মালয়েশিয়ায় পৌঁছেই বিক্রি হয়ে যান তারা

বিদেশে ভালো চাকরি, মোটা বেতনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে নারীদের নেওয়া হয় মালয়েশিয়ায়। কাউকে গার্মেন্টসে চাকরির, কাউকে মার্কেট বা সুপারশপে কাজের, আবার কাউকে রেস্টুরেন্ট বা পার্লারে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু মালয়েশিয়ায় পৌঁছার পর বদলে যায় পুরো চিত্র। তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর আটকে রেখে মারধর করা, ভয়ভীতি দেখানোর মাধ্যমে তাদের অসামাজিক কাজে বাধ্য করা হয়। কথা না শুনলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ‘বিক্রি’ হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও যেতে হয় অনেককে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসা ভুক্তভোগী এক নারীর বক্তব্যে উঠে এসেছে নারী পাচার ও নির্যাতনের ভয়াবহ এ চিত্র। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত কয়েকজন বাংলাদেশির সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নারীদের বিদেশে পাচারের এ কাজ করছে।

ভুক্তভোগী ওই নারী দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসা রানা নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রথমে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব পান।  রানা  তাকে গার্মেন্টসে চাকরি দেওয়া হবে বলে জানান। পরে বলা হয়, তিনি ওই কাজ করতে পারবেন না। তাই মার্কেট বা সুপারশপে কাজ দেওয়া হবে। এ জন্য তাকে ঢাকায় ‘বিল্লাল’ নামে একজনের কাছে পাঠানো হয়। বিল্লাল তার কাছে ভালো ভিসা নেই জানালে পাঠানো হয় ‘রবিউল’ নামে একজনের কাছে। রবিউল মালয়েশিয়ার ভিসা করে দেওয়ার কথা বলে তার পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র নিয়ে নেন। পরে স্ত্রীর পরিচয়ে ট্যুরিস্ট ভিসায় তাকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যান।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগী জানতে পারেন, রবিউল এর আগেও এক নারীকে তার স্ত্রী পরিচয়ে দেশটিতে নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে রানা ও রবিউল ভালো চাকরির প্রলোভন দিয়ে  গ্রাম এবং শহরের দরিদ্র সুন্দরী নারীদের সংগ্রহ করতেন। আবার ওইসব নারীকে বিদেশে নেওয়ার জন্য তাদের কাছ থেকেও টাকা নিতেন। মালয়েশিয়ায় তাদের গ্রহণ করার দায়িত্বে ছিলেন সোহেল ও ‘আক্তার’ নামে দুই ব্যক্তি। তারা নারীদের রবিউলের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে নিয়ে পরে অন্য পক্ষের কাছে বেশি দামে হস্তান্তর (বিক্রি) করতেন।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর তারা চক্রটির হাতে জিম্মি হয়ে যান। সেখানে নেওয়ার পর কাউকে অন্যত্র পাঠানোর আগে তার ছবি ও সব শরীরের ভিডিও ধারণ করা হয়। এরপর বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে নারীদের ‘মূল্য’ নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়। ওই নারী অভিযোগ করে বলেন, তাকে একপর্যায়ে চার দিন একটি স্থানে রাখার পর ভারতের এক ব্যক্তির বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই নারী জানান, সোহেল তাকে বলেছিলেন একটি হোটেলে কাজ করানোর জন্য তাকে চার লাখ টাকা দিয়ে দুই বছরের চুক্তিতে ‘কিনে’ নেওয়া হয়েছে। পরে তিনি দেখেন, কথিত হোটেলের পরিবর্তে একটি বাসায় আরও কয়েকজন নারীকে রাখা হয়েছে। গোডাউনের মতো ওই বাসায় তাদের দিয়ে অসামাজিক কাজ করানো হতো।

প্রথমে নির্যাতিত, পরে চক্রের সদস্য : ভুক্তভোগী জানান, মালয়েশিয়ায় জিম্মি নারীদের কাজ দেওয়া ও দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন ‘নাদিয়া’ নামে গোপালগঞ্জের এক নারী। তিনি সোহেলের স্ত্রী পরিচয়ে সেখানে থাকতেন। নাদিয়াও সোহেলের প্রতারণার শিকার হন এবং একপর্যায়ে চক্রটির সদস্য হয়ে যান। নাদিয়া, সোহেল ও আক্তারের সমন্বয়ে আরও বহু নারীকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে বাসায় আটকে রাখা এবং অসামাজিক কাজ করানো হতো।

তিন মাস পরপর বদলায় ঠিকানা : মালয়েশিয়ায় থাকার প্রায় ৯ মাসে ভুক্তভোগী ওই নারীকে তিনটি আলাদা বাড়িতে রাখা হয়। একেকটি বাড়িতে দীর্ঘ সময় একই নারীদের না রেখে কয়েক মাস পরপর নতুন নারী আনা হতো। সোহেল মাঝে মাঝে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় যেতেন। কিছু দিন অবস্থান করার পর টাকা-পয়সা নিয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসতেন।

দেশে ফেরার আকুতি : দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও বন্দিজীবন সহ্য করতে না পেরে একসময় ভুক্তভোগী নাদিয়াকে অনুরোধ করেন, তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার। নাদিয়া তাকে জানান, তাকে চার লাখ টাকা দিয়ে কিনে আনা হয়েছে। তাই ওই টাকা পরিশোধ না করলে দেশে ফেরার সুযোগ নেই। অন্য কোথাও তাকে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীর ভাষ্য তিনি নাদিয়াকে বলেন কয়েক মাসের কাজেই তার কাছ থেকে যে অর্থ উপার্জন করা হয়েছে, তাতে কেনা টাকার চেয়ে বেশি অর্থ উঠে গেছে। এরপরও তাকে ছাড়তে রাজি হননি নাদিয়া। বরং তাকে গালাগাল ও মারধর করা হয় এবং তার পাসপোর্ট, ভিসাসহ অন্যান্য কাগজপত্র আটকে রাখা হয়। নাদিয়ার ভাষ্য ‘টাকা দাও, নইলে অন্য জায়গায় বিক্রি করে দেব’ দীর্ঘ ৯ মাসের নির্যাতন ভোগের পর নিজের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে অনেক অনুরোধ করে অবশেষে দেশে ফেরার সুযোগ পান ওই নারী।

সৌদি আরবে গিয়ে প্রতারিত : অনেক স্বপ্ন নিয়ে দালাল বিল্লালের মাধ্যমে সৌদি আরবে চাকরি করতে গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের দেলপারার হ্যাপি আক্তার। চাকরির টাকা জমিয়ে এক মেয়ে ও এক ছেলেসহ রেখে যাওয়া অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত স্বামী জাহাঙ্গীরকে চিকিৎসা করাবে বলে প্রবাসজীবন বেছে নেন তিনি। সেখানেও নির্যাতনের শিকার হয়ে তাকে আসামাজিক কাজে বাধ্য করা হয়। হ্যাপি জানান, গত মাসে স্বামী চিকিৎসাধীন মারা যান। নির্যাতন সইতে না পেরে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

শ্রমবাজার খোলার খবরে সক্রিয় প্রতারক ও দালাল চক্র : শ্রমবাজার খোলার আগেই দেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রতারক ও দালাল চক্র। মালয়েশিয়া, ওমান কিংবা মালদ্বীপের মতো বড় বড় শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার খবরে প্রতারক বা দালাল চক্র সিন্ডিকেট করে সামাজিক মাধ্যম এবং গ্রাম-গঞ্জে নানা ধরনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের মনোগ্রাম যুক্ত করে ফেসবুকে পেজ খুলে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যেতে ইচ্ছুকদের আকর্ষণ করা হচ্ছে। রাজধানীর নয়া পল্টনস্থ চায়না টাউনে একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে ডেলিগেট এনে গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল বিদেশ গমনেচ্ছুদের ইন্টারভিউ নেওয়ার ফাঁদ পেতেছে। তারা সাক্ষাৎকার এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিচ্ছে। একাধিক এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে।