছাগলের খামার রয়েছে ৬ হাজার ৮৬৮টি, ভেড়ার খামার রয়েছে ১৬১টি। এছাড়া লেয়ার, ব্রয়লার, সোনালি মুরগি, কোয়েল পাখি, কবুতর, টার্কি ও হাঁসের খামার রয়েছে ৩ হাজার ৪৬৮টি। সবকিছু মিলিয়ে জেলায় মোট পশুপাখির সংখ্যা রয়েছে ২৯ লাখ ৬ হাজার ৭৭০টি।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা খায়ের উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসা প্রদানসহ মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হয়। ভ্যাকসিনেশন ও খামার পরিদর্শন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দপ্তরের একমাত্র চিকিৎসকের পদটি শূন্য রয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ সহকারী ও এসএএলএস (সম্প্রসারণ) নেই। ১১ জনের কাজ মূলত তিনজনকে করতে হচ্ছে। আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু খামারিদের কাক্সিক্ষত সেবা আমাদের দেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
পাংশা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. শাকিল আহমেদ বলেন, দপ্তরের ১১টি পদের মধ্যে সাতটি পদ শূন্য রয়েছে। এখানে চিকিৎসকের পদ শূন্য নেই। কিন্তু একজন চিকিৎসকের সহযোগী হ্যান্ডও দরকার হয়। লোকবল না থাকাতে মাঠপর্যায়ে খামার পরিদর্শন ও ভ্যাকসিনেশনের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
কালুখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম রতন বলেন, ‘সাধারণত উপজেলাগুলোতে অনুমোদিত পদ রয়েছে ১১টি। কিন্তু কালুখালীতে অনুমোদিত পদই দুটি কম। বর্তমানে আমাদের কাজের যে ধরন তাতে আমাদের সেবাগুলো মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হয়। মাঠ পর্যায়ে যদি প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে কর্মী না থাকে তাহলে আমাদের কাজ করা খুবই চ্যালেঞ্জের হয়ে পড়ে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ^াস দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ মূলত দুধ ডিম ও মাংস উৎপাদন নিয়ে কাজ করে। ডেইরি খামার, পোলট্রি খামার, ডেইরি খাদ্য, পোলট্রি খাদ্য প্রাণিসম্পদ সম্পর্কিত যে সব কাজ রয়েছে প্রাণিসম্পদ দপ্তর সেসব কাজ করে থাকে। এখানে রোগপ্রতিরোধ করতে টিকাদান এবং চিকিৎসা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেমনি নিরাপদ দুধ ডিম উৎপাদন করা একটি চ্যালেঞ্জ। আমাদের জনবলের যে কাঠামো রয়েছে সেগুলোই বেশ আগের কাঠামো অনুযায়ী করা। এই কাঠামো অনুযায়ীই যে জনবল থাকা দরকার সেখানেই বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। টিকা প্রদান করতে, প্রজনন করতে যে পরিমাণ মাঠকর্মী প্রয়োজন হয়। আমাদের সেগুলো নেই। জেলার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ জনবলের পদ শূন্য রয়েছে। জনবলের এত বড় ঞাটতি নিয়ে মানুষের কাক্সিক্ষত সেবা প্রদান করা সম্ভব হয় না। জনবলের সংকটের বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এটি আমাদের হাতে নেই।