ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় এখনো কাটেনি রোগী ও স্বজনদের আতঙ্ক। আগুন লাগার পর আতঙ্কে তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর দাবি করা হলেও এ বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্যে মিল পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর কারণ নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। এরই মধ্যে অগ্নিকান্ডের কারণ ও কারও দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে গঠিত তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের নতুন ভবনে বন্ধ থাকা চারটি সিঁড়ি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান এসব তথ্য জানান।
ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে তদন্ত কমিটির প্রধান ও সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন। তদন্ত কমিটি লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ, সেখানে কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কারও দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে। গাফিলতি পাওয়া গেলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য : অগ্নিকান্ডের পর পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। সোমবার রাতে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে বিভাগীয় কমিশনার এসএম হুমায়ুন কবির সরকার সাংবাদিকদের বলেন, পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর কোনো প্রমাণ তিনি এখনো পাননি। মৃতদের তালিকায় থাকা পাঁচজনের মধ্যে একজন জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে একই রাতে ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদের বলেন, আতঙ্কে তাড়াহুড়া করে একটি সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার সময় পদদলিত হয়ে শিশুসহ ছয়জন মারা গেছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তিনি জানান, হাসপাতালের একটি সিঁড়ি রোগী ও স্বজনদের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং অন্য সিঁড়িগুলো তালাবদ্ধ ছিল। আগুন লাগার পর আতঙ্কিত লোকজন একটি সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা করলে পদদলনের ঘটনা ঘটে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় অগ্নিকান্ডে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বজনদের দাবি, সিঁড়িতে পড়ে মৃত্যু : অগ্নিকা-ের সময় পদদলিত হয়ে মৃত্যুর দাবি করা কয়েকজনের স্বজনের সঙ্গে কথা বলে হাসপাতালের সিঁড়ি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের শহীদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুমা (৩৫)। তার ননদ নাজমা আক্তার জানান, কুলসুমার ১২ বছরের ছেলে মো. স্বাধীন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে ১১ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের ষষ্ঠ তলায় ভর্তি ছিল। নাজমার ভাষ্য, সোমবার সন্ধ্যায় আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে রোগী ও স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। কুলসুমাও ছেলে স্বাধীন ও মেয়ে মীমকে নিয়ে নিচে নামছিলেন। ষষ্ঠ তলা থেকে চতুর্থ তলায় আসার সময় তিনি পড়ে যান। মানুষের ভিড়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান। পরে তাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু হয়।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে বালিখা গ্রামে জানাজা শেষে কুলসুমাকে পারিবারিক বাড়ির আঙিনায় দাফন করা হয়।
চার সিঁড়িতে তালা : গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিতেই তালা লাগানো। অগ্নিকা-ের পর নিচে নামার সময় এসব সিঁড়ি ব্যবহার করতে না পারায় রোগী ও স্বজনদের একটি সিঁড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, নতুন ভবনে পাঁচটি সিঁড়ি ও সাতটি লিফট রয়েছে। সাতটি লিফটের একটি আগে থেকেই বিকল ছিল এবং সেটির মেরামতের কাজ চলছিল। ওই লিফটের কন্ট্রোল রুমেই আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। তবে সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, নিরাপত্তার কারণে চারটি সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে অগ্নিকান্ডের পর পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্ধ থাকা চারটি সিঁড়ি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, লিফটের কন্ট্রোল বোর্ড ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশে আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, লিফটের কেবলের মাধ্যমে আগুন ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। হাসপাতালের সব সিঁড়ি খোলা থাকলে রোগী ও স্বজনরা সহজে নিচে নামতে পারতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হাসপাতালের লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস বলেন, অগ্নিকা-ের সময় ১১ নম্বর লিফটটি সচল ছিল না। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সেটি বন্ধ ছিল।