২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক কোনো গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, অতীতে এ ধরনের মামলার বাদী সাধারণত পুলিশ হতো। তবে গত দুই বছরে পুলিশ বাদী হয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো নতুন মামলা করেছে—এমন কোনো নজির বা প্রমাণ নেই।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সাতক্ষীরায় আইনশৃঙ্খলা, মাদক ও দুর্নীতি তদারকি সংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় অপরাধী যে দলের বা পরিচয়েরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। পাশাপাশি মাদক, অস্ত্র ও সোনা চোরাকারবার পুরোপুরি বন্ধ করতে প্রশাসনিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানান।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের দ্বিমত বা শর্ত নেই। নির্ধারিত জুলাই সনদ অনুযায়ী দেশের সার্বিক সংস্কার ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এর আগে তিনি সাতক্ষীরার বিচারকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। বিচার বিভাগকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে শূন্য পদে দ্রুত বিচারক নিয়োগ এবং দীর্ঘদিনের মামলার জট কমানোর বিষয়ে তিনি আশ্বস্ত করেন। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কায়সার আজিজের সভাপতিত্বে উক্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়কে দেশের অন্যতম ‘প্রশ্নবোধক ডিপার্টমেন্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আইনমন্ত্রী। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় সাবরেজিস্ট্রারদের পদায়ন ও বদলিকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে ঢাকা শহরে প্রথমবারের মতো লটারি প্রথা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, লটারি পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে পোস্টিংয়ে স্বচ্ছতা আনা হবে এবং এরপরেও যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতবিনিময় সভায় বিচারব্যবস্থা সংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিচার বিভাগ মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ও সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের মতো কিছু বিচারক সরাসরি অর্থনৈতিক দুর্নীতিতে না জড়ালেও তাঁরা ‘বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি’ করেছেন। তাদের এই ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং নির্বাচনব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তা মেরামতে একটু সময় লাগবে এবং দেশবাসীর কাছে এ জন্য ধৈর্য, আস্থা ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করে সরকার।
সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও সুশাসন নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। অতীতের চরম নির্যাতনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী প্রতিশোধের পথে না হাঁটার ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমান সরকারের নীতিও কোনোভাবেই প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়া।
বাক্স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যম প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, সরকার সব নাগরিকের মতপ্রকাশ, কথা বলা ও বিবেকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। একই সঙ্গে হলুদ সাংবাদিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তি চরিত্র হননের অপপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণের জোরালো দাবি বিভিন্ন মহল থেকে উঠছে। সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ সংশোধনের উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমান আইনটিকে যথেষ্ট মনে না করায় তা সংশোধনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি মানুষের মৌলিক বাক্স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকায় প্রধানমন্ত্রী তা আরও গভীর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি সাব-কমিটিতে পাঠান। বর্তমানে সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর জনপরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদকদের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। সাংবাদিকদের সুনির্দিষ্ট কোনো মতামত বা পরামর্শ থাকলে সংশ্লিষ্ট কমিটিতে তা উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় পরামর্শগুলো সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
এ ছাড়া দেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকার এসব অপরাধ কঠোর হাতে দমন করার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে যেমন জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, ঠিক একইভাবে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধেও প্রশাসনের নজরদারি ও কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে।