ভারতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) তদন্ত প্রতিবেদন। ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তেই বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ দল। উপদেষ্টার সিদ্ধান্তে আপত্তি না জানিয়ে বরং সব সিদ্ধান্ত মেনে নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। যদিও ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপে প্রস্তুত ছিলেন বলেও ৩ সদস্যের করা তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গতকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওয়ালি উল্যার নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটির অন্য দুজন হলেন সাবেক অধিনায়ক ও প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর। সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার দস্তগীর বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সবকিছু মিলিয়ে তদন্তে যা উঠে এসেছে, সে হিসেবে বলা যায়, যে মানুষটি দায়ী (বিশ্বকাপে না যাওয়ার জন্য), তিনি হলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। সেই সময়ের সরকার ও তিনি দায়ী।’ পাশাপাশি বাংলাদেশের অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এই তদন্ত কমিটির সঙ্গে কথা বলার সময় বিসিবির বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবালও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রতিবেদনে তামিমের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সমাধান বের করার জায়গা ছিল।’ ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ ও দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এককভাবে না নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া উচিত বলেও মত দিয়েছেন সাবেক এই অধিনায়ক, ‘খেলাধুলায় রাজনীতি বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিসিবি (বুলবুলের বোর্ড) এবং সরকারের (অন্তর্বর্তীকালীন) সম্মিলিত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে ধ্বংস করে দিয়েছে।’
২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না যাওয়ার ঘটনাপ্রবাহের শুরু বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে সরিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলতে না দেওয়ার পর ভারতে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রকাশ্যেই ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার অবস্থান নেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিসিবি বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার জন্য আইসিসির কাছে আবেদন করে। কিন্তু সেই আবেদনে সারা দেয়নি আইসিসি। বাংলাদেশও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না আসায় শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে তাদের জায়গায় খেলে স্কটল্যান্ড।
বিশ্বকাপ না খেলার মূল কারণ অনুসন্ধানের জন্য গত মার্চ মাসে তদন্ত কমিটি গঠন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। তারা তদন্তের স্বার্থে ১২ জনের সাক্ষাৎকার নেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক লিটন দাস, টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, বিসিবির বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল, বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, জাতীয় দলের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের তৎকালীন প্রধান নাজমুল আবেদীনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে আসিফ নজরুল ও তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তদন্তকারী প্রতিনিধিরা। এই তদন্ত কমিটির কাছে নাজমুল আবেদীন বলেছেন, ‘ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। তবে সরকার যদি এ রকম সিদ্ধান্ত নেয়, ক্রিকেট বোর্ড সেই সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য।’
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে আসিফ নজরুলও স্বীকার করছেন বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত তারই ছিল, ‘ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি তখনকার ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে মূলত আমারই ছিল। আমি নিজেই এ কথা একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছি। আমার সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি বিষয় ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার দেশের মর্যাদা, আমাদের ক্রিকেটার-সাংবাদিক-সমর্থকদের নিরাপত্তা এবং আগামী নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। আমি মনে করি, আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবিকে সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলম বিসিবির সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, ‘যুব ও ক্রীড়া সচিবকে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ডাকার পর আসিফ নজরুল নিজেই তার সিদ্ধান্ত জানান। এর আগে ক্রীড়া সচিব পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিসিবির সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত, যেহেতু বিসিবি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তবে সাবেক বিসিবি সভাপতি বুলবুল প্রবল চাপে ছিলেন, যেহেতু তিনি আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারছিলেন না। বিসিবির সহ-সভাপতি ও সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মতামত দেন, বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত।’
বিশ্বকাপে না যাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ, আইসিসির সঙ্গে গভর্ন্যান্স-সংঘাত, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থ আলোচনাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি। বাংলাদেশ-ভারত রাজনৈতিক টানাপড়েন, ভেন্যু পরিবর্তনে আইসিসির অপারগতা এবং বাংলাদেশ সরকারের হস্তক্ষেপকে ‘অতি উচ্চ’ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিসিবির কূটনৈতিক দক্ষতার ঘাটতিকে ‘উচ্চ’ এবং যোগাযোগের ঘাটতিকে ‘মাঝারি’ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কমিটি ৭টি সুপারিশও দিয়েছে। যার মধ্যে আছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে সব ধরনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপড়েন থেকে মুক্ত রাখা, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থরক্ষায় বিসিবির আনুষ্ঠানিক নীতিমালা তৈরি করা, বিসিবির স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো। ভবিষ্যতে বিসিবির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও যোগাযোগের মাধ্যমগুলো স্পষ্ট করার কথাও বলা হয়েছে সুপারিশে।
প্রতিবেদনের পরিসমাপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল, ক্রিকেটাররা এবং সমর্থকরাই সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন।’