ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, সিঁড়িতে হুড়োহুড়িতে আহত অনেকে

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে হঠাৎ দেখা দেয় ধোঁয়া। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। আগুনের খবর পেয়ে রোগী ও স্বজনেরা ছোটাছুটি শুরু করেন। গুরুতর অসুস্থ রোগীদেরও অনেকে বিছানা ছেড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। এ সময় হুড়োহুড়িতে সিঁড়িতে আহত হন অনেকে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর না পাওয়া গেলেও এ ঘটনায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা ও লিফট ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনার পর বিভিন্ন ওয়ার্ডের রোগী ও স্বজনদের অনেকে হাসপাতাল চত্বরে নেমে আসেন। সেখানে গুরুতর অসুস্থ রোগীদেরও স্বজনদের সহায়তায় বাইরে বসে থাকতে দেখা যায়। কারও হাতে, কারও মাথায় ছিল ব্যান্ডেজ। আতঙ্কে অনেকে কাঁদছিলেন। হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয় উৎকণ্ঠার পরিবেশ।

হাতে ও মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতাল চত্বরে বসেছিলেন হারেস মিয়া। তিনি বলেন, হঠাৎ চোখের সামনে প্রচণ্ড ধোঁয়া দেখতে পান। ধীরে ধীরে ধোঁয়া বাড়তে থাকলে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে চিৎকার শুরু হয়। পরে সবাই দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। এতে অনেকে আহত হন।

আরেক রোগী মারিয়া খাতুন বলেন, এটি স্বনামধন্য হাসপাতাল। অথচ মাঝেমধ্যেই এখানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। রোগীরা সুস্থ হওয়ার জন্য হাসপাতালে আসেন। সেখানে এসে যদি নিজেদের অনিরাপদ মনে হয়, তাহলে এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিতে হবে।

নগরীর সচেতন নাগরিকদের মতে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জেলার অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে হাসপাতালের একটি অংশে আগুন লাগার ঘটনা শুধু একটি কক্ষের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, মুহূর্তেই তা শত শত রোগী ও স্বজনের নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

তাঁদের মতে, এবার বড় ধরনের হতাহত না হলেও সিঁড়ি দিয়ে রোগী ও স্বজনদের হুড়োহুড়ি করে নামার দৃশ্য ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, প্রথম দিকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, নতুন ভবনের অষ্টম তলার লিফট কন্ট্রোল রুম থেকেই আগুনের সূত্রপাত।

ময়মনসিংহ সদর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার জুলহাজ উদ্দিন বলেন, প্রথমে শিশু ওয়ার্ডে আগুন লাগার কথা জানা গেলেও পরে দেখা যায়, নতুন ভবনের অষ্টম তলার লিফট কন্ট্রোল রুমে আগুন লেগেছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, আগুনের খবর পেয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফায়ার স্টেশন ও সদর ফায়ার স্টেশন থেকে মোট ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। তবে আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে চারটি ইউনিট কাজ করে।

তিনি বলেন, সন্ধ্যা ৬টার দিকে লিফট কন্ট্রোল রুমে আগুনের সূত্রপাত হয়। কক্ষটি অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে প্রচণ্ড ধোঁয়া বের হতে থাকে। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। তাঁরা হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে থাকেন। তবে ফায়ার সার্ভিসের কাছে এখন পর্যন্ত কেউ হতাহত হওয়ার তথ্য নেই। আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের রোগীদের নিজ নিজ শয্যায় ফিরে যেতে বলা হয়। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম বলেন, রোগীরা ধীরে ধীরে শয্যায় ফিরে যাচ্ছেন। তবে আগুনের ঘটনায় তাঁরা প্রচণ্ড ভয় পেয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

ঘটনার পর হাসপাতাল পরিদর্শন করেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান। তিনি হাসপাতালের লিফট ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, হাসপাতালে লিফট প্রায়ই অচল থাকে। এতে রোগীদের ভোগান্তি হয়। লিফট মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা কাজটি যথাযথভাবে করছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

প্রশাসক রুকুনোজ্জামান বলেন, এর আগেও এই হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এবারও আগুন লাগল। কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি থাকলে তদন্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।