অপার সম্ভাবনার বাঁশ শিল্প

আদিকাল থেকেই মানুষ বাঁশ ব্যবহার করে আসছে। সভ্যতার অগ্রসরতার সঙ্গে শিল্পবিপ্লবের ফলে দৈনন্দিন জীবনে এবং সভ্যতা নির্মাণে এর ব্যবহার কমে এলেও নিঃশেষ হয়নি কখনোই। বরং বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বাঁশ ও বাঁশজাত দ্রব্য। এর জন্য প্রয়োজন শিল্পোদ্যোগ ও সচেতনতা বৃদ্ধি। এ লক্ষ্যে প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব বাঁশ দিবস। বাঁশ ও বাঁশজাত শিল্পের উপযোগিতা ও সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছেন সাইফুদ্দিন সাইফ

‘বাঁশ’ বাংলাদেশে এই শব্দটাই বেশ সংবেদনশীল এবং নেতিবাচক উপমায় ব্যবহার হয়। তবে জনপ্রিয় চাইনিজ প্রবাদ ‘Like Bamboo, the higher you grow, the lower you bow থেকে আমরা বলতে পারি, বাঁশ আমাদের বিনয় শেখায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাঁশের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম।

বাঁশ আমাদের চির পরিচিত বনজ সম্পদ। এটি ‘পোয়াসি’ ((Poaceae) গোত্রভুক্ত এক ধরনের বৃক্ষসদৃশ ঘাস। এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, যা দীর্ঘাকৃতির, বিস্তৃত এবং বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী, এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রতি বছর নতুন কান্ড (culm) বা বাঁশ গজাতে সক্ষম। পরিবেশবান্ধব এবং প্রচুর পরিমাণে বায়োমাস (biomass) উৎপাদনের পাশাপাশি মাটির গুণগতমান ও ভূমিক্ষয় রোধ করে। দৈনন্দিন জীবনে এটি কাঠের সহজ বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শিল্পকাজে, ব্যবহারিক জীবনে, খাদ্যদ্রব্য ও ভেষজ উপাদান হিসেবে বাঁশের চাহিদা সারা বিশ্বে ক্রমাগত বাড়ছে। পৃথিবীব্যাপী বাঁশের চাষাবাদ যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রতিনিয়ত বাঁশ নিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ উন্নতমানের দৃষ্টিনন্দন শিল্পসামগ্রী তৈরি হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে বাড়ছে বাঁশজাত পণ্যের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও। বর্তমান বিশ্বে বাঁশের বাজার প্রায় শত বিলিয়ন ডলারের, যেটা অদূর ভবিষ্যতে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

বাঁশের ব্যবহার

বাঁশ ও বাঁশজাত দ্রব্যের ব্যবহার ব্যাপক। বাঁশ বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ৮০টি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। যুগ যুগ ধরে বাঁশের ব্যবহার হয়ে আসছে। এর ক্ষেত্র আস্ত বাঁশের বৃহৎ নির্মাণ কাজ থেকে শুরু করে চেরাইকৃত বাঁশের অতি সূক্ষ্ম কারুশিল্প তথা হস্তশিল্প পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশে^র যেসব দেশে ও যেসব অঞ্চলে বাঁশ জন্মে ও জন্মানো হয় সেসব দেশে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাঁশের ব্যবহার রয়েছে। নবজাতকের নাড়ি কাঁটা থেকে কবর পর্যন্ত বাঁশের ব্যবহার রয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়াতে অনেকেই প্লাস্টিকসহ কৃত্রিম জিনিস বর্জন করছেন। প্রাকৃতিক বনজ সম্পদ ব্যবহার করে নিত্যপ্রয়োজন মেটানোর তাগিদে প্রতিদিন নিত্যনতুন অভিনব ক্ষুদ্র শিল্প দ্রব্য উদ্ভাবিত হচ্ছে। উন্নত বিশে^ প্রাকৃতিক বনজ সম্পদ থেকে হস্তশিল্পের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত দ্রব্যের দারুণ চাহিদা রয়েছে। গার্মেন্টস শিল্পের মতো এ শিল্পের বিশ্ববাজারে প্রবেশের শুভ দ্বারটি আমাদের জন্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। এ ধরনের শিল্পে সামান্য পরিমাণ বাঁশ ব্যবহার করেই অনেক অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। এ শিল্পের প্রধান বিনিয়োগ শুধু দক্ষ বয়ন কারিগরদের পারিশ্রমিক। সে বিবেচনায় আমাদের উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্য যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক হবে।

স্থাপত্য নির্মাণে

বাংলাদেশে বছরে শুকনো বাঁশের চাহিদা অন্তত ১০-১৫ লাখ টন।  ২০১৭ সালের পর থেকে কক্সবাজারের শরণার্থী বসতিগুলোতে নির্মাণ ও মেরামতের জন্য প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি বাঁশের খুঁটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাঁশের নানাবিধ ব্যবহারের মধ্যে নির্মাণকাজে সবচেয়ে বেশি বাঁশের প্রয়োজন। চাহিদা থাকায় পাহাড়ি অঞ্চল ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় বাঁশের বাণিজ্যিক আবাদ হচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রামে উন্নত বাড়িঘর নির্মাণে বাঁশ বেশ টেকসই উপাদান। বিশেষ করে কাঁচা বাড়ির ভিত দেয়াল ও ছাদ তৈরিতে বাঁশের পাটাতন ও ফ্রেম ব্যবহার হয়। বাঁশের পাতায় ঘরের ছাউনি হয়। আবার পাহাড়ি এলাকায় বাঁশ দিয়েই তোলা হয় মাচার ঘর। গ্রামের লোকজন ছোট খাল পার হতে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ দিয়ে সেতু বানিয়ে থাকেন। কারণ অল্প টাকায় এর চাইতে মজবুত ও টেকসই সেতু গড়া সম্ভব না। এ ছাড়া বেড়া তুলতে বা বন্যার সময় আশ্রয়ের জন্য মজবুত মাচা তুলতেও বাঁশ লাগে।

বাঁশের মধ্যে সেলুলোজের পরিমাণ ৭৪% যেখানে সাধারণ কাঠে থাকে ৪০-৪৪ শতাংশ। এ জন্য বাঁশে দ্রুত ঘুণ ধরে। তবে বাঁশকে যদি প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তবে ৫০ বছর বা ততোধিক সময় বাঁশকে নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়।

বাঁশ ও ইস্পাত দিয়ে ‘ক্ষুদি বাড়ি’ তৈরি করে স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার-২০২৫ অর্জন করেছেন। আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার ২০২৫-এর ঘোষণায় বলা হয়েছে, বিচারকম-লী ক্ষুদি বাড়ি প্রকল্পের গভীর পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনায় নিয়েছেন। একই সঙ্গে বাঁশকে বৈশি^ক অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারার একটি উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তারা।

প্রকৃতি-পরিবেশ ও প্রাণ রক্ষায়

প্রকৃতি-পরিবেশ ও প্রাণ রক্ষায় বিশেষ করে, দুর্যোগ মোকাবিলা, পাহাড়ধস, ভূমি ক্ষয়, নদীভাঙন রোধসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাঁশের ভূমিকা বলে শেষ করা যাবে না। বাঁশ অন্যান্য গাছগাছালির চেয়ে  ২০-৩৫% বেশি অক্সিজেন উৎপাদন করে আর বেশি মাত্রায় কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে। ফলে বাতাস বিশুদ্ধ থাকে। বলা হয়, বাঁশঝাড় আশপাশের তাপমাত্রাকে ৫ থেকে ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত ঠা-া রাখতে সক্ষম। ফলে এটা অনেকটা প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশনার হিসেবে কাজ করে।

মাটি রক্ষা

বাঁশ গাছের শেকড় ছড়ানো থাকায় এটি মাটি ভাঙন রোধ করে, মাটির ঢালকে মজবুত করে, ফলে পাহাড়ধস ঠেকানো যায়, ভারী ধাতু শোষণ করে মাটির ক্ষয় রোধ করে, বিভিন্ন বন্যপ্রাণী আশ্রয় নিতে পারে। এক কথায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ঠেকাতে বাঁশের গুরুত্ব রয়েছে। বাঁশ এমনকি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে টেনে তোলে।

দুর্যোগ থেকে রক্ষা

ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকেও বসত-ঘরকে রক্ষা করে বাঁশ। এ কারণে গ্রামে বসতবাড়ির পাশে বাঁশঝাড় দেখা যায়।

জাপানে প্রচুর বাঁশের ঘর দেখা যায়। কারণ এসব ঘর ভূমিকম্প সহনীয়। ভূমিকম্পের সময় বাঁশঝাড়ে আশ্রয় নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।

বাঁশ কোড়ল ও বাঁশ পাতার চা

খাদ্য হিসেবেও বাঁশ ব্যবহৃত হচ্ছে। পুষ্টি উপাদান ও মুখরোচক স্বাদের জন্য পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাছে খাবার বাঁশ কোড়ল নামে পরিচিত। এর তৈরি স্যুপ, সালাদ, তরকারি বেশ জনপ্রিয়। সাধারণত বাঁশের অঙ্কুরোদগম হওয়ার পর চার থেকে ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত যে কচি বাঁশ হয় সেটাই রান্না করে খাওয়া যায়।

বাঁশের পাতার নির্যাস থেকে এক প্রকার পানীয় তৈরি করা হয়, যেটা ‘ব্যাম্বো লিফ টি’ নামে পরিচিত। বাঁশ পাতার চা হলো ক্যাফেইন-মুক্ত একটি ভেষজ পানীয়, যা প্রাকৃতিক সিলিকা, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খনিজ উপাদানে ভরপুর। এগুলো চুল, ত্বক, নখ ও হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে। বাঁশপাতা হলো জৈবিকভাবে শোষণযোগ্য সিলিকার অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক উৎস। সিলিকা কোলাজেন উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে, যা ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে, ভঙ্গুর নখকে মজবুত করতে এবং চুল ভাঙা কমাতে সাহায্য করে। এতে থাকা উচ্চ মাত্রার সিলিকা ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, যা হাড়ের শক্তি বজায় রাখে এবং বয়সজনিত হাড়ের ক্ষয় রোধ করতে সহায়তা করে। পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, সেদ্ধ করা বাঁশ পাতায় ফাইবার, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, পটাসিয়াম, ভিটামিন ই, আয়রন পাওয়া যায়, যা শরীরকে চাঙ্গা রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফাইবার থাকায় এটি কোষ্ঠকাঠিন্যে উপশম দেয় এবং হজমশক্তি বাড়ায়।

নিত্য ব্যবহার্য পণ্য ও হস্তশিল্প

প্রাচীনকাল থেকেই বাঁশের চেরাইকৃত পাতলা খ-াংশ বয়নের মাধ্যমে চাটাই ও দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ব্যবহার্য দ্রব্য এবং চেরাইকৃত সরু শলাকা লতা ও আঁশের গ্রন্থনে নানা ধরনের মাছ ধরার ফাঁদ তৈরি হয়ে আসছে। অধুনা দেশে বিদেশে এ হস্ত ও কুটির শিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। ফলে বাঁশ থেকে স্বাস্থ্যকর ল্যামিনেটেড বাঁশের মেঝে ও দেয়াল কভার, মাদুর, কুশন, সিট কভার, এমনকি পাদুকা পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। আসবাবপত্র, বাদ্যযন্ত্র, রান্নাঘরের বিভিন্ন সরঞ্জাম যেমন কুলো, ডালা, ঝুড়ি, চাঁটাই, প্লেট, বাটি, চামচ, স্ট্র সে সঙ্গে কৃষি সরঞ্জাম, তোরণ, প্যান্ডেল তৈরি, ল্যাম্প, জামাকাপড়ের হ্যাঙ্গার, ল্যাপটপের কেসিং, ইত্যাদি নানা ধরণের পণ্য বানাতে বাঁশ দরকার হয়। বাঁশের তৈরি হস্তশিল্প পরিবেশবান্ধব, যা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এগুলো সাধারণত দামে সস্তা হয় আবার রপ্তানি করে আয়ের সুযোগও থাকে।

জ্বালানি, বস্ত্র ও কাগজ শিল্পে ব্যবহার

সুতা ও কাগজ তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার অনেক আগে থেকে হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বাঁশের তন্তু দিয়ে টুপি, স্কার্ফ, গ্লাভস, মোজা ও প্যান্ট তৈরি হচ্ছে। সে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাগজ, টয়লেট পেপার তৈরিতেও ব্যবহার হচ্ছে বাঁশ। সভ্যতার ক্রমোন্নয়নে বাঁশ থেকে পার্টিকেল বোর্ড, প্লাই বা ফ্লেকবোর্ড, বাঁশ থেকে ঢেউটিন ও প্যানেল পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি ও কাঠ কয়লায় বাঁশের ব্যবহার ব্যাপক।

ওষুধ ও প্রসাধনী

বাঁশের মধ্যে অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ থাকায় এটি এখন শ্যাম্পু, ক্রিমসহ নানা ধরনের প্রসাধনীসহ পোকামাকড় প্রতিরোধকের মতো পণ্য তৈরিতেও ব্যবহার হচ্ছে।

লেখক : কিউরেটর, কোয়ান্টাম ব্যাম্বোরিয়ান