ডাকসুর মেয়াদ শেষ, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা

এক বছর মেয়াদ শেষ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) বর্তমান কমিটির। গত রবিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে এখনো দৃশ্যমান হয়নি কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। নির্বাচন কমিশন গঠন, তফসিল ঘোষণা কিংবা ভোটের সম্ভাব্য তারিখ-কোনোটিই চূড়ান্ত হয়নি। ফলে একদিকে যেমন পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন কবে হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকায় বর্তমান কমিটিই আপাতত দায়িত্বে থাকছে।

 ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর তারা দায়িত্ব গ্রহণ করে। নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদসহ ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পায় ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল। এক বছর পর সেই কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী নির্বাচনের প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে।

ডাকসুর গঠনতন্ত্রের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের (গ) উপধারায় নির্বাচিত পদাধিকারীদের মেয়াদ ৩৬৫ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব না হলে তারা সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিন অথবা এর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সে পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এরপর নতুন নির্বাচন না হলে ইউনিয়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়ার বিধান রয়েছে।

অর্থাৎ, রবিবার এক বছরের মেয়াদ শেষ হলেও বর্তমান কমিটির কার্যক্রম এখনই শেষ হচ্ছে না। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৯০ দিন তারা দায়িত্বে থাকতে পারবেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ সময়ের দায়িত্বকে রুটিন কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে। নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তার আগেই বর্তমান কমিটির দায়িত্বের অবসান হবে।

ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, তারা দায়িত্ব ছাড়তে চান। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হচ্ছে না। ‘প্রশাসনকে জানালে তারা বলে, ডাকসু নির্বাচন দেবে। কিন্তু কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। তাদের আশ্বাসে আমরা সন্তুষ্ট নই।

ফরহাদ বলেন, প্রশাসন ডাকসু নির্বাচন না দিলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৯০ দিনের দায়িত্ব আমাদের ওপর পড়বে।

শুরু হয়েছিল প্রস্তুতি, এগোয়নি প্রক্রিয়া : পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া নিয়ে গত ২০ আগস্ট প্রথম প্রস্তুতিমূলক বৈঠক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক প্রস্তুতি, আবাসিক হলগুলোর পরিস্থিতি এবং শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সক্রিয় ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে ওই বৈঠকের পর এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন গঠন বা তফসিল ঘোষণার মতো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র বলছে, ২০ আগস্টের বৈঠকটি মূলত প্রাথমিক আলোচনা ছিল। ওই বৈঠকের পর বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষদের মাধ্যমে সক্রিয় ছাত্রসংগঠনগুলোর মতামত নেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটেও ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য পৃথক কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে প্রশাসনের আগ্রহ রয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। শিগগিরই বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আগের নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

নিয়মিত নির্বাচন হবে, নাকি ফের দীর্ঘ বিরতি?: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে নিয়মিততার চেয়ে অনিয়মিত হওয়ার ঘটনাই বেশি দৃশ্যমান। ব্রিটিশ আমলে ২৩ বছরে ১৪ বার এবং পাকিস্তান আমলে ২২ বছরে ১৬ বার ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। স্বাধীনতার পর সেই ধারাবাহিকতা আর বজায় থাকেনি। ২০২৫ সালের নির্বাচনসহ স্বাধীন বাংলাদেশের সময়ে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মোট ৯ বার।

 ১৯৯০ সালের পর দীর্ঘ ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। ২০১৯ সালে সেই দীর্ঘ বিরতির অবসান হলেও এরপর আবার নির্বাচন বন্ধ থাকে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ২০২৫ সালে দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

কিন্তু ডাকসুর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সূচি না আসায় সেই ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, ডাকসুকে নিয়মিত অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন এ নিয়ে বলে এলেও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। আমরা ইতিমধ্যেই পুনরায় নির্বাচনের বিষয়ে বলেছি। কিন্তু প্রশাসনের অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। ডাকসুকে অকার্যকর করার কোনো চেষ্টা করা হলে শিক্ষার্থীরা তার জবাব দেবে।

উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ডাকসুর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে এখনকার কমিটির দায়িত্বটা হবে রুটিন দায়িত্ব। তারা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না।

পরবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, নির্বাচন অবশ্যই হবে। এরই মধ্যে একটি সভা হয়েছে। হল প্রশাসন নির্বাচনের পরিবেশ আছে কি না, সে বিষয়ে তাকে চিঠি দেবে। এটি বড় কর্মযজ্ঞ। তাই ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সব পর্যায়ের অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। তবে আমি কোনো সময়সীমা দিতে পারছি না।

জিন্নাহ-গোলাম আযমের ছবি পদদলিত

ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি সংযুক্ত করার প্রতিবাদে একদল শিক্ষার্থী জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি পদদলিত করেন।

গতকাল দুপুরে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের একদল শিক্ষার্থী ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি রেখে সেগুলো পদদলিত করেন। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি লাগানোর প্রতিবাদেই তারা এ কর্মসূচি পালন করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শিব্বির আহমেদ বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষমতা দিয়ে এবং বাংলাদেশপন্থিদের ক্ষমতা দিয়ে গোলাম আযম ও জিন্নাহর ছবি, পাকিস্তানপন্থিদের ছবি পায়ের নিচে লাগালাম। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশে কোনো পাকিস্তানপন্থির রাজনীতি সামনে আনা যাবে না।’

সংগ্রহশালায় ভাঙচুরের অভিযোগ, তদন্ত দাবি

এদিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত ছবি ও স্মারক ভাঙচুরের অভিযোগ এনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)। পাশাপাশি সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নিদর্শনের নিরাপত্তা জোরদার এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে ইউটিএল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ডাকসু সংগ্রহশালা পরিদর্শন করে। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তারা।

অধ্যাপক যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এক শিক্ষার্থী ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রবেশ করে সেখানে সংরক্ষিত কিছু ছবি ও স্মারকের ক্ষতি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে কোনো স্থাপনা বা সম্পদের ক্ষতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।