চিত্রকলা

ইয়ায়োই কুসামা : অনন্তের জাল, আরোগ্যের ক্যানভাস

টোকিওর একটি হাসপাতালে ১৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ৯৭ বছর বয়সে মারা গেছেন ইয়ায়োই কুসামা। খবরটি প্রকাশ পেয়েছে ১৩ দিন পর, ২৭ আগস্ট, তার নিজের ওয়েবসাইটের এক সংক্ষিপ্ত ঘোষণায়। মৃত্যুর কারণ একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়া, শেষকৃত্য পরিবারের মধ্যেই হয়ে গেছে, জনসাধারণের স্মরণসভা হবে পরে; যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তুলি হাতছাড়া করেননি, এইটুকু ছাড়া মৃত্যু ঘোষণায় আর প্রায় কিছু ছিল না। যে শিল্পী নিজের জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি প্রকাশ্যে এনেছেন, সাক্ষাৎকারে, আত্মজীবনীতে, উপন্যাসে, কবিতায়, তার মৃত্যুটুকু থেকে গেল প্রায় নীরব।

২.
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। কুসামার শিল্পকে অসুস্থতার উপসর্গ হিসেবে পড়া সহজ, নিশিমারু ১৯৫২ সালেই যেভাবে পড়েছিলেন, কিন্তু তা আসলে ভুল। কুসামা নিজে অসুস্থতা গোপন করেননি, বরং বলেছেন তার শিল্প তার জীবনের, বিশেষ করে তার রোগেরই প্রকাশ। কিন্তু রোগ কাউকে শিল্পী বানায় না। যা তাকে শিল্পী বানিয়েছিল তা হলো ওই দৃষ্টিভ্রমকে একটি সুসংগত ভাষায় অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত এবং সাত দশক ধরে সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকা। হাসপাতালের ঘর সেই অটলতার শর্ত ছিল, উৎস নয়।

সেই পদ্ধতির উপাদান দুটো এবং দুটোই এসেছে মাৎসুমোতোর বাড়ি থেকে। কুসামার জন্ম ১৯২৯ সালে, বীজ ও চারাগাছের ব্যবসা করা এক ধনী, রক্ষণশীল পরিবারে। বাইরে থেকে পরিবারটি প্রতিষ্ঠিত, ভেতরে বিষাক্ত। বিয়ের শর্ত হিসেবে তার বাবাকে স্ত্রীর পরিবারের পদবি গ্রহণ করতে হয়েছিল, কারণ তিনি বিয়ে করেছিলেন নিজের চেয়ে অনেক সচ্ছল একটা পরিবারে। এই ব্যবস্থা কুসামার বাবাকে সংসারে ক্রমাগত ছোট করে রাখত আর তিনি সময় কাটাতেন বাড়ির বাইরে, অন্য নারীদের সঙ্গে। ক্ষোভ আর অপমান নিয়ে কুসামার মা রাগ ঝাড়তেন সবচেয়ে ছোট মেয়েটির ওপর, শারীরিকভাবে এবং কথায়। সবচেয়ে ক্ষতিকর কাজটি ছিল অন্য। মা ছোট কুসামাকে পাঠাতেন বাবার পিছু নিতে, কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে থাকছেন, দেখে এসে জানাতে। শিশু বয়সে বারবার প্রাপ্তবয়স্কদের যৌনতার সাক্ষী হওয়া তার ভেতরে যৌনতা ও পুরুষশরীর নিয়ে একটা স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করে দিয়েছিল। পরে তিনি সরাসরি বলেছেন, যৌনতা তিনি অপছন্দ করেন। এটা প্রথম উপাদান।

দ্বিতীয় উপাদান দৃষ্টিভ্রম, যা শুরু হয় ১০ বছর বয়সে। খাবার টেবিলের ঢাকনায় লাল ফুলের নকশা থেকে চোখ তুললে দেখতে পেতেন ছাদ, জানালা, থাম, নিজের শরীর, সবকিছু সেই একই ফুলে ঢেকে গেছে। ঘরের দেয়াল ঢেকে যেত বিন্দুতে, চারপাশ মিলিয়ে যেত অন্তহীন এক জালের ভেতর, এবং সেই জালে তার নিজের অস্তিত্বও মুছে যেতে থাকত। এই সবকিছুকে বশে আনার একটাই উপায় তিনি পেয়েছিলেন, যা দেখছেন তা কাগজে এঁকে ফেলা। এখানে লক্ষ করার মতো বিষয়টা হলো, ছবি আঁকা তার কাছে প্রথম থেকেই দৃশ্যকে নিজের হাতে নিয়ে আসার কৌশল। যে জাল তাকে গ্রাস করতে আসে, সেই জাল যদি তিনি নিজে বোনেন, তাহলে তিনি জালের ভেতরে নন, জাল তার হাতে থাকে। পরবর্তী সাত দশকের প্রতিটা সিরিজ এই একটা সমীকরণের রূপান্তর।

এখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ তিনি নিজে তৈরি করেছিলেন, একটি চিঠি লিখে। মাৎসুমোতোর এক পুরনো বইয়ের দোকানে মার্কিন চিত্রশিল্পী জর্জিয়া ওকিফের ছবি দেখে ১৯৫৫ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি সরাসরি চিঠি পাঠান নিউ মেক্সিকোয়, সঙ্গে নিজের আঁকা দুটো জলরঙ। ওকিফ তখন মার্কিন আধুনিক চিত্রকলার প্রতিষ্ঠিত নাম, কুসামা ২৬ বছরের অজ্ঞাত এক জাপানি তরুণী। ২০ দিনের মধ্যে উত্তর এলো। ওকিফ লিখলেন, এ দেশে শিল্পী হিসেবে টিকে থাকা ভীষণ কঠিন, তবু যদি সত্যিই আসতে চাও, নিউ ইয়র্কেই এসো আর যাকে যাকে পারো নিজের কাজ দেখাও, সেই সঙ্গে জলরঙ দুটো বিক্রির জন্য ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে চাইলেন। নিরুৎসাহের ভেতর থেকে আসা এই একটা চিঠিই কুসামাকে সাহস দিয়েছিল। ১৯৫৭ সালের শেষ দিকে জাপান ছাড়ার আগে তিনি নিজের কয়েকশ ছবি নষ্ট করে ফেলেন, যাতে পেছনে ফেরার জন্য কিছু না থাকে! সিয়াটল হয়ে ১৯৫৮ সালে তিনি পৌঁছান নিউ ইয়র্কে।
১৯৫৯ সালের অক্টোবরে ব্রাটা গ্যালারিতে ‘ইনফিনিটি নেটস’-এর প্রথম প্রদর্শনী
নিউ ইয়র্কে গিয়ে তিনি শুরু করেন তার প্রথম বড় সিরিজ, ‘ইনফিনিটি নেটস’। বিশাল ক্যানভাস, কোথাও দৈর্ঘ্যে ১০ মিটার, সাদার ওপর সাদা রঙে অজস্র ক্ষুদ্র লুপ, প্রান্ত থেকে প্রান্ত পর্যন্ত একই গতিতে পুনরাবৃত্ত। কোনো কেন্দ্র নেই, বিষয় নেই, শুরু বা শেষ নেই। ১৯৫৯ সালের অক্টোবরে ব্রাটা গ্যালারিতে এই কাজের প্রথম প্রদর্শনী সাড়া ফেলে দেয়। তরুণ সমালোচক ও শিল্পী ডোনাল্ড জাড প্রশংসা করে লেখেন এবং ২০০ ডলারে একটা ছবি কেনেন, চার কিস্তিতে। ফ্রাঙ্ক স্টেলাও একটা ছবি কেনেন। পরের বছর জার্মানির লেভারকুজেনে মনোক্রোম চিত্রকলার একটা প্রদর্শনীতে জার্মান শিল্পী গুন্টার ইউকারের সঙ্গে কুসামা একটা ছবি বদলাবদলি করেন। ১৯৫৯ সালের সেই ছবিটা ২০২২ সালে ফিলিপসের নিলামে বিক্রি হয় ১ কোটি ৫ লাখ ডলারে, এটা তার নিলামের রেকর্ড। ১৯৬০ সালে যে কাজের বিনিময়মূল্য ছিল আরেকটা কাজ, ৬২ বছরে তার দাম কোথায় গেছে, এই একটা সংখ্যাই কুসামার পুনর্মূল্যায়নের পুরো ইতিহাস ধরে রাখে।

৩.
ষাটের দশকের শুরুতে কুসামা হাতে তুলে নেন সুচ আর কাপড়। কয়েক বছর ধরে তিনি সেলাই করে বানান হাজার হাজার নরম, শিশ্নাকৃতির নল, তারপর সেগুলো দিয়ে ঢেকে ফেলেন চেয়ার, সোফা, ইস্ত্রির বোর্ড, রান্নাঘরের বাসনপত্র, নৌকা, মই, জুতা। এই সিরিজের নাম ‘অ্যাকিউমুলেশন’। উদ্দেশ্য তিনি নিজেই বলেছেন, যৌনতার প্রতি নিজের ঘৃণা সারানোর জন্য তিনি শিশ্ন বানাতে শুরু করেছিলেন, ভয়কে জয় করার এটাই ছিল উপায়। শৈশবে যে জিনিস তাকে আতঙ্কিত করেছিল, সেটিকেই হাজারবার বানিয়ে, বিন্দু দিয়ে ঢেকে, প্রায় হাস্যকর করে তুলে তিনি নিরস্ত্র করছিলেন। প্রথম উপাদানটা, যৌনতার আতঙ্ক, এখানে দ্বিতীয় উপাদানের পদ্ধতিতে, পুনরাবৃত্তিতে, সামলানো হচ্ছে।
‘অ্যাকিউমুলেশন’ সিরিজ, ১৯৬২
ঢেকে যাওয়া জিনিসগুলোর বেশিরভাগই সংসারের এবং এটা কাকতালীয় নয়। মা যে ঘরকে তার নিয়তি ঠিক করে রেখেছিলেন, ধনী ঘরের গৃহিণীর ঘর, সেই ঘরের আসবাবই তিনি ঢেকে দিচ্ছিলেন এমন এক আকৃতিতে, যা তাকে ছোটবেলা থেকে ভয় দেখিয়ে এসেছে। তার কাজ শেষ হওয়ার পর ওই সোফায় আর বসা যায় না, ওই বোর্ডে আর কাপড় ইস্ত্রি করা যায় না। বিয়ে আর সংসার নিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত তিনি কোথাও ঘোষণা করেননি, একটা অকেজো সোফাতেই সেটা বলা হয়ে গিয়েছিল।

৪.
কুসামাকে রাজনৈতিক শিল্পী বলা হয় কেন, তার উত্তর কেবল ছবিতে নেই, আছে ষাটের দশকের নিউ ইয়র্কে তার কাজের ধরনে এবং সেই ধরনের মূল কথা, আত্মরক্ষার যে ভাষা তিনি শৈশবে বানিয়েছিলেন, সেটিকে হুবহু রাজনৈতিক দাবিতে বদলে ফেলা।

শুরু ১৯৬৬ সালের ভেনিস বিয়েনালেতে। আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ তার ছিল না। লুচো ফোন্তানার কাছ থেকে ধার করা ৬০০ ডলারে তিনি বানান ১৫০০ প্লাস্টিকের আয়না-বল, ছড়িয়ে দেন ইতালীয় প্যাভিলিয়নের বাইরের লনে, নাম দেন ‘নার্সিসাস গার্ডেন’। সোনালি কিমোনো পরে সেই বলের মধ্যে থেকে তিনি নিজেই বিক্রি করতে শুরু করেন, প্রতিটি বল ১২০০ লিরা, তখনকার হিসাবে দুই ডলার, পাশে সাইনবোর্ড, ‘তোমার নার্সিসিজম বিক্রির জন্য’। বল হাতে নিয়ে দর্শক দেখত নিজের মুখ, উত্তল আয়নায় ছোট আর বিকৃত।
‘তোমার নার্সিসিজম বিক্রির জন্য’, ১৯৬৬
বিয়েনালে কর্তৃপক্ষ এসে বিক্রি বন্ধ করে দেয়, বলেছিল, ‘শিল্পকর্ম এভাবে বিক্রি করা হটডগ বা আইসক্রিম বিক্রির মতো, বিয়েনালের মর্যাদার সঙ্গে যায় না’। কুসামা ঠিক এটিই দেখাতে চেয়েছিলেন, শিল্পের এই মর্যাদা আসলে কতটা বাজারনির্ভর আর সেই বাজারে একজন এশীয় নারী শিল্পীর অবস্থান ঠিক কোথায়! ‘ইনস্টিটিউশনাল ক্রিটিক’ শব্দবন্ধটি শিল্পতত্ত্বে চালু হওয়ার বছর দশেক আগের ঘটনা এটি। বলগুলো লনে রয়ে যায়, বিক্রেতাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

৫.
জাপান তাকে যেভাবে ফিরিয়ে নেয়, সেটি নিউ ইয়র্কের চেয়ে ভালো ছিল না। শিল্পসমালোচক ইয়োশিয়াকি তোনো তার অবস্থানটি এক বাক্যে ধরেছিলেন, ‘তিনি জাপানি, তিনি নারী, তিনি শিল্পী এবং তিনি অ্যাভাঁ-গার্দ। এর চেয়ে খারাপ শর্ত আর হয় না।’ জাপানের শিল্পজগৎ তাকে দেখল নিউ ইয়র্কে নগ্ন কেলেঙ্কারি করে ফেরা এক নারী হিসেবে। মা তাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন মাত্র একবার। ভর্তির বছর নিয়ে সূত্রে ফারাক আছে, কুসামা নিজে বলেছেন ১৯৭৫, বেশিরভাগ জীবনী বলে ১৯৭৭, তবে দুই তারিখেই মূল কথাটি এক, একজন মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তিনি নিজেই গিয়েছিলেন। ২০০২ সালের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, প্রতিদিন তিনি যন্ত্রণা, উদ্বেগ আর ভয়ের সঙ্গে লড়েন আর অসুখ থেকে মুক্তির একটিই পদ্ধতি তিনি পেয়েছেন, শিল্প নির্মাণ করা।
ইয়ায়োই কুসামার কয়েকটি বই
সত্তরের শেষ ও আশির দশকের বড় অংশে তিনি ছবির চেয়ে বেশি লিখেছেন। হাসপাতালে বসে লিখেছেন বারোটি উপন্যাস, তার মধ্যে ১৯৭৮ সালের ‘ম্যানহাটান সুইসাইড অ্যাডিক্ট’ এবং সেই সঙ্গে কবিতা আর গানের সুর। একই আচ্ছন্নতা ফিরে ফিরে এসেছে অন্য ভাষায়। নিজের কাজকে তিনি বলতেন ‘আর্ট মেডিসিন’। এই শব্দবন্ধটি প্রথম ভাগের পর্যবেক্ষণটিকে আরেকভাবে বলে, ওষুধ রোগ থেকে আসে না, রোগের বিরুদ্ধে বানানো হয়।

৬.
স্বীকৃতি ফিরে আসতে সময় লেগেছে এবং ফিরে এসেছে কুসামার নিজের কাজের বদলে ইতিহাস লেখার শর্ত বদলানোর কারণে। ১৯৮৯ সালে নিউ ইয়র্কের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল কনটেম্পোরারি আর্টসে কিউরেটর আলেকজান্দ্রা মানরোর সাজানো রেট্রোস্পেকটিভ আবার আলো ফেলে তার ষাটের দশকের কাজে। আশির দশকের শেষে মার্কিন শিল্প-ইতিহাস নিজের ষাটের দশককে নতুন করে পড়ছিল, নারী ও অ-শ্বেতাঙ্গ শিল্পীদের খুঁজে বের করছিল আর কুসামা সেই পুনর্পাঠের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়ান, কারণ তার ক্ষেত্রে তারিখগুলো এত স্পষ্ট। ১৯৯৩ সালে ৪৫তম ভেনিস বিয়েনালেতে তিনি ফেরেন জাপানের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হয়ে, জাপান প্যাভিলিয়নের ইতিহাসে প্রথমবার পুরো প্যাভিলিয়ন একজনমাত্র শিল্পীকে দেওয়া হয় এবং সেই শিল্পী একজন নারী। যে প্রতিষ্ঠান ২৭ বছর আগে তাকে লন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, সেখানে তিনি স্থাপন করেন ‘মিরর রুম (পামকিন)’, আয়নায় ঘেরা একটি ঘর ভর্তি হলুদ কুমড়া, তার ওপর কালো বিন্দু।
‘মিরর রুম (পামকিন)’, ১৯৯৩
কুমড়া তার শৈশবেরই ফসল, দাদার সঙ্গে বীজ ক্ষেতে গিয়ে তিনি প্রথম দেখেছিলেন মানুষের মাথার সমান একটি অদ্ভুত আকারের ফল এবং কুমড়া নিয়ে তার নিজের ব্যাখ্যা তার পুরো পদ্ধতির ব্যাখ্যা, আকৃতির মৌলিক পুনরাবৃত্তিটা তার পছন্দ, বাকি সব কাজের মতোই, শুধু এটি একই সঙ্গে হাস্যকর। জাপানে সেই বছর থেকে শুরু হয় যাকে বলা হয় ‘কুসামা বুম’।

৭.
এই বিন্দুতে এসে একবিংশ শতাব্দীর কুসামা-উন্মাদনা বোঝা যায় এবং বোঝা যায় কেন এটি কুসামার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয়, তার পদ্ধতির যৌক্তিক পরিণতি। ২০১৭ সালে ওয়াশিংটনের হার্শহর্ন জাদুঘরে ‘ইনফিনিটি মিররস’ প্রদর্শনীর সময় জাদুঘরের সদস্য সংখ্যা বাড়ে ৬ হাজার ৫০০ শতাংশের বেশি আর প্রতিটি আয়নাঘরে দর্শকের সময় বেঁধে দিতে হয় ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডে। ২০২৪-২৫ সালে মেলবোর্নের ন্যাশনাল গ্যালারি অব ভিক্টোরিয়ায় ৫ লাখ ৭০ হাজার দর্শক, ২০২৬ সালে কোলনের মিউজিয়াম লুডভিগে ৪ লাখ ৮০ হাজার, দুই জাদুঘরেরই ইতিহাসে রেকর্ড। তার ছবির ডিলার ডেভিড জোয়ার্নার তাকে বলতেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত জীবিত শিল্পী, এবং বাজারের হিসাবে কথাটি মিথ্যা ছিল না। যে শিল্পীকে ষাটের দশকে সমালোচকরা বলতেন অতিরিক্ত আত্মপ্রচারকারী, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তার সেই একই স্বভাব হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় পুঁজি।

৮.
তার মৃত্যুর সময় ইউরোপে চলছিল তার সাত দশকের কাজ নিয়ে একটি বড় রেট্রোস্পেকটিভ, বাজেলের ফন্ডাসিওন বেয়েলার, কোলনের মিউজিয়াম লুডভিগ ও আমস্টারডামের স্টেডেলিক মিউজিয়ামের যৌথ আয়োজনে। কোলনের পর্ব শেষ হয়েছিল ২ আগস্ট, ১২ দিন পর তিনি মারা যান, আমস্টারডামের পর্ব খুলছে ১১ সেপ্টেম্বর। পরিকল্পনায় যা ছিল জীবিত শিল্পীর উৎসব, তা খুলবে মৃতের স্মরণ হিসেবে। মৃত্যুটি ঘটল ঠিক দুই প্রদর্শনীর মাঝখানের ফাঁকে, যখন তার কাজ প্যাক করা অবস্থায় এক শহর থেকে আরেক শহরে যাচ্ছে।

যিনি সারাজীবন নিজেকে মুছে ফেলার কথা বলেছেন, তার কাজ থেকে যাবে জাদুঘরের দেয়ালে আর তিনি নিজে থেকে যাবেন একটি তারিখে, ১৪ আগস্ট, যে তারিখ তিনি নিজে বেছে নেননি। যে জগৎ তাকে একসময় প্রান্তে সরিয়ে রেখেছিল, সেই জগৎ শেষ পর্যন্ত তারই বানানো আয়নার ভেতর নিজের মুখ খুঁজে বেড়িয়েছে, অসংখ্যবার। আয়নার ভেতরে তিনি নিজে ছিলেন কিনা, সেই প্রশ্ন লাইনে দাঁড়ানো কেউ করেনি।