ডিভাইডারই যেন ‘মৃত্যুফাঁদ’

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমাতে রাস্তার মধ্যে ডিভাইডার নির্মাণ করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। তবে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত এই ডিভাইডারগুলোই এখন স্থানীয় ও দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য একেকটি ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। মহাসড়কের ধামরাই অংশে নির্মিত এই ডিভাইডারগুলোতে রাতের বেলা নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, নেই কোনো দৃশ্যমান সতর্কতামূলক চিহ্ন বা রিফ্লেক্টর। ফলে রাতের অন্ধকারে দ্রুতগতির যানবাহনের চালকরা দূর থেকে ডিভাইডার দেখতে না পেয়ে প্রায়ই এর ওপর গাড়ি তুলে দিচ্ছেন। এতে প্রতিনিয়ত ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, ঝরছে তাজা প্রাণ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার সূতিপাড়া, জয়পুরা ও কছমছ এলাকার ডিভাইডারগুলো দিনের আলোয় স্পষ্ট থাকলেও রাতে সড়কটি ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকায় সেগুলো একপ্রকার অদৃশ্য হয়ে যায়। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল চালকরা চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ ডিভাইডারের মুখোমুখি হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। এতে যানবাহন উল্টে গিয়ে প্রতিনিয়ত হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনায় অনেকেই যেমন অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন, তেমনই পঙ্গুত্ব বরণ করে চিরদিনের জন্য অনেকের হারিয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ও ধামরাই ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধামরাই অংশে ২৫ কিলোমিটারে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত ডিভাইডারগুলো আধুনিকায়নের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীসহ  হাজারো পথচারী। সাম্প্রতিক সময়েও এর প্রমাণ মিলেছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে জয়পুরা এলাকায় মালবাহী ট্রাক উল্টে যায়। বেশ কিছুদিন আগে পোশাক শ্রমিক নাহিদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এখানে।

চালকদের অভিযোগ, রাতে আলো না থাকায় সড়কের ডিভাইডারগুলো দূর থেকে দেখা যায় না। ফলে অপরিচিত চালকরা হঠাৎ ডিভাইডারের সামনে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন নিয়ে আসার সময় ঝুঁকি আরও বাড়ে। চালকদের দাবি, দ্রুত ডিভাইডারগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না করলে প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। স্নোটেক্স পোশাক কারখানার শ্রমিক রফিকুল বলেন, ‘আমার সহকর্মী নাহিদ মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় এখানে ট্রাকের ধাক্কায় মারা যায়, আমরা আর কাউকে হারাতে চাই না। ডিভাইডারগুলো তুলে দেওয়া হোক, না হলে দ্রুত আধুনিকায়ন করা হোক।’

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ধামরাই শাখার সভাপতি এম. নাহিদ মিয়া বলেন, মহাসড়কের অন্তত তিনটি ডিভাইডারকে ঝুঁকিপূর্ণ ‘রোড ক্রসিং স্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করে সড়ক ও জনপথ মানিকগঞ্জ বিভাগের কাছে এগুলো তুলতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন রাতে ডিভাইডারগুলো দৃশ্যমান করতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, রিফ্লেক্টর ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, রাতে ডিভাইডারগুলো চালকদের কাছে স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। ফলে দুর্ঘটনায় চালক ও যাত্রীরা আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। এসব অপরিকল্পিত ডিভাইডার দ্রুত আধুনিকায়ন ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা জরুরি।

ধামরাই ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো. আল আমিন বলেন, যেকোনো দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস দ্রুত উদ্ধারকাজে সাড়া দেয়। সড়কে প্রায়ই ডিভাইডারে দুর্ঘটনার কবলে পড়া গাড়িসহ যাত্রী উদ্ধার করতে হচ্ছে। রাতে অন্ধকারে ধামরাই অংশের ডিভাইডারগুলো দেখা না যাওয়ায় যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়ছে। সামনে শীতে ঘন কুয়াশায় ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই ডিভাইডারে দৃশ্যমান এলইডি লাইট বা প্রতিফলক স্টিকার লাগানো হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব, এতে হতাহতের ঘটনা কম ঘটতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নয়ারহাট উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নূরে আলম সিদ্দিক বলেন, সড়কের মাঝের ডিভাইডারগুলো অনেক আগেই নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে আলোকস্বল্পতা থাকলে বিভাগীয় প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কম খরচে সোলার লাইট স্থাপনের সুযোগ থাকলে সেটিও করা হবে। পাশাপাশি রাতে দূর থেকে দৃশ্যমান হয় এবং গাড়ির চালকদের সতর্ক করেÑ এমন প্রতিফলকও (রিফ্লেক্টর) স্থাপনের ব্যবস্থা করা হবে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য নির্মিত ডিভাইডারগুলোতেই যদি দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আর কত প্রাণহানির অপেক্ষা করতে হবে?