এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের শুরুটা হলো দুঃস্বপ্নের মতো। গতকাল সোমবার শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে পিটার বাটলারের দল। এই হার শুধু এবারের আসরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরাজয় নয়, নারী ফুটবলে দেশের ইতিহাসেও সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হার। এর আগে ২০১৩ সালে থাইল্যান্ডের কাছে ৯-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ।
জাপানের ওসাকার নাগাই স্টেডিয়ামে এফ- গ্রুপের ম্যাচে শুরু থেকেই বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে এশিয়ান গেমসে তিনবারের সোনাজয়ী উত্তর কোরিয়া। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই জন রয়োং জংয়ের গোলে এগিয়ে যায় তারা। পাঁচ মিনিট পর একই ফরোয়ার্ড ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। এরপর একের পর এক আক্রমণে বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে উত্তর কোরিয়া। প্রতিপক্ষের বক্সের আশপাশে যাওয়ার সুযোগই খুব কম পেয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার আক্রমণ সামলাতে গিয়ে বারবার ভুল করেছে বাংলাদেশের রক্ষণ। প্রথমার্ধেই আরও পাঁচবার বাংলাদেশের জালে বল পাঠায় উত্তর কোরিয়া। ফলে বিরতির আগেই সাত গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ এবং ম্যাচের ফল কার্যত নির্ধারিত হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধেও উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের ধার কমেনি। ৫১ মিনিটে রাই সং ও ৬০ মিনিটে জং জুম গোল করেন। ৮৫ মিনিটে কুম জংয়ের গোলে ব্যবধান আরও বাড়ে। শেষ দিকে বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি কয়েকটি ভালো সেভ করে দলকে আরও বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। হান জিন হংয়ের একটি শটও পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে প্রতিহত করেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত হান জিন হংয়ের কোনাকুনি শট আর ঠেকাতে পারেননি। তাতেই বাংলাদেশের জালে দশমবারের মতো বল জড়ায় উত্তর কোরিয়া।
ম্যাচের আগের দিন বাটলার জানিয়েছিলেন, ফলাফলের চেয়ে তরুণ ফুটবলারদের সুযোগ দেওয়াকে গুরুত্ব দিতে চান তিনি। সেই পরিকল্পনায় একাদশে জায়গা পান মোমিতা খাতুন, অর্পিতা বিশ্বাস ও সুরভী আফরিনের মতো তরুণরা। অন্যদিকে ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, শিউলি আজিম ও শামসুন্নাহারের মতো অভিজ্ঞরা শুরু থেকে মাঠে ছিলেন না। পরে ঋতুপর্ণা ও মনিকা মাঠে নামলেও তখন ম্যাচ অনেকটাই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এত বড় ব্যবধানে হারের পর স্বাভাবিকভাবেই বাটলারের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছর নারী এশিয়ান কাপেও উত্তর কোরিয়ার কাছে ৫-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। কয়েক মাসের ব্যবধানে একই প্রতিপক্ষের কাছে এবার দ্বিগুণ ব্যবধানে হারতে হলো ঋতুপর্ণাদের।
ম্যাচ শেষে দায় নিজের কাঁধে নেওয়ার কথা বলেন বাটলার। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অজুহাত দিচ্ছি না। কারণ আজকের এই ফলাফলের পুরো দায় আমি নিচ্ছি, কারণ তারা আমারই খেলোয়াড়।’ তবে এরপরই দলের মাঠের বাইরের কিছু সমস্যা নিয়ে কথা বলেন ইংলিশ কোচ। বাটলারের দাবি, দলে অভিজ্ঞ ও তরুণ, দুটি আলাদা গ্রুপ রয়েছে। পাশাপাশি মাঠের বাইরের কিছু বিষয় তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কোচ বলেন, ‘আমাদের এখানে দুটি ভিন্ন গ্রুপ রয়েছে, একটি বয়স্ক বা অভিজ্ঞদের গ্রুপ, অন্যটি তরুণদের গ্রুপ। আর মাঠের বাইরের বিষয়গুলো নিয়ে কিছু সমস্যা রয়েছে, যা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই।’
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল তাকে যথেষ্ট সমর্থন করেছেন বলেও জানান বাটলার। তবে অন্য কিছু মানুষের কর্মকান্ড নিয়ে তার আপত্তি রয়েছে। গভীর রাতে খেলোয়াড়দের ফোন করা কিংবা কনফারেন্স কলে যুক্ত করার মতো বিষয় দল গঠনের জন্য সহায়ক নয় বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পরও বাফুফের পক্ষ থেকে কোনো ম্যাচ রিপোর্ট দেওয়া হয়নি। ম্যাচের প্রথমার্ধে সাত গোল এবং শেষ পর্যন্ত ১০-০ ব্যবধানের পরাজয় নিয়েও তাৎক্ষণিক কোনো আপডেট দেওয়া হয়নি। এমনকি ম্যাচের কোনো ছবিও সরবরাহ করা হয়নি। দেশের বাইরে জাতীয় দল খেললে সাংবাদিকদের তথ্যের অন্যতম উৎস বাফুফের মিডিয়া টিম। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে তথ্য ও ছবি সরবরাহে এমন নীরবতা নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন দক্ষিণ কোরিয়া ও মিয়ানমারের বিপক্ষে দুটি ম্যাচ। ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামবে দল, এরপর ২১ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের মুখোমুখি হবে। গ্রুপের সেরা দুই দল সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবে। তিন গ্রুপের সেরা তৃতীয় হওয়া আরও দুটি দলও শেষ আটে যাওয়ার সুযোগ পাবে। উত্তর কোরিয়ার কাছে বড় ধাক্কার পর এখন দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দেওয়াই বাটলার ও তার শিষ্যদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।