শিক্ষক সংকটের অজুহাত, অফিস সহকারী নেন ১৩ ক্লাস

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন একজন অফিস সহকারী। শুধু দু-একটি ক্লাস নয়, ২০২৬ সালের ক্লাস রুটিনে তার নামে রয়েছে সপ্তাহে ১৩টি ক্লাস। অফিসের চেয়ার ছেড়ে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পড়াচ্ছেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক গোপাল চন্দ্র রায়।

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে রুটিনের সঙ্গে বাস্তবেরও মিল পাওয়া গেছে। এদিন দশম শ্রেণির কক্ষে শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিচ্ছিলেন অফিস সহকারী গোপাল চন্দ্র রায়। অথচ বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ মোট ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের ক্লাস রুটিনে প্রধান শিক্ষকসহ ১৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। রুটিনে থাকা অতিরিক্ত দুজনের একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক গোপাল চন্দ্র রায়। রুটিন অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক সপ্তাহে ছয়টি এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক আটটি ক্লাস নেন। 

সহকারী শিক্ষকেরা সপ্তাহে ১২ থেকে ১৫টি করে ক্লাস নেন। এর মধ্যে অফিস সহকারী গোপাল চন্দ্র রায়ের নামে দেওয়া হয়েছে ১৩টি ক্লাস।

রুটিনে দেখা যায়, প্রতি সপ্তাহের রবিবার থেকে মঙ্গলবার পঞ্চম পিরিয়ডে ষষ্ঠ শ্রেণির ধর্ম এবং ষষ্ঠ পিরিয়ডে দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের ক্লাস রয়েছে গোপাল চন্দ্র রায়ের। বুধবার ও বৃহস্পতিবার ষষ্ঠ পিরিয়ডে নবম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং সপ্তম পিরিয়ডে দশম শ্রেণির ধর্ম বিষয়ের ক্লাসও দেওয়া হয়েছে তাকে।

রবিবার দুপুরে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল আলম অনুপস্থিত। সহকারী প্রধান শিক্ষক অশোক কুমার রায় দশম শ্রেণির মানবিক বিভাগের সাধারণ বিজ্ঞান ক্লাস নিচ্ছেন। তিনজন সহকারী শিক্ষককে শিক্ষক মিলনায়তনে বসে থাকতে দেখা যায়। অন্য শিক্ষকরা বিভিন্ন শ্রেণিতে ক্লাস নিচ্ছিলেন।

এ সময় অফিস সহকারী গোপাল চন্দ্র রায় কোথায় আছেন জানতে চাইলে আরিফুল নামে এক অফিস সহায়ক জানান, তিনি দশম শ্রেণিতে ক্লাস নিচ্ছেন। পরে দশম শ্রেণির কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, অফিস সহকারী গোপাল চন্দ্র রায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছেন। তখন শ্রেণিকক্ষে চারজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল।

অফিস সহকারী হয়ে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গোপাল চন্দ্র রায় বলেন, ২০২০ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই শিক্ষক সংকটের কারণে তিনি ক্লাস নিয়ে আসছেন। তিনি মূলত ষষ্ঠ ও দশম শ্রেণিতে ধর্ম এবং নবম ও দশম শ্রেণিতে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের ক্লাস নেন।

বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষক থাকার পরও কেন ক্লাস নিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বছরের শুরু থেকেই ক্লাস নিচ্ছি। হেড স্যার রুটিনে ক্লাস দিয়েছেন, তাই আমি ক্লাস নিচ্ছি।’

অফিস সহকারীকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে অফিস সহকারীকে দিয়ে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। হিন্দুধর্মের শিক্ষক মনোরঞ্জন রায় দুই-তিন মাস আগে অবসরে গেছেন। তার পরিবর্তে অফিস সহকারী ক্লাস নিচ্ছেন।

বিদ্যালয়ে বর্তমানে তিনজন হিন্দুধর্মের শিক্ষক রয়েছেন, তাদের দিয়ে ক্লাস নেওয়া সম্ভব কি না এবং অফিস সহকারীকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিধান বা পরিপত্র রয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘অফিস সহকারীকে দিয়ে ক্লাস নিতে কোনো পরিপত্র লাগে না। আর বাকিরা অন্য ক্লাস নেয়।’

অভিযোগের বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খায়রুল আনাম মো. আফতাবুর রহমান হেলালীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইন্দ্রজিত সাহা বলেন, ‘অফিস সহকারীকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে আমরা তদন্ত করব। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সোহেল সুলতান জুলকার নাইন কবীর বলেন, ‘এ বিষয়ে ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হবে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।’