ভূরাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সমীকরণ

১২-১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। এর মধ্য দিয়ে এবার সংস্থাটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেই অনেকটা বাজিমাত করে ফেললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্বের জন্য নির্মাণ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে নিয়ে এবার সদস্য দেশগুলো সর্বসম্মতভাবে এমন এক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে, যা এই আয়োজনের প্রতিপাদ্যের প্রতি যথার্থ মূল্যায়ন বলে ধারণা করা যেতে পারে। এর নেপথ্যে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূমিকাই বড় করে দেখা যায়। গত কিছুদিন ধরেই এবারের সম্মেলনে যৌথ ঘোষণা নাও আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। এই আশঙ্কার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ এবং বৃহৎ দুই দেশ চীন এবং ভারতের ওপর যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশুল্কের খড়্গ আরোপিত হয়েছে, সেটাকে নিয়ে তারা আর নতুন কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চাইবে না বলে ধারণা করা যাচ্ছিল। অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ব্রিকস ১১ জাতির সমন্বয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিহুপাক্ষিক সংস্থা হলেও এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক বৈরীভাবাপন্ন সম্পর্ক। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরানের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ নিয়ে যথাক্রমে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক ভূমিকা এবং অন্যদিকে চীন এবং ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক বৈরী সম্পর্ক, সেই সঙ্গে চীনের যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নীতির বিপরীতে ভারতের মধ্যপন্থি ভূমিকা। অন্যদিকে রাশিয়ার দিক থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ভূমিকা এবং এক্ষেত্রে বিশ্বঅর্থনীতিতে মার্কিন স্বার্থের বিপরীতে চীনকে সঙ্গে নিয়ে নতুন একটি বলয় তৈরির আকাক্সক্ষা। নানাবিধ সমীকরণকে সামনে নিয়ে সংস্থাটি বৈশ্বিক জনসংখ্যা (৪৯ শতাংশ), জিডিপি (৪০ শতাংশ) এবং বাণিজ্যের (২৬ শতাংশ) বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির বিপরীতে গিয়ে নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরির মতো সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে চাইবে কি না, এটা একটা বড় বিবেচনার বিষয় ছিল।

ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার প্রশংসা করে বলতে হয়, গত বছর এপ্রিল মাসে পেহেলগাম ঘটনার সূত্র ধরে স্বল্প সময়ের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকে ঘিরে ব্রিকসের পক্ষ থেকে অসন্তোষ জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী হামলার জবাবে ভারতের পক্ষ থেকে পাল্টা আঘাত এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই যুদ্ধ শেষ হলেও পাকিস্তান ভারতের পাল্টা আঘাতের কার্যকর জবাব দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। সম্মেলনে এ ঘটনার বিরুদ্ধে ব্রিকসের মাধ্যমে মূলত ভারতের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন আদায় করার মধ্য দিয়ে ভারত একটি কূটনৈতিক সাফল্য দেখাল। ১১ সদস্যের ব্রিকসে পাকিস্তান সদস্য নয়, বরং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা ইরান এবং চীন এর সদস্য। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন, চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিষয়ে ব্রিকস সদস্যরা গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। অন্যদিকে এমন এক সময়ে এই সম্মেলন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা পাশ কাটিয়ে চীন চাচ্ছে একটি কার্যকর বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে। একই সঙ্গে ইরান চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে চীন এবং ইরানের সঙ্গে ক্রমেই উন্নত হতে থাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুঁজি করে কৌশলে ভারত তার চিরবৈরী পাকিস্তানের বিপক্ষে কার্যত একটি অবস্থান তৈরি করে নিল।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০ বছর অতিক্রান্তে ব্রিকস বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি বড় ধরনের দরকষাকষির সংস্থা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। এর মূল কারণ, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর আকার, জিডিপি, জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর প্রভাব। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন এর সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৪টি (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীন) এবং পরিচিত ছিল ব্রিক নামে। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার যোগদানের মধ্য দিয়ে এটি ব্রিকস নামধারণ করে। শুরু থেকেই সংস্থাটির প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতা থেকে অনেক দেশই এর সদস্যপদ লাভের আগ্রহ প্রকাশ করে। ২০২৪ সাল নাগাদ কমপক্ষে এ ধরনের ৪০টি দেশ ব্রিকসের সদস্য হতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তখন বাংলাদেশ যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করলেও মাত্র ৬টি নতুন দেশকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিকস কার্যত ব্রিকস প্লাস-এ পরিণত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে কেন এত বেশি সংখ্যক রাষ্ট্র ব্রিকস ফোরামে যোগ দিতে চাচ্ছে। এর সপক্ষে যে কারণগুলোকে চিহ্নিত করা যায় তা হচ্ছে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা সংকট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ন্যায্যতাপ্রাপ্তি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ফোরামগুলোতে পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিপরীতে একটি কার্যকর অবস্থায় নিজেদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করা এবং জি-৭ এর মতো সংস্থা, যা বিশ্বঅর্থনীতির পাশাপাশি বিশ্বরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এর বিপরীতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করা। এবারের সম্মেলন যে কারণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করছে তা হচ্ছে রাশিয়া এবং চীনের নেতৃত্বে ব্রিকসের অর্থনৈতিক এবং ভৌগোলিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে যুক্তরাষ্ট্র এবং জি-৭ভুক্ত দেশগুলোর আধিপত্যকে খর্ব করতে উদ্যোগী হতে যাচ্ছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা তাস-এর এক সংবাদ বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ব্রিকস মনে করছে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন সম্পৃক্ততা তাদের জন্য বর্তমানে একটি বাড়তি বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় ব্রিকসের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে এবং বিশ্বব্যবস্থার কাক্সিক্ষত পরিবর্তন ঘটিয়ে আগামী দিনের বিশ্বের নেতৃত্বে চীন এবং রাশিয়াকে অধিষ্ঠিত করার এখনই প্রকৃষ্ট সময়।

তবে এখানেই শেষ নয়। ব্রিকসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ভারতের রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। ভারত যদিও এই সংস্থাটির এক সক্রিয় সদস্য, তারা যেমন এটিকে শক্তিশালী করতে চাইবে, একই সঙ্গে রাশিয়া এবং চীনের প্রভাব কমিয়ে নিজেদের একটি প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতেও তারা আগ্রহী। এক্ষেত্রে ব্রিকসের নতুন সদস্য আফ্রিকার ইথিওপিয়া, এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিলের সঙ্গে তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বৃদ্ধি করে নিজেদের বাণিজ্য পরিসরকে বাড়াতে চাইবে। এই দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত চীন এবং রাশিয়ার প্রভাব বলয় সেই অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্রিকসের এবারের সম্মেলনে ভারত যেহেতু নেতৃত্বের দায়িত্ব পেয়েছে, এই সুযোগ তারা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে চাইবে। নিজেদের মধ্যে অনেক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এবারের সম্মেলনে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের সরাসরি সমালোচনা না করলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার বিপরীতে সরব হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামোবাদকে তারা কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার দাবি করেছে। নিরাপত্তা পরিষদে ভারত এবং ব্রাজিলের অন্তর্ভুক্তিসহ আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বও দাবি করেছে তারা। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা নিয়ে তাদের অনেক অসন্তোষ থাকলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এককভাবে এর নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর উত্তরণে আগামী দিনে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সম্মিলিত নিরাপত্তার বিষয়টি এবার বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।

বাংলাদেশ যদিও ব্রিকসের সদস্যপদ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তারপরও এবারের সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এতে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। একইভাবে আমন্ত্রিত হয়েছিল সৌদি আরবও। সৌদি আরব এই সম্মেলনে যোগ দিলেও বাংলাদেশ যোগদান থেকে বিরত ছিল। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়ে এর নীতিগত কোনো বিষয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ না পেলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এতে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার আগ্রহের বিষয়টিকে আরও ভালোভাবে জানান দেওয়ার সুযোগ ছিল। এর ফলে হয়তো ভবিষ্যতে সংস্থাটির সম্প্রসারণের সময় বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতে পারত। আমন্ত্রণ যেহেতু ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ছিল এবং ভারত যেহেতু এর বর্তমান সভাপতি, এক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে একটি সুসম্পর্কের আবহ সৃষ্টি করার সুযোগ নেওয়ার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে এতে যোগদানের ক্ষেত্রে ভারতের সমর্থনের বিষয়টিও নিশ্চিত করা যেত। এর বাইরে আরও সুযোগ ছিল বিশ্বনেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠকের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টিকে তুলে ধরার। বর্তমানে বাংলাদেশ ইরান যুদ্ধের ফলে ব্যাপক জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। এই যোগদানের মধ্য দিয়ে এটি উত্তরণে একটি প্রাথমিক চেষ্টা করা যেতে পারত। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে বৈরিতা ধরে রাখার পরিবর্তে বর্তমান সংকটের কীভাবে কার্যকর সমাধান খুঁজে নেওয়া যায়, এটা বিবেচনাই মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত। এও মনে রাখতে হবে, যত বৈরিতাই থাকুক না কেন প্রতিবেশী বৃহত্তর দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নতির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ক্ষোভের ফল হিসেবে আগামী দিনে ব্রিকস যদি একটি কার্যকর সংস্থা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় সেক্ষেত্রে ভারত নিঃসন্দেহে এতে একটি বিশেষ প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে।

লেখক : কূটনীতি-রাজনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।  

mfulka@yahoo.com