সমাজে দয়া ও ক্ষমার শিক্ষা

অট্টালিকার উচ্চতা, প্রযুক্তির উৎকর্ষ কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দিয়ে সমাজের সভ্যতা পরিমাপ করা যায় না। মানুষ মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, সেটার মাঝেও সমাজের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে। একজন দুর্বল মানুষকে দেখে আমরা থামি কিনা, শিশুর কান্নায় আমাদের হৃদয় নরম হয় কিনা, অধীনস্থের ভুল ক্ষমা করতে পারি কিনা, ভিন্নমতের মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারি কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তরেই রয়েছে আমাদের মানবিকতার স্তর।

আজকের পৃথিবীতে মানুষের জ্ঞান বেড়েছে, সুযোগ বেড়েছে, যোগাযোগ বেড়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মানুষের হৃদয় যেন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি শব্দ দিয়ে আমরা একজন মানুষকে অপমান করতে দ্বিধা করি না, রাস্তায় অসহায় কাউকে পাশ কাটিয়ে চলে যাই, নিজের স্বার্থে অন্যের অধিকারকে তুচ্ছ করি। পরিবারে সন্তানের প্রতি ভালোবাসার চেয়ে কখনো কখনো প্রত্যাশার চাপ বেশি হয়ে ওঠে। কর্মক্ষেত্রে অধীনস্থের মানবিক সীমাবদ্ধতার চেয়ে তার ভুলটাই বড় হয়ে দেখা দেয়। এমন সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আমাদের সামনে যে শিক্ষাটি সবচেয়ে গভীরভাবে তুলে ধরে, তা হলো মারহামাত। মারহামাত হলো সবার সঙ্গে রহমতপূর্ণ ও দয়ার আচরণ করা।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া ১০৭)

তার নবুয়ত কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতি, ভূখণ্ড কিংবা সময়ের জন্য ছিল না। তার চরিত্র, শিক্ষা ও জীবনাচরণ সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমতের বার্তা বহন করে। এই রহমত কেবল আবেগের বিষয় ছিল না, বরং তার প্রতিটি আচরণে সেটার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ দয়ালুদের উপর দয়া ও অনুগ্রহ করেন, যারা জমিনে বসবাসকারীদের প্রতি দয়া করেন। দয়া রাহমান (আল্লাহ) হতে উদগত। যে লোক দয়ার সম্পর্ক বজায় রাখে মহান আল্লাহও তার সঙ্গে নিজ সম্পর্ক বজায় রাখেন। যে লোক দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে, মহান আল্লাহও তার সঙ্গে দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করেন। (তিরমিজি ১৯২৪)

এখানে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। আমরা প্রায়ই মহান আল্লাহর রহমত প্রত্যাশা করি, কিন্তু নিজের আচরণে সেই রহমতের কতটুকু প্রতিফলন ঘটাই, সে প্রশ্নটি করি না। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন, আল্লাহর রহমত লাভের সঙ্গে মানুষের প্রতি আমাদের রহমতেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তিনি তাদের চুম্বন করতেন, কোলে নিতেন, তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন। এক ব্যক্তি যখন বললেন, তার দশটি সন্তান, কিন্তু তিনি কাউকেই চুম্বন করেননি, তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না।’ (সহিহ মুসলিম)

শিশুর প্রতি এই মমতা আমাদের জন্য নিছক পারিবারিক আদর্শ নয়, এটি একটি সমাজদর্শনও। যে সমাজ তার শিশুদের শুধু পরীক্ষার ফল, ভবিষ্যৎ পেশা কিংবা পরিবারের সম্মানের বাহক হিসেবে দেখে, কিন্তু তাদের অনুভূতি, ভয়, স্বপ্ন ও মানসিক নিরাপত্তার কথা ভাবে না, সে সমাজ কীভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মানবিকতার শিক্ষা প্রত্যাশা করবে?

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দয়া অবশ্য শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি প্রাণিকুলের প্রতিও দয়া প্রদর্শন করতেন। কেউ কোনো প্রাণীকে কষ্ট দিলে বা অন্যায়ভাবে কোনো প্রাণীর অধিকার হরণ করলে তিনি তা করতে নিষেধ করতেন। শুধু তাই নয়, তিনি অকারণে গাছের পাতা ছিঁড়তেও নিষেধ করেছেন। কেননা গাছেরও প্রাণ আছে।

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দয়ার আরেকটি বিস্ময়কর দিক ছিল ক্ষমা। তায়েফের মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, উপহাস করেছে, পাথর মেরে রক্তাক্ত করেছে। কিন্তু প্রতিশোধের সুযোগ থাকলেও তিনি তাদের ধ্বংস কামনা করেননি। বরং আশা করেছিলেন, তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ আসবে, যারা মহান আল্লাহর ইবাদত করবে। মক্কা বিজয়ের দিনও বহু পুরনো শত্রুর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে সাধারণ ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তার এই আচরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমা দুর্বলতার নাম নয়। বরং অনেক সময় ক্ষমাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোমলতার গুরুত্ব স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছিলেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান ১৫৯)

একবার ভাবা দরকার, আমাদের পরিবার, বন্ধুত্ব, সংগঠন, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক সম্পর্ক থেকে মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে কিনা। আমরা কি সত্যের কথা বলছি, আর বলার ভঙ্গিতে এমন কঠোরতা রাখছি যে মানুষ সত্যটিকেই প্রত্যাখ্যান করছে? আমরা কি সংশোধন করতে গিয়ে মানুষকে অপমান করছি? আমরা কি মতের বিরোধিতাকে ব্যক্তির প্রতি ঘৃণায় পরিণত করছি?

মারহামাত (দয়া) মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং অন্যায়কারীর প্রতিও মানবিক থাকা। এ দুটো একসঙ্গে সম্ভব। প্রকৃত মারহামাত মানুষকে এমনভাবে সংশোধন করতে শেখায়, যাতে সংশোধনের মধ্যেও তার মর্যাদা অক্ষুণœ থাকে। আজ আমরা অন্যের ভুল খুব সহজে দেখতে পাই, কিন্তু তার পরিস্থিতি বুঝতে চাই না। কারও ব্যর্থতা দেখে হাসি, কারও দারিদ্র্যকে অবহেলা করি, কারও দুর্বলতাকে উপহাস করি, কারও অতীতের ভুল দিয়ে তার বর্তমানকে বিচার করি। অথচ হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না। (সহিহ বুখারি)

মহান আল্লাহর রহমত লাভের জন্য শুধু নিজের ইবাদতের হিসাব করলেই হয় না, আমাদের আচরণের হিসাবও করতে হয়। আমার কারণে কতজন মানুষ নিরাপদ বোধ করে? আমার কথায় কতজনের হৃদয় ভেঙে যায়? আমি ক্ষমতাবান হলে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করি? আমার অধীনে কেউ কাজ করলে তাকে মানুষ হিসেবে দেখি, নাকি কেবল কাজ সম্পন্ন করার একটি উপায় হিসেবে দেখি? আমার সঙ্গে মতের অমিল হলে আমি তাকে শত্রু ভাবি কিনা, এসবও তো ইমানি চরিত্রের প্রশ্ন।

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ কোমল, তিনি কোমলতাকে ভালোবাসেন এবং কোমলতার মাধ্যমে এমন কিছু দান করেন, যা কঠোরতার মাধ্যমে দান করেন না।’ (সহিহ মুসলিম)

আমাদের সমাজে আজ হয়তো নতুন আইন দরকার, নতুন প্রতিষ্ঠান দরকার, নতুন নীতি দরকার। কিন্তু তার পাশাপাশি দরকার এমন হৃদয়, যে হৃদয় অন্যের কষ্ট অনুভব করবে, ক্ষমা করতে শিখবে, দুর্বলকে আশ্রয় দেবে, শিশুর কান্নায় থামবে, প্রাণীর প্রতিও নিষ্ঠুর হবে না এবং ক্ষমতা হাতে পেয়েও কোমল থাকবে।

কারণ একটি ভারনসাম্যপূর্ণ সমাজ কেবল আইন দিয়ে তৈরি হয় না, তৈরি হয় দয়ালু মানুষ দিয়ে। আর সেই মানুষ তৈরির সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ আমাদের সামনে রেখে গেছেন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাই নিজের হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবা দরকার, আমার মধ্যে কি তার সেই রহমতের সামান্যতম ছায়াও আছে? যদি থাকে, তবে তা আরও বিস্তৃত করা দরকার।

আসুন, আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করি। তাহলে আমাদের ব্যক্তি জীবন থকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন কল্যাণময় হবে। এতে দুনিয়ার জীবন সুখে সমৃদ্ধ হবে এবং পরকালে থাকবে মহাসফলতা। মহান আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষার্থী, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়