আশ্বিনের এই প্রথম দিনে

হিমের শিহর লেগেছে আজ মৃদু হাওয়ায়/আশ্বিনের এই প্রথম দিনে/ভোরবেলাকার চাঁদের আলো/মিলিয়ে আসে শ্বেতকরবীর রঙে/শিউলিফুলের নিশ্বাস বয়/ভিজে ঘাসের’ পরে/তপস্বিনী ঊষার পরা পুজোর চেলির/গন্ধ যেন/আশ্বিনের এই প্রথম দিনে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [পয়লা আশ্বিন]

বাংলা সনের ষষ্ঠ মাস এবং শরৎকালের গুরুত্বপূর্ণ সময় আশ্বিন। ‘অশ্বিনী’ নক্ষত্রের নামানুসারে মাসটির নাম রাখা হয়। এটি শরৎকালের দ্বিতীয় মাস। আশ্বিন মাস মানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’। মহালয়ার মাধ্যমে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা ঘোষিত হয়। এই মাসে শারদীয়া নবরাত্রি, বিজয়া দশমী, লক্ষ্মী ও কালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে, সূর্যকন্যা তারামন্ডলে প্রবেশ করলে এর আগমন ঘটে। দেশের সর্বশেষ সংশোধিত পঞ্জিকা অনুসারে, আশ্বিন এখন ৩০ দিনের পরিবর্তে ৩১ দিনে। এই সময় আকাশ থাকে পরিষ্কার নীল ও মেঘমুক্ত। সকালে মৃদু শিশির পড়ে, শিউলি ও কাশফুল বাতাসে দোল খায়।

‘শ্রাবণ’ মহাদেবের, ‘ভাদ্র’ শ্রীকৃষ্ণের আর ‘আশ্বিন’ দুর্গার মাস। আশ্বিনের আরেকটি গুরুত্ব হলো এই মাসে পালিত হয় পিতৃপক্ষ। সাধারণত আশ্বিন মাসের ১৫ দিন পিতৃপক্ষ এবং ১৫ দিন দেবীপক্ষ।

বাংলা সাহিত্যে ‘আশ্বিন’ মাস অনন্য রূপে ধরা দিয়েছে। কখনো এসেছে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে, কখনো উৎসবের আগমনী বার্তা কিংবা বিরহের সুর নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখে আশ্বিন হলো উৎসব, আনন্দ এবং প্রকৃতির মিলনের মাস। তিনি আশ্বিনকে শারদীয় উৎসব এবং কাশফুলের দোলা লাগা এক আনন্দময়ী রূপ হিসেবে দেখেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় আশ্বিন এসেছে উৎসবের আমেজ এবং চঞ্চল ও মোহনীয় রূপে। তিনি আশ্বিনের শরৎকে ‘নয়ন-ভুলানো রূপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আশ্বিন হলো রূপসী বাংলার রূপময় ও উদাসীন ঋতু। তিনি আশ্বিনের আকাশ, চিল ও গাছপালাক নিখুঁতভাবে এঁকেছেন। তার কবিতায় আশ্বিনের আকাশ ধূসর, ডানা মেলে চিল উড়ে বেড়ায় এবং চারপাশের প্রকৃতিতে শান্ত, মায়াবী ভাব থাকে। আশ্বিনের ‘শিউলি-ছড়ানো ভোর’ কিংবা ‘আশ্বিনের আকাশে কার্তিকের কুয়াশার আভাস’-এর মতো লাইনে তিনি আশ্বিন মাসের এক অনন্য চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। জসীম উদ্দীনের চোখে আশ্বিন মাস হলো গ্রামীণ বাংলার শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপ। বর্ষা বিদায় নেওয়ার পর আশ্বিনের তপ্ত রোদ, পাকা ধানের গন্ধ এবং গাঁয়ের মেঠো পথের রূপ তার কবিতায় দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার ‘আশ্বিন মাস’ কবিতায় আশ্বিন মাসের প্রকৃতি, শারদীয় দুর্গোৎসব এবং বাঙালি জাতির ভক্তিময় ও আনন্দঘন রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।

আশ্বিন একদিকে যেমন মিলনের আনন্দ নিয়ে আসে, অন্যদিকে দূর পরবাসে থাকা প্রিয়জনের জন্য তৈরি করে তীব্র বিরহ। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আশ্বিনদিবসে কবিতায় লিখেছেন ‘আশ্বিন বলতেই চোখে ভেসে ওঠে রোদ্দুরের ছবি/চক্রাকারে চিল/মাথার উপর দিয়ে ডানা মেলে/উড়ে যায়/মেঘের জানলার দিকে।/আশ্বিন বলতেই আলোর-তরঙ্গে-ধোয়া দৃশ্যাবলি চোখের সমুখে/দেখতে পাই।/দেখি নদী, দেখি নৌকা, গেরুয়া বাদাম/স্রোতের দুরন্ত টানে ঘুরে যায়।’ বর্ষা থেকে শরৎকালে রূপান্তরের সময় হঠাৎ বজ্রঝড় ও আবহাওয়ার অস্থিরতাকে গ্রামবাংলায় আশ্বিনের ভয় বা আশঙ্কা বলা হতো। মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ সেকালের প্রথিতযশা ব্যক্তিরা ঝড়ের ভয়াবহতার কথা চিঠিপত্রে লিখে গেছেন।

কৃষ্টি, ঐতিহ্য আর ধর্মীয় উৎসব নিয়ে আমরা যত জানার চেষ্টা করি, তত একটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয় জীবনযাপন, আচার-ব্যবহার আর ভাষার বৈচিত্র্য আমাদের মধ্যে যতই ভিন্নতা তৈরি করুক, নিজ ধর্ম ও হাজার বছরের সংস্কৃতি যেন এ দেশের মানুষকে এক হৃদয়ে ঠাঁই দেয়। এই-ই পরিচয় হোক বাংলাদেশের। দেশটি যেন জাতি-ধর্ম-গোষ্ঠীর ‘সম্প্রতির স্বর্ণদুয়ার’ হিসেবে বিবেচিত হয়। আনন্দ-বেদনার মিশেলে হাজার বছর বেঁচে থাক, প্রিয় বাংলাদেশ। যে দেশের মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে জন্ম-মৃত্যু-সুখ-দুঃখ-ভালোবাসা-বিরহ আর সংগ্রামের দিনলিপি। শারদ স্পর্শে জেগে উঠুক হৃদয়।